সবসময় ক্ষমতাসীন ছাত্রনেতারাই কেন অভিযুক্ত হয়?

ধর্ষণ বা গণধর্ষণের অভিযোগ বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় বা কলেজ ক্যাম্পাস গুলোতে নতুন নয়। যখন যে সরকার ক্ষমতায় থাকে তখন সেই দলের ছাত্রনেতাদের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগগুলো ওঠে। তারা এতটাই বেপরোয়া থাকেন যে, তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে—এমনটি তারা মনে করেন না। সর্বশেষ সিলেটের এমসি কলেজে স্বামীকে আটকে রেখে স্ত্রীকে ধর্ষণের ঘটনায় অভিযুক্ত ছয় জনই ছাত্রলীগের রাজনীতিতে সম্পৃক্ত।

নারী নেত্রী খুশি কবীর ইত্তেফাককে বলেন, ‘এসব ধর্ষণ বা গণধর্ষণের ঘটনাগুলোর সঙ্গে ক্ষমতাশালীরা জড়িত থাকায় তাদের বিচার হয় না। আবার অনেক সময় পুলিশ এসব ক্ষমতাশালীদের গ্রেফতারও করে না। আমি তাদের কথা বলছি, যারা রাজনৈতিকভাবে বা আর্থিকভাবে ক্ষমতাশালী। কেউ কেউ গ্রেফতার হলেও তারা আবার জামিনে ছাড়া পেয়ে যাচ্ছে। ফলে এই অপরাধীদের বিরুদ্ধে সমাজে খুব ভালো বার্তা যাচ্ছে না। এই কারণে এদের থামানোও যাচ্ছে না। এই অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা গেলে অবশ্যই অপরাধ কমে যাবে।’

সিলেটের এমসি কলেজের ঘটনার আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র অধিকার সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক হাসান আল মামুন ও যুগ্ম আহ্বায়ক নাজমুল হাসান সোহাগের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ আনেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের এক ছাত্রী। এই ধর্ষণের অভিযোগ দিয়েও বিচার না পাওয়ায় সদ্য সাবেক ভিপি নূরুল হক নুরকেও আসামি করেন এই ছাত্রী। এই ঘটনায় দুটি মামলা হলেও পুলিশ কাউকে গ্রেফতার করেনি। ওই ছাত্রী শুক্রবার সংবাদ সম্মেলন করে বলেছেন, তিনি বিচার না পেলে আত্মহত্যা করবেন।

১৯৯৩ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের এক ছাত্রীকে তুলে নিয়ে গণধর্ষণ করেন ছাত্রদল নেতা সীমান্ত, মিতুল ও জাপানসহ কয়েকজন। পরিসংখ্যান বিভাগের সামনের জঙ্গলের মধ্যে তারা গণধর্ষণ করে। ঘটনার পর তত্কালীন তথ্যমন্ত্রী ব্যারিস্টার নাজমুল হুদা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে যান এবং ছাত্রীর বাবাকে ডেকে সমঝোতা করে দেন। এ ঘটনায় ওই ছাত্রী ক্যাম্পাস ছেড়ে চলে যান; আর কোনো দিন তিনি ক্যাম্পাসে ফেরেননি। এমনকি ছাত্রীর বাবাও কাঁদতে কাঁদতে ক্যাম্পাস চত্বর ছাড়েন। এই ঘটনার পর ১৯৯৫ সালে পরিসংখ্যান বিভাগের এক ছাত্রীকে অর্থনীতি বিভাগের সামনে থেকে প্রকাশ্যে তুলে নিয়ে ধর্ষণ করে আগে অভিযুক্ত ছাত্রদল নেতা সীমান্ত। এই ঘটনায়ও সীমান্তের কোনো বিচার হয়নি।

