হাসিনা-মোদি বৈঠক ডিসেম্বরে: দুয়ার খুলছে তিস্তাসহ গুচ্ছ সমঝোতার

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি আগামী ডিসেম্বরে ভার্চুয়াল বৈঠক করবেন।সূত্র জানিয়েছে, যৌথ নদী কমিশনের (জেআরসি) পরবর্তী বৈঠকের দিনক্ষণ নির্ধারণ এবং তিস্তা, গোমতী-দুধকুমার-ধরলাসহ ছয়টি অভিন্ন নদীর পানিবণ্টনের ব্যাপারে প্রাথমিক সমঝোতার ঘোষণাও আসতে পারে বৈঠক থেকে।

সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন তার দফতরে সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান।

করোনা মহামারীর কারণে বন্ধ থাকা বাংলাদেশ-ভারতের আকাশপথ আবার শুরুর জন্য ‘এয়ার বাবল’ চুক্তি করতে যাচ্ছে দুদেশ। এ চুক্তির বিষয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের যৌথ পরামর্শক কমিশনের (জেসিসি) আজকের বৈঠকে প্রাথমিক সমঝোতা হতে পারে।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. একে আবদুল মোমেন ও ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. সুব্রামানিয়াম জয়শঙ্কর জেসিসির ষষ্ঠ বৈঠকে নিজ নিজ দেশের পক্ষে নেতৃত্ব দেবেন। করোনার কারণে এবার ভার্চুয়ালি বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হবে।

এদিকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির মধ্যে আগামী ডিসেম্বরে বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। কোভিড-১৯ পরিস্থিতির উন্নতি হলে ওই সময় নরেন্দ্র মোদি ঢাকা সফর করবেন। অর্থাৎ ঢাকায় সশরীরে উপস্থিত থেকে বৈঠকে অংশ নেবেন। আর করোনা পরিস্থিতির কারণে সেটি সম্ভব না হলে ভার্চুয়ালি বৈঠকে বসবেন দুই প্রধানমন্ত্রী। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. একে আবদুল মোমেন গতকাল সোমবার মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানিয়েছেন।

সূত্র জানায়, তিস্তা নদীর পানিবণ্টন চুক্তি দীর্ঘদিন ঝুলে আছে। তিস্তা বাংলাদেশের জনগণের আবেগের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরের সময় দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ঘোষণা দিয়েছিলেন- তার মেয়াদেই তিস্তাচুক্তি সম্পাদন হবে। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ারের বিরোধিতায় চুক্তি সম্ভব হয়নি। দ্বিতীয় মেয়াদে মোদি সরকার ক্ষমতায় আসার পর তিস্তাচুক্তির বিষয়ে তাগাদা দেয় ঢাকা। আজকের দুদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে তিস্তাচুক্তির ব্যাপারে প্রাথমিক সমঝোতা হতে পারে। এ ছাড়া অন্য ছয়টি অভিন্ন নদী- মনু, মুহুরী, খোয়াই, গোমতী, ধরলা ও দুধকুমারের পানিবণ্টন চুক্তির ব্যাপারেও প্রাথমিক সমঝোতা হতে পারে। এজন্য জেআরসির বৈঠক দ্রুত আয়োজনের তাগিদ দেবে বাংলাদেশ। সর্বশেষ ১১ বছর আগে জেআরসির বৈঠক হয়েছিল।

দীর্ঘ ছয় মাসেরও বেশি সময় বন্ধ থাকার পর বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে কমার্শিয়াল ফ্লাইট বা বাণিজ্যিক বিমান চলাচল আবার চালু হতে যাচ্ছে। ‘এয়ার বাবল’ চুক্তির অধীনে এ বিমান চলাচল শুরু হবে। দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের জেসিসি বৈঠক শেষে এ বিষয়ে চূড়ান্ত ঘোষণা আসছে বলে সূত্র জানিয়েছে। ‘এয়ার বাবল’ চালু হলে দুদেশের নাগরিকরা জরুরি প্রয়োজনে ভ্রমণ করতে পারবেন। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, কানাডা, জার্মানি, জাপানসহ ১৪টি দেশের সঙ্গে ‘এয়ার বাবল’ স্থাপনে সমঝোতা করেছে ভারত।

