সুস্থভাবে রোজা রাখতে যা করা উচিত ডায়াবেটিস রোগীদের

রোজা ইসলামের ৫টি স্তম্ভের একটি। তাই পবিত্র রমজান মাসে সুস্থভাবে প্রতিটি রোজা রাখতে পারা অত্যন্ত সৌভাগ্যের বিষয়। করোনাভাইরাস মহামারি পরিস্থিতিতে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ঠিক রেখে রোজা রাখার বিষয়ে ডায়াবেটিস রোগীরা কিছুটা উদ্বিগ্ন হলেও, গুরুত্বপূর্ণ কিছু নির্দেশনা মেনে চললে রোজা রাখতে পারার সৌভাগ্য অর্জন সম্ভব।

প্রথমেই রোজা রাখার জন্য শারীরিক অবস্থা উপযুক্ত কিনা, কি ধরনের খাবার কিভাবে, কখন এবং কতোটা খেতে হবে, শারীরিক পরিশ্রম/ব্যায়ামের নিয়ম, ওষুধের সময় ও মাত্রা/পরিমাণ এবং রক্ত পরীক্ষার সময়গুলো জেনে নিতে হবে। 

ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের তিনটি মূল বিষয় হলো- থ্রি ডি অর্থাৎ ডায়েট, ডিসিপ্লিন (শৃঙ্খলা) ও ড্রাগ (ওষুধ)।

ডায়েট:

রোজায় ডায়াবেটিক রোগীদের খাবার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যা মেনে চললে স্বাভাবিকভাবে বা সুস্থ ব্যক্তিদের মতোই রোজা রাখা সম্ভব। ধর্মীয় আচার অনুযায়ী রোজায় সাধারণত আমরা কেবল রাতে খাই, তাই খাদ্য তালিকা অবশ্যই স্বাস্থ্যসম্মত হতে হবে যাতে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে থাকে এবং হাইপো/ হাইপারপ্লাসিয়া না হয়।

ইফতারেরখাবার:

ইফতারের খাবারের পরিমাণ হতে হবে অন্যান্য সময়ের রাতের খাবারের সমপরিমান অর্থাৎ সারাদিনের মোট খাবারের প্রায় এক তৃতীয়াংশ। পানি শুন্যতা দূর করতে ও শরীরের পরিপাক ক্রিয়া স্বাভাবিক রাখতে শরবত, ডাবের পানি, ফলের জুস, লেবুর শরবত, ইসবগুলের ভুষি (চিনি, গুড়, মধু এবং মিষ্টি ছাড়া) ইত্যাদি খাওয়া যাবে। 

ইফতারির খাবারগুলো আমাদের নিজস্ব পছন্দমতো হতে পারে যেমন ছোলা, চটপটি, হালীম, কাবাব, টিকিয়া, পিয়াজু, পাস্তা, নুডলস ইত্যাদি। কিন্তু তা হতে হবে পরিমাণমতো। তবে বাদ দিতে হবে মিষ্টি জাতীয় খাবার।

সন্ধ্যারাতেরখাবার:

এ বেলার খাবারের পরিমাণ হবে অন্যান্য সময়ের সকালের নাশতার পরিমানের সমান অর্থাৎ সবচেয়ে কম যা সারাদিনের মোট খাবারের ১০-২০ শতাংশ। এই বেলার খাবার হতে হবে সুষম যেমন  ভাত, রুটি, খিচুড়ি। সাথে রাখা যেতে পারে মাছ, মাংস, সবজি, শাক, ডাল এবং দুধ।

সেহেরি:

সেহেরির খাবারের পরিমাণ হবে অন্যান্য সময়ের দুপুরের খাবারের সমপরিমাণ অর্থাৎ সবচেয়ে বেশি যা মোট খাবারের ৪০-৪৫ শতাংশ। এ খাবারের সময় হতে হবে সেহেরির শেষ সময়ে যাতে দিনের দীর্ঘ সময়ের মধ্যে হাইপোগ্লাইসেমিয়ার ঝুঁকি তৈরি না হয়। অনেকেই এ বেলায় দুধ-ভাত, কলা বা অন্য ফল মিলিয়ে খেতে চান। তবে মনে রাখতে হবে, এই ৩টি খাবার একসাথে খেলে ডায়াবেটিস বেড়ে যায়। তাই এর মধ্য থেকে যেকোনো দুটি খাবার খাওয়াই ভালো।

এখানে বিশেষভাবে মনে রাখতে হবে যে, সন্ধ্যারাত ও সেহেরিতে কখনোই না খেয়ে রোজা রাখা যাবে না। তাতে স্বাস্থ্য ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। সকল খাবার ঘরে তৈরি হলে তা স্বাস্থ্যসম্মত হতে হবে। বাদ দিতে হবে সব ধরনের ফাস্ট ফুড, জাঙ্ক ফুড, প্রসেস ফুড, চিনি, মিষ্টি, গুড়, মধু ও অস্বাস্থ্যকর সব খাবার। 

ডায়াবেটিসের সাথে অন্য যদি কিডনির রোগ, গাউট, ইউরিক অ্যাসিড বেশি থাকা বা এ ধরনের অন্য কোনো রোগ থেকে থাকে তাহলে রোগের ধরন অনুযায়ী খাবারের ধরন এবং পরিমাণ নির্বাচন করতে হবে, যা অবশ্যই ব্যক্তিভিত্তিক পরিবর্তনযোগ্য।

ড্রাগ/ওষুধ:

ডায়াবেটিস রোগীদের খাবারের পাশাপাশি ওষুধ/ইনসুলিনের ডোজ ও সময় সঠিকভাবে চিকিৎসকের কাছ থেকে রোজার আগে জেনে নিতে হবে। 

শৃঙ্খলা:

ডায়াবেটিস রোগীর রোজা রেখে তারাবিহর নামাজ পড়লে আলাদা করে ব্যায়াম করার প্রয়োজন হয় না।

সারাদিন রোজা রেখে বিকালে বিশ্রাম নিতে হবে, যাতে  হাইপোগ্লাইসেমিয়া প্রতিরোধ করা যায়।

রোজা রেখে ইনসুলিন নেয়া এবং রক্ত পরীক্ষা করা যাবে। তবে ওই রক্ত পরীক্ষার ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে ওষুধের মাত্রা ঠিক করে নিতে হবে।  

তবে বিশেষ ক্ষেত্রে রোজা ভাঙতে হবে যদি- হাইপোগ্লাইসেমিয়ার লক্ষণ দেখা দেয় এবং রক্তের গ্লুকোজ ৩.৯ মিলিমোল/লি এর কম হয়, হাইপোগ্লাইসেমিয়া, রক্তের গ্লুকোজ ১৬.৭ মিলিমোল/লি এর বেশি হলে এবং অন্যান্য যে কোনো অসুস্থতায়।

যাদের জন্য  রোজা রাখা শিথিল করা হয়েছে: ( ইসলামিক আইন অনুযায়ী, ও IDF মতে )

গর্ভকালীন সময়ে, প্রসূতি/Lacteting মায়ের ক্ষেত্রে, অসুস্থ/বয়োবৃদ্ধ ব্যক্তি (যেমন করোনা আক্রান্ত বা অন্য রোগে আক্রান্ত) এবং দীর্ঘপথ ভ্রমণকারী। 

লেখক: শামসুন্নাহার নাহিদ মহুয়া, প্রধানপুষ্টিবিদওবিভাগীয়প্রধান,

পুষ্টিবিভাগবারডেমহাসপাতাল

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

error: Content is protected !!