যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন রাজ্যে লকডাউন বিরোধী বিক্ষোভ, ট্রাম্পের সমর্থন

ক্ষুদ্র এক ভাইরাসের ধরাশায়ী বিশ্বের সুপার পাওয়ার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে দেশটিতে ২৪ ঘণ্টায় ৪ হাজার ৪৯১ জনের মৃত্যু হয়েছে, যা একদিনে সর্বাধিক। এ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে এ রোগে মৃতের সংখ্যা ৩৭ হাজার ৯৪৩ জন।আক্রান্ত হয়েছেন ৭,১৫,৫৬৭
৭ লাখ ১৫ হাজার ৫৬৭ জন। আর সুস্থ হয়েছেন ৬৩ হাজার ৮৪১ জন। এর মধ্যে গত ২৪ ঘণ্টায় নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যে আরও ৫৪০ জনের মৃত্যু হয়েছে। খবর: সিএনএন।
এদিকে, করোনাভাইরাসের প্রতিরোধে সারা আমেরিকায় চলছে লকডাউন। প্রায় সবাই ঘরবন্দী জীবন কাটাচ্ছে। কিন্তু দীর্ঘ প্রায় এক মাস পর আমেরিকানরা আর ঘরে থাকতে চাচ্ছে না। মানুষ কর্মহীন, দূর্বল হচ্ছে দেশটির অর্থনীতি। তাই তারা কাজে ফিরছে চাইছে। আর এই দাবিতে আমেরিকার মিশিগান, ওহাইও, কেনটাকি, মিনেসোটা, নর্থ ক্যারোলাইনা ও ইউটাহসহ বেশ কয়েকটি অঙ্গরাজ্যে ‘স্টে হোম’ আদেশের বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমেছে সাধারণ মানুষ।
অন্যদিকে, লকডাউনবিরোধী বিক্ষোভকারীদের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। একাধিক টুইট বার্তায় তিনি এই সমর্থন জানান। সিএনএন-এর প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘স্টে হোম’ আদেশের বিরুদ্ধে অঙ্গরাজ্যগুলোর রাজধানীতে হাজার হাজার সাধারণ মানুষ এই বিক্ষোভে যোগ দেয়।

মিশিগানের গভর্নর গ্রিচেন হুইটমার বলেন, মানুষ ঘরে থাকতে থাকতে বিরক্ত হয়ে গেছে। তারা তাদের নানা ধরনের বিল পরিশোধ নিয়ে উদ্বিগ্ন। এ কারণেই রাস্তায় নেমে তারা বিক্ষোভ করছে। তিনি বলেন, ‘আমি প্রতিবাদের অধিকারকে সম্মান করি, কিন্তু এখানে সমবেত হাজার হাজার মানুষ নিজেদের করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকির মধ্যে ফেলছেন।’

প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৫ এপ্রিল প্রথমে মিশিগানের রাজধানী ল্যান্সিংয়ে গভর্নর গ্রিচেন হুইটমারের ‘স্টে হোম’ আদেশের বিরুদ্ধে হাজারো নাগরিক বিক্ষোভ শুরু করেন। রাজ্যের বিভিন্ন স্থান থেকে বিক্ষোভকারীরা ল্যান্সিংয়ে সমবেত হন। এই বিক্ষোভের নাম দেওয়া হয়েছে ‘অপারেশন গ্রিডলক’। আয়োজকেরা বিক্ষোভের জন্য একটি গাইড লাইন তৈরি করেছিলেন, এতে গাড়িতে বসে বিক্ষোভ প্রদর্শন করার অনুরোধ জানানো হয়। বিক্ষোভের ফলে রাজধানীতে যানজট দেখা দিয়েছিল। বিক্ষোভকালে অধিকাংশ বিক্ষোভকারী গাড়িতে অবস্থান করছিলেন। তবে কেউ কেউ গাড়ি থেকে নেমে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন।

টম হুগে নামে একজন বিক্ষোভকারী ফোর্ড মোটর কোম্পানিতে কাজ করেন, পাশাপাশি একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীও। তিনি বলেন, ‘বুঝতে পারছি করোনাভাইরাস ভয়ঙ্কর। এটা সামাল দেওয়া অনেক গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু আমরা আর কতদিন ঘরের মধ্যে বন্দী থাকব। এভাবে চলতে থাকলে আমরা চলব কীভাবে।’