১৯৯৮ সালে একই বিশ্ববিদ্যালয়ে ধর্ষণের ঘটনায় দেশের সবগুলো বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস উত্তাল হয়ে ওঠে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগের তত্কালীন সাধারণ সম্পাদক জসিম উদ্দিন মানিকের ধর্ষণের সেঞ্চুরির স্বঘোষিত ঘোষণায় সারা দেশে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। এই মানিক বিএনপি আমলে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন। সেসময় প্রায় ছয় মাস বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস বন্ধ থাকে। ঘটনার পর ছাত্রলীগের অনেক নেতাকেই বহিষ্কার করা হয়। আন্দোলনের একপর্যায়ে মানিক দেশ ছেড়ে পালিয়ে যায়। এরপর আর মানিককে কোথাও খুঁজে পাওয়া যায়নি। তার বন্ধু মহলের অনেকেই দাবি করেছেন, ২০১০ সালের ২৪ জানুয়ারি ইতালিতে হার্ট এটাকে মানিক মারা গেছেন।

এরপর ২০০০ সালে থার্টি ফাস্ট নাইটে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বাঁধন নামে এক ছাত্রীকে লাঞ্ছিত করা হয়। তখনও ক্ষমতাসীন ছাত্রনেতাদের বিরুদ্ধে তাকে লাঞ্ছিত করার অভিযোগ ওঠে। এরপর থেকেই থার্টি ফাস্ট নাইটে ছাত্রীদের হলের বাইরে আসা বন্ধ করা হয়। এমনকি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসেও কোনো তরুণীকে থার্টি ফাস্টের প্রোগ্রামে অংশ নিতে দেওয়া হয় না।

২০১৭ সালে মিরপুর সরকারি বাঙলা কলেজের তত্কালীন ছাত্রলীগ সভাপতি এইচ এম জাহিদ মাহমুদের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ তোলেন ছাত্রলীগ নেত্রী ফাতেমাতুজ জোহরা। রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের এই ছাত্রী জাহিদ ছাড়াও মুজিবুর রহমান অনিকসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলেন।

প্রসঙ্গত,শুক্রবার বিকেলে স্বামীর সঙ্গে এমসি কলেজে বেড়াতে গিয়েছিলেন এক গৃহবধূ। সন্ধ্যায় তাদের কলেজ থেকে ছাত্রাবাসে ধরে নিয়ে যায় ছাত্রলীগের ৬-৭ জন নেতাকর্মী। এরপর দুইজনকে মারধর করা হয়। একই সঙ্গে স্বামীকে আটকে রেখে তার সামনে স্ত্রীকে গণধর্ষণ করে তারা। খবর পেয়ে রাতে ছাত্রাবাস থেকে ওই দম্পতিকে উদ্ধার করে পুলিশ। পরে ধর্ষণের শিকার হওয়া নারীকে ওসমানী হাসপাতালের ওসিসি সেন্টারে ভর্তি করা হয়।

এ ঘটনায় শনিবার সকালে ছয়জনের নাম উল্লেখ করে ও অজ্ঞাত দু-তিনজনের বিরুদ্ধে শাহপরান থানায় মামলা করেন নির্যাতিত গৃহবধূর স্বামী।

মামলার আসামিরা হলেন- এমসি কলেজের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী ছাত্রলীগ কর্মী সাইফুর রহমান, শাহ মাহবুবুর রহমান রনি, মাহফুজুর রহমান মাছুম, রবিউল হাসান, তারিকুল ইসলাম তারেক ও অর্জুন লস্কর। এদের সবাই ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। এর মধ্যে তারেক ও রবিউল বহিরাগত, বাকিরা এমসি কলেজের ছাত্র। তবে তারা সবাই আওয়ামী লীগের সাবেক যুব ও ক্রীড়া বিষয়ক সম্পাদক রঞ্জিত সরকারের অনুসারী বলে জানা গেছে।

গণধর্ষণের ঘটনার পর রাতভর ছাত্রাবাসে অভিযান চালিয়ে বেশ কিছু আগ্নেয়াস্ত্র, ধারালো অস্ত্র ও ছোরা উদ্ধার করে পুলিশ। তবে বিকেল পর্যন্ত আসামিদের কাউকে গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

error: Content is protected !!