লকডাউন প্রত্যাহারে ৬ শর্ত দিলো বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা

করোনাভাইরাস ঠেকাতে হিমশিম খাচ্ছে পুরো বিশ্ব। প্রতিদিনই বাড়ছে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা।আর করোনা জেরে বিশ্বের প্রায় প্রতিটি বড় শহরেই চলছে লকডাউন পরিস্থিতি। বন্ধ রয়েছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে পর্যটন, ব্যবসা-বাণিজ্যও। মানুষকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে প্রয়োজন ছাড়া বাড়ির বাইরে না বের হতে। এমন পরিস্থিতিতে এরই মধ্যে বিশ্ব অর্থনীতিতে এর মারাত্মক প্রভাব পড়েছে। বিভিন্ন দেশে বাড়ছে কর্মহীন মানুষের সংখ্যাও।

ফলে করোনা সঙ্কটে বিপর্যস্ত হয়েও ইতালি, স্পেন, ফ্রান্সসহ অনেক দেশ পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন শহর থেকে লকডাউন প্রত্যাহারের কথা ভাবছে। এমনকি করোনা বিপর্যয়ে তুঙ্গে থেকেও যুক্তরাষ্ট্রের বেশকিছু শহরে লকডাউন শিথিলের ব্যাপারে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এমন পরিস্থিতিতে বিষয়টি নিয়ে গত মঙ্গলবার মুখ খুলেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)।

সংস্থাটি বলছে, কোনো দেশ লকডাউন উঠানো বা বিধিনিষেধ প্রত্যাহারের ক্ষেত্রে ছয়টি বিষয় মেনে চলতে হবে। এগুলো হলোÑ ভাইরাসটি ছড়ানো বন্ধ হয়েছে সে বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া, স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় নতুন আক্রান্তদের দ্রুত শনাক্ত, পরীক্ষা, বিচ্ছিন্ন এবং চিকিৎসার পাশাপাশি তাদের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগগুলোর সন্ধানের সক্ষমতা থাকা, রোগের প্রার্দুভাব কমে আসা, সব কর্মক্ষেত্র, স্কুল এবং দোকানগুলোতে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা স্থাপন, আমদানি ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং প্রতি সম্প্রদায়কে করোনা সম্পর্কে শিক্ষিত হবে ও নতুন পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার ক্ষমতা থাকতে হবে।

ডব্লিউএইচও জানায়, ২০০৯ সালের ফ্লুর তুলনায় করোনা ১০ গুণ ভয়ঙ্কর, যা খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং নির্মূল হতেও অনেক সময় লাগে। তাই প্রতিটি দেশকে ভাইরাস ছড়ানোর ব্যবস্থাকে নির্মূল করে জীবন বাঁচাতে সর্বাত্মক চেষ্টা করতে হবে। একইসঙ্গে দেশগুলোকে অবশ্যই ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে করোনায় মৃত্যুর হার এবং স্বাস্থ্য ব্যবস্থার কারণে এবং অন্যান্য আর্থ-সামাজিক প্রভাবের কারণে অন্যান্য রোগে আক্রান্ত হওয়ার পরিস্থিতির মধ্যে। ডব্লিউএইচও প্রধান ডা. টেড্রোস অ্যাডহানম গেব্রিয়েসুস বলেন, করোনা যত দ্রুত ছড়ায় ঠিক তার কম সময়ে শরীর থেকে বিদায়ও নেয়। তারপরও এখন যেহেতু মহামারী পরিস্থিতি সেক্ষেত্রে কোনো দেশ যদি পুরোপুরি রোগ নির্মূল হওয়ার আগে লকডাউন তুলে নেয়, সেক্ষেত্রে আবারও তা ফিরে আসার সম্ভাবনা আছে।

এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির বায়ো মেডিক্যাল সায়েন্সসহ আরও কয়েকটি দেশের গবেষকরা দাবি করেছিলেন যে, যাদের যক্ষ্মা বা ব্যাসিলাস ক্যালমেট গুয়েরিন (বিসিজি) টিকা নেওয়া রয়েছে, তাদের কেউ করোনা আক্রান্ত হলে শ্বাসনালী ও ফুসফুস তুলনামূলকভাবে কম ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যেসব দেশে বিসিজির টিকা দেওয়া হয় না সেখানে কোভিড-১৯ মারাত্মক আকার নেয় এবং মৃত্যুহারও তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি। যারা এতে আশার আলো দেখছিলেন তাদের জন্য দুঃসংবাদ দিয়েছে ডব্লিউএইচও। তারা বলছে, বিসিজি টিকায় করোনা ভাইরাস ঠেকানো যায় এর পক্ষে এখনো কার্যকর প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

মঙ্গলবার নিজেদের টুইটার অ্যাকাউন্টে এক বিবৃতিতে ডব্লিউএইচও বলেছে, বিসিজি টিকা মূলত দেওয়া হয় টিউবারকিউলোসিস প্রতিরোধে। করোনা প্রতিরোধে তারা এখনো এই টিকা নেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছে না। তবে পরীক্ষামূলকভাবে প্রমাণ হয়েছে যে, জীবজন্তু ও মানুষের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতায় বিসিজি টিকার অনির্দিষ্ট প্রভাব রয়েছে। কিন্তু এই প্রভাব এখনো স্পষ্ট নয়। এ নিয়ে দুটি চিকিৎসাসংক্রান্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে। যদি প্রমাণ মেলে তা খতিয়ে দেখবে ডব্লিউএইচও। কিন্তু এখনই যদি করোনা সারাতে বিসিজি টিকা কাজে লাগে বলে খবর ছড়িয়ে দিয়ে এটি স্থানীয় বাজার থেকে তুলে নেওয়া হয়, তবে টিবি রোগীর সংখ্যা বেড়ে যেতে পারে, মৃত্যুও বিচিত্র নয়।

একইদিন জেনেভায় এক সংবাদ সম্মেলনে ডব্লিউএইচও মুখপাত্র ডা. মার্গরেট হ্যারিস জানিয়েছেন, যত আশার কথাই শোনানো হোক না কেন নোভেল করোনা ভাইরাসের টিকা আসতে আরও কমপক্ষে এক বছর লাগবে। তাই রাতারাতি কিছুর প্রত্যাশা না করাই ভালো।

প্রসঙ্গত,বিশ্বে করোনাভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা ২০ লাখ ছাড়িয়ে গেছে। ২১০টি দেশ ও অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়া করোনায় মোট আক্রান্তের সংখ্যা এখন ২০ লাখ ১৭ হাজার ৮১০। করোনায় আক্রান্ত হয়ে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে এক লাখ ২৮ হাজার ৪১ জন।

বুধবার (১৫ এপ্রিল) সন্ধ্যা ৬টায় করোনা মহামারির আন্তর্জতিক জরিপ সংস্থা ওয়ার্ল্ডোমিটার এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

error: Content is protected !!