এদিকে গভর্নর গ্রিচেন হুইটমার ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত রাজ্যে ‘স্টে হোম’ আদেশের সময় বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন। এই সময়ের মধ্যে কেউ কোথাও ভ্রমণ করতে পারবেন না। এ ছাড়া কেউ বাইরে অযথা ঘুরতে পারবেন না এবং কারও বাসায় কোনো অতিথি আসা যাবে না।

নিক সম্বার নামের একজন বিক্ষোভকারী বলেন, ‘বিক্ষোভে আসা সবার করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। তারপরও আমরা একে অন্যের থেকে ছয় ফুট দূরত্বে দাঁড়িয়ে বিক্ষোভ করেছি।’

বিক্ষোভ প্রসঙ্গে মিশিগান নার্সেস অ্যাসোসিয়েশন একটি বিবৃতি দিয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, এই বিক্ষোভ দায়িত্বজ্ঞানহীনতার পরিচয় প্রকাশ করেছে। আমরা মানুষের কাছে হাত জোড় করে বলছি, দয়া করে আপনারা ঘরেই থাকুন।

মিনেসোটার গভর্নর টিম ওয়ালজের জারি করা ‘স্টে হোম’ আদেশের বিরুদ্ধে সেন্ট পলে গভর্নরের বাসভবনের সামনে বিক্ষোভ করেছে রাজ্যের নাগরিকেরা। এই রাজ্যে আগামী ৩ মে পর্যন্ত ‘স্টে হোম’ বাড়িয়েছে গভর্নর টিম ওয়ালজ।

না প্রকাশ না করার শর্তে বিক্ষোভকারীদের একজন মুখপাত্র বলেন, ‘স্টে হোম’ আদেশের কারণে মিনেসোটায় অর্থনৈতিক সংকট শুরু হয়েছে। এ কারণে আরও অন্যান্য সমস্যাসহ সাধারণ মানুষ হতাশায় ভুগছে। তাই বাধ্য হয়ে মানুষ এই আদেশের বিরুদ্ধে বিক্ষোভে নেমেছে।

এ বিষযে মিনেসোটার গভর্নর টিম ওয়ালজের অফিস থেকে দেওয়া এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, এই মহামারির সময়েও গণতন্ত্রের চর্চা অব্যাহত থাকুক। কারণ, এটি মানুষের সাংবিধানিক অধিকার। আমরা বিক্ষোভকারীদের শুধু বলব, স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলুন। নিজে, পরিবার ও মিনেসোটাবাসীদের বাঁচান। সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে বিক্ষোভ করুন।

এর আগে টিম ওয়ালজ বলেছিলেন, রাজ্য খুলে দেওয়ার আগে বিপুল হারে করোনা পরীক্ষা করে শনাক্ত করা জরুরি। তবে এটা শুরু হয়েছে বলে ওই বিবৃতিতে জানানো হয়েছে।

কেনটাকি
কেনটাকির রাজধানী ফ্রাঙ্কফোর্টে গভর্নর অ্যান্ডি বেশিয়ারের ‘স্টে হোম’ আদেশের বিরুদ্ধে ১৫ এপ্রিল বিক্ষোভ হয়। ঠিক সেই সময় গভর্নর প্রতিদিনের নিয়মিত প্রেস ব্রিফিং করছিলেন। এর সামনেই বিক্ষোভকারীরা বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন।

এ প্রসঙ্গে গভর্নর অ্যান্ডি বেশিয়ার বলেন, ‘স্টে হোম’ আদেশের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ হয়েছে। বিক্ষোভকারীরা এই মুহূর্তে রাজ্যের সবকিছু খুলে দিতে বলেছেন। কিন্তু এসব বিক্ষোভের কারণেই আসলে অনেক মানুষের মৃত্যু হবে। এমন চলতে থাকলে অবশ্যই মানুষের মৃত্যু হবে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন বিক্ষোভকারী বলেন, বাইরে মুক্ত বাতাস। আমরা সামাজিক দূরত্ব মেনেই বিক্ষোভ করছি। আমার ধারণা, এতে আমরা কারও ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াব ন। কিন্তু কাজে যেতে না দিয়ে ঘরবন্দী করে গভর্নর আমাদের অনেক ক্ষতি করছেন।

