November 28, 2020

মাই পেটারসন. লাইফ

ভয়েস অফ দ্যা কমিউনিটি

লেবানন প্রবাসী বাংলাদেশিদের মানবেতর জীবন-যাপন, দেখার কেউ নেই

স্মরণকালের ভয়াবহ বিস্ফোরণে লেবানন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অচলাবস্থা আরও প্রকট হয়েছে। বন্ধ হতে বসেছে শ্রমবাজার। মাসের পর মাস বেতন না পাওয়া, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও অর্থের মান কমে যাওয়ায় দেশটিতে থাকার আশা একেবারেই ছেড়ে দিয়েছেন প্রবাসী বাংলাদেশিরা। দূতাবাস বলছে, প্রবাসীদের সব রকম সহায়তা করা হচ্ছে।

লেবাননে কর্মরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের অর্ধেকেরও বেশি সংখ্যকের কাজ নেই। যাদের কাজ আছে, তাদেরও বেতন কমে গেছে দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি। আগে যিনি বেতন পেতেন ৪০০ ডলার, এখন তার বেতন হয়েছে কমবেশি ৭০ ডলার। চালসহ জিনিসপত্রের দাম বেড়েছে কয়েকগুণ।

মূলত এই সংকট শুরু হয়েছে গত বছরের সেপ্টেম্বর থেকে। তখন থেকেই বাংলাদেশিরা অর্থকষ্টে পড়েছেন। এখন প্রবাসী বাংলাদেশিদের একটি বড় অংশ খাদ্য সংকটে ভুগছেন। বৈরুতে অবস্থানরত বাংলাদেশিদের সঙ্গে হোয়াটসঅ্যাপে কথা বলে এ তথ্য জানা গেছে।
আরব বিশ্বের একটি মুসলিম দেশ হিসেবে লেবাননকে বিবেচনা করা হলেও, দেশটির প্রায় অর্ধেক জনসংখ্যা খ্রিস্টান। জীবনযাপন পাশ্চাত্য ঘরানার। গেল কয়েক বছর ধরেই নানামুখী সংকটে লেবাননের শ্রম বাজার। আগস্টের ভয়াবহ বিস্ফোরণ এ সংকটের কফিনে শেষ পেরেকটিও ঠুকেছে। দেশটিতে বাংলাদেশিদের বেশিরভাগেরই কাজ নেই। যাদেরও বা কাজ রয়েছে তারা এখন অনেক কম পারিশ্রমিক পাচ্ছেন। দেশে অর্থ পাঠানো তো দূরের কথা, নিজেই তিন বেলা খেয়ে-পরে থাকতে পারছেন না। এ অবস্থায় দেশে ফেরাকেই একমাত্র সমাধান দেখছেন তারা।

মাসের পর মাস বেতন না পাওয়া, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও অর্থের মান কমে যাওয়ায় ধস নেমেছে অর্থনীতিতে। এছাড়া রাজনৈতিক দলগুলোর বিভাজন ও ফ্রান্সসহ পশ্চিমা দেশগুলোর আধিপত্যেও সংকট আরও ঘোলা হয়েছে। লেবাননে দেড় লাখের বেশি বাংলাদেশি বাস।
দূতাবাস বলছে, আগ্রহীদের দেশে পাঠাতে সাধ্য মতো কাজ চলছে। খাদ্যপণ্য ও জরুরি চিকিৎসা সামগ্রীর পর এবার বৈরুতের ক্ষতিগ্রস্ত ভবনগুলোর জন্য ত্রাণ সামগ্রী পাঠিয়েছে বাংলাদেশ।

১৯৯১ সালে ২৫ জন নারী কর্মীর মাধ্যমে লেবাননে বাংলাদেশি কর্মী যাওয়া শুরু। বর্তমানে মোট বাংলাদেশি আছেন প্রায় ১ লাখ ৬৮ হাজার। এছাড়া নারী শ্রমিক প্রায় এক লাখ। কিছু সংখ্যক বিভিন্ন সময়ে ফিরে এসেছেন। কতজন ফিরেছেন, কতজন আছেন, সঠিক সংখ্যা জানা নেই বৈরুতের বাংলাদেশ দূতাবাসেরও।
গত কয়েকদিনে বেশ কয়েকজন লেবানন-প্রবাসী বাংলাদেশির সঙ্গে কথা হয়েছে। তাদের কেউ নাম-পরিচয় প্রকাশ করে কথা বলতে রাজি হননি।

