মুমীনের জীবনে করোনা ভাইরাস

“করোনা ভাইরাস” এটাকে এই মুহূর্তে নতুন করে পরিচয় করানোর প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না। প্রথম বিশ্ব থেকে তৃতীয় বিশ্ব, শহর থেকে গ্রাম, ধনী থেকে দরিদ্র, সমাজের উচু মহল থেকে সমাজের নিচু মহল সবার কাছেই এটা পরিচিত যৌগিগ শব্দ। পরিচয় টা ভালবাসার নয় বরং আশংকার। প্রেমময় নয় বরং ভীতিকর।

এর যথেষ