ইউটাহ
অঙ্গরাজ্যের ওয়াশিংটন কাউন্টিতে ১৫ এপ্রিল ‘স্টে হোম’ আদেশের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ হয়। এ সময় বিক্ষোভকারীরা গভর্নর গ্যারি হার্বার্টের জারি করা এই আদেশকে সাংবিধানিক বলে স্লোগান দিতে থাকেন।

ইউটাহর সেকেন্ড কংগ্রেশনাল ডিস্ট্রিক্ট থেকে রিপাবলিকান প্রার্থী মারি বার্কেট এই বিক্ষোভে অংশ নিয়েছিলেন। তিনি বলেন, কীভাবে নিজেদের সুরক্ষিত রাখা যায়, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার যথেষ্ট দক্ষতা আমেরিকার নাগরিকদের আছে। তাই তাদের ঘরবন্দী করে রাখার মানে নেই।

প্রতিবেদনে বলা হয়, সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমের একটি গ্রুপ ইউটাহ ওয়াক ফর ফ্রিডম এই বিক্ষোভের আয়োজন করে। তবে বিক্ষোভকারীরা সবাই নিজিদের সুরক্ষিত রেখে এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখেই অংশ নেয়। তাঁরা দাবি জানায়, শিগগির রাজ্যের সব নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে হবে।

রাজ্যে গভর্নর গ্যারি হার্বার্ট আগামী ১ মে পর্যন্ত ‘স্টে হোম’ আদেশের দিন বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন।

নর্থ ক্যারোলাইনা
নর্থ ক্যারোলাইনার রালিহ শহরে গভর্নর রয় কুপারসের জারি করা ‘স্টে হোম’ আদেশের বিরুদ্ধে ১৪ এপ্রিল বিক্ষোভ করে অঙ্গরাজ্যের নাগরিকেরা। রালিহ শহরের পুলিশ জানিয়েছে, বিক্ষোভকারীরা গভর্নরের নির্বাহী আদেশ লঙ্ঘন করে বিক্ষোভ করেছে। এ ঘটনায় একজন বিক্ষোভকারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

অ্যাশলে স্মিথ নামের একজন বিক্ষোভকারী বলেন, সৃষ্টিকর্তা আমাদের যে অধিকার দিয়েছে, অথচ গভর্নর তা খর্ব করে আমাদের সবকিছু বন্ধ করে দিয়েছেন।

ডেভিড ইংস্ট্রম নামের আরেকজন বিক্ষোভকারী বলেন, রাজ্যে অর্থনৈতিকভাবে মহাবিপর্যয় নেমে আসছে। এটা কোভিড-১৯ সমস্যার চেয়েও অনেক বেশি ভয়াবহ হবে।

গভর্নর রয় কুপারস বলেন, করোনাভাইরাস প্রতিরোধে রাজ্যে আরও পরীক্ষা বাড়াতে হবে এবং কনট্যাক্ট ট্রেসিং করতে হবে। তবে রাজ্যে ‘স্টে হোম’ আদেশের মেয়াদ বাড়ানো হবে কিনা সে সম্পর্কে স্পষ্ট করে কিছু বলেননি। রাজ্যে ২৯ এপ্রিল পর্যন্ত এই আদেশ জারি আছে। এই সময়ের মধ্যে ১০ জন মানুষের বেশি কোথায় ভিড় জমানো যাবে না।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ১৩ এপ্রিল ওহাইও অঙ্গরাজ্যের গভর্নর মাইক ডিওয়াইন করোনাভাইরাস পরিস্থিতি নিয়ে নিয়মিত প্রেস ব্রিফিং করছিলেন। ঠিক এই সময় কলম্বাস শহরে গভর্নরের আদেশের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ শুরু করেন রাজ্যের নাগরিকেরা। বিক্ষোভকারীরা রাজ্য খুলে দেওয়ার দাবিতে নানা স্লোগান দিতে থাকেন।

গভর্নর মাইক ডিওয়াইনের ‘স্টে হোম’ আদেশ বলবৎ আছে আগামী ১ মে পর্যন্ত ।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

error: Content is protected !!