প্রায় ২৫ বছর ধরে লেবাননে আছেন এমন একজন প্রবাসী বলছিলেন, ‘২০১৯ সালের সেপ্টেম্বর থেকে লেবাননের অর্থনীতিতে ভয়ঙ্কর মন্দা শুরু হয়েছে। ক্রমান্বয়ে অর্থনীতির অবনতি হচ্ছে। ডলার দুষ্প্রাপ্য বস্তুতে পরিণত হয়েছে। জিনিসপত্রের দাম বাড়ছে হু হু করে। সেপ্টেম্বরের আগে এক ডলারে পাওয়া যেত লেবাননের মুদ্রা ১৫০০ লিরা। এখন এক ডলার সমান প্রায় আট হাজার লিরা। আগে কর্মীরা বেতন পেতেন ডলারে। ডলার সংকটের কারণে কোম্পানি এখন বেতন দেয় লিরায়। আগে শ্রমিকদের গড় বেতন ছিল ৪০০ থেকে ৬০০ ডলার। ৪০০ ডলার সমান ছিল ছয় লাখ লিরা। এখনও সেই শ্রমিকের বেতন ছয় লাখ লিরা, যা কমবেশি ৭০ ডলারের সমান।’

‘তার মানে ৪০০ ডলার পাওয়া শ্রমিকের বেতন কমে গেছে ৩৩০ ডলার। ৭০ ডলার দিয়ে নিজেরই চলে না। দেশে টাকা পাঠাবেন কীভাবে? গত প্রায় ১১ মাস ধরে লেবানন প্রবাসীরা দেশে টাকা পাঠাতে পারছেন না।’

কেমন আছেন?, প্রশ্নের উত্তরে একজন লেবানন-প্রবাসী বলছিলেন, ‘কেমন আছি জানি না। বন্দর থেকে এক কিলোমিটার দূরে পেট্রোল পাম্পে কাজ করি। গত বছরের সেপ্টেম্বরের আগে বেতন ছিল ৪০০ ডলার। এখন পাই ছয় লাখ লিরা, যা ৭০ ডলারের সমান। ২০ কেজি চালের প্যাকেটের দাম ছিল ১৫ ডলার, এখন তার দাম ৫০-৬০ ডলার। এক প্যাকেট মার্লবোরো সিগারেটের দাম ছিল ২৫০০ লিরা, এখন ১২-১৪ হাজার লিরা। আট হাজার লিরার এক কেজি গরুর মাংসের দাম হয়েছে ৩০ হাজার লিরা। দেশ থেকে তাকিয়ে আছে মাসের শেষে টাকা পাঠাব। নিজেই চলতে পারছি না। দেশে টাকা পাঠাব কীভাবে? কেমন আছি বুঝতেই পারছেন! তবুও আমার এখনও কাজ আছে। ৭০ ডলার হলেও আয় করছি। লেবাননে অবস্থানরত কমপক্ষে অর্ধেক বাংলাদেশিরই কাজ নেই। তারা কীভাবে বেঁচে আছেন ভাষায় বলা সম্ভব নয়।

লেবাননে অবস্থানরত বাংলাদেশিদের মধ্যে প্রায় ৪০ হাজার কাগজপত্রহীন। বৈরুতের বাংলাদেশ দূতাবাসের শ্রমসচিব আবদুল্লাহ আল মামুন বলছিলেন, এই সংখ্যা ২০-২৫ হাজারের বেশি নয়।

গত বছর লেবানন সরকার কাগজপত্রহীন বাংলাদেশিদের দেশে ফিরে যাওয়ার সুযোগ দিয়েছিল। লেবানন সরকার দেশে ফিরে যাওয়ার এক্সিট ফি নির্ধারণ করেছিল পুরুষ শ্রমিকদের জন্য ২৬৭ ডলার, নারী শ্রমিকদের জন্যে ২০০ ডলার। দূতাবাস উড়োজাহাজ ভাড়া নির্ধারণ করেছিল ৩০০ ডলার। প্রায় সাত হাজার ৫০০ বাংলাদেশি দুতাবাসে ৩০০ ডলার জমা দিয়ে দেশে ফেরার জন্যে নিবন্ধন করেছিল। এক হাজার ৪০০ জনের মতো ফেরার পর, করোনা মহামারির কারণে উড়োজাহাজ চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বাকিরা ফিরতে পারেননি। সম্প্রতি বাংলাদেশ বিমানের তিনটি বিশেষ ফ্লাইটে এক হাজার ২৩০ জন প্রবাসীকে দেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