ভারতের ঋণ বা লাইন অব ক্রেডিটের আওতায় যেসব প্রকল্প বাংলাদেশে রূপায়ণ হচ্ছে, সেগুলোর মনিটরিংয়ের জন্য সচিব পর্যায়ের একটি কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত আসতে পারে বৈঠক থেকে। মুজিববর্ষ এবং বাংলাদেশ-ভারত কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের সুবর্ণজয়ন্তী উদ্যাপনের রূপরেখা ঠিক হবে বৈঠকে। এ ছাড়া মহাত্মা গান্ধীর জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে বৈঠক থেকে বিশেষ স্মারক ডাকটিকিট অবমুক্ত করবেন দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রী। মহাত্মা গান্ধীর জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে এ বিশেষ স্মারক ডাকটিকিট তৈরি করেছে বাংলাদেশ। এ ছাড়া আজকের বৈঠকে সীমান্তে হত্যা শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা, রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে ভারতের সক্রিয় সহযোগিতা চাইবে। তা ছাড়া বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা যেন ভারতে বিনিয়োগ করতে পারেন তার পথ উন্মুক্ত করতে ও বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর বিষয়েও দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রী আলোচনা করবেন।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. একে আবদুল মোমেন এ বিষয়ে বলেন, জেসিসি বৈঠক নিয়ে কয়েকদিন ধরে আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠক করেছি। ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলাপ করেছি। আমাদের অনেক ইস্যু আছে। ভারত আমাদের প্রতিবেশী এবং বেস্ট ফ্রেন্ড। তবে এবারের জেসিসি বৈঠকে খুব বেশি কিছু আশা করি না। স্বাভাবিকভাবে বৈঠকটি ৩ থেকে ৪ ঘণ্টাব্যাপী হয়; কিন্তু করোনা ভাইরাস পরিস্থিতির কারণে এবার ভার্চুয়ালি মাত্র ১ ঘণ্টার বৈঠক হবে। বৈঠকে কী কী ইস্যু নিয়ে আলোচনা হবে- জানতে চাইলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘পানি, বাণিজ্যসহ দুই পক্ষের সব বিষয়ই আলোচনায় থাকবে।

তিস্তা নিয়ে আলোচনা হবে কিনা- এমন প্রশ্নে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘দুদেশের মধ্যে অনেক নদী রয়েছে। সবগুলো নিয়েই আলোচনা হবে। আমরা চাচ্ছি দুই দেশের মধ্যে যৌথ নদী কমিশনের বৈঠক আবার শুরু হোক। গত ৮-১০ বছর এ বৈঠকটি হচ্ছে না। এই বিষয়ে ভারত রাজি হলে আমাদের সুবিধা হবে। তখন নদী সম্পর্কে আলাপ করা যাবে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, কোভিড নিয়েও আলাপ করব। এই বিষয়ে আমাদের একটা প্রস্তাবনা আছে। তবে সব আলোচনা নির্ভর করবে সময়ের ওপর।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আমরা এর মধ্যে আর নতুন কোনো চুক্তির দিকে যাচ্ছি না। কেননা কিছুদিন পর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বাংলাদেশ সফরে আসবেন। না হয় ভার্চুয়ালি একটি মিটিং হবে আগামী ডিসেম্বরের বিজয় দিবসের দিন। তখন দুই প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে চুক্তি হলে ভালো হবে। এর মধ্যে কোভিড চলে গেলে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বাংলাদেশ সফর করবেন।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে আগামী ডিসেম্বরে বৈঠক হতে পারে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির। করোনা ভাইরাস পরিস্থিতি বিদ্যমান থাকলে বৈঠকটি ভার্চুয়ালি অনুষ্ঠিত হবে। পরিবেশ স্বাভাবিক থাকলে সরাসরি বৈঠকের আয়োজন করা হবে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। সোমবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এ কথা বলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
তিনি বলেন, ‘ভারত আমাদের প্রতিবেশী এবং ভালো বন্ধু। আলোচনা করার মতো অনেক বিষয়ই আমাদের রয়েছে।’

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

error: Content is protected !!