এখন দূতাবাস বিজ্ঞপ্তি দিয়ে জানিয়েছে, নিবন্ধিতদের উড়োজাহাজ ভাড়া হিসেবে আরও ৫০ ডলার জমা দিতে হবে। এমন একজন কাগজপত্রহীন শ্রমিক টেলিফোনে বলছিলেন, ‘কাজ নেই, এক বেলা খাই তো আরেক বেলা না খেয়ে থাকতে হয়। রাতে কীভাবে ঘুমাই তা শুধু আমরাই জানি। অনেক কষ্টে এক্সিট ফি ও উড়োজাহাজ ভাড়া ৫৬৭ ডলার জোগাড় করে নিবন্ধন করেছিলাম। এখন ৫০ ডলার কিনতে লাগবে প্রায় চার লাখ লিরা। কোথায় পাব এই টাকা? কীভাবে দেশে ফিরব? দূতাবাস তো আমাদের কোনো কথাই শুনছে না।

আরেকজন প্রবাসী বলছিলেন, দেশে ফেরার নিবন্ধন করার জন্যে দেশ থেকে কিছু টাকা আনিয়েছিলাম। আগে যারা নিবন্ধন করেছিলেন, তারাই যেতে পারেননি। নিবন্ধিত সাত হাজার ৫০০ জন যাওয়ার পরে নাকি আবার নিবন্ধন শুরু হবে। ততদিনে তো দেশ থেকে আনা টাকা শেষ হয়ে যাবে! বলেন তো, আমরা কীভাবে বেঁচে থাকব? আমাদের এই জীবন কী মানুষের জীবন?’

হোয়াটসঅ্যাপে কথা হচ্ছিল বৈরুতে কর্মরত আরও একজন প্রবাসীর সঙ্গে। তিনি বললেন, শুনলাম বাংলাদেশ সরকার লেবাননে খাদ্য ও চিকিৎসা সহায়তা পাঠিয়েছে। ভালো কথা। কিন্তু, লেবাননে আমরা প্রবাসী বাংলাদেশিরা তো বিস্ফোরণের আগে থেকেই মানবেতর জীবনযাপন করছি। আমাদের জন্যে সরকারের কিছু করণীয় নেই? আমরা তো রাষ্ট্রদূতের দেখা পাই না। আমাদের কষ্টের কথা কার কাছে বলব? আমার কাজ নেই গত ছয় মাস। দেশ থেকে কিছু টাকা আনিয়েছি। হাজার হাজার প্রবাসীর অবস্থা অত্যন্ত করুণ। সত্যি কথা বলতে এখন আর লেবাননে থাকা সম্ভব না। অনেকেই ভয়াবহ বিপদের ঝুঁকি নিয়ে সিরিয়া হয়ে তুরস্ক গিয়ে জড়ো হচ্ছেন। সেখান থেকে চেষ্টা করছেন ইউরোপে ঢোকার। সেটাও খুব কঠিন হয়ে গেছে। লেবাননে না খেয়ে মরার চেয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ছুঁটছেন প্রবাসী বাংলাদেশিরা।

বৈরুত থেকে আরেক প্রবাসী বলছিলেন, হাজার হাজার প্রবাসী বাংলাদেশি শ্রমিকের কাজ নেই। প্রতিদিন কাজ হারাচ্ছেন প্রবাসীরা। গত এক বছরের মধ্যে কোনো কোম্পানি শ্রমিকের বেতন বাড়িয়েছে, এমন একটি নজিরও নেই। আমি আগে বেতন পেতাম ৪৬০ ডলার। গত সেপ্টেম্বর থেকে বেতন পাই লিরায়, যা ৯০ ডলারের মতো। কত কষ্টে যে টিকে আছি, তা আপনাদের বোঝাতে পারব না। দূতাবাস প্রবাসীদের জন্যে কিছুই করছে না। আসলে আমাদের দেখার কেউ নেই।

error: Content is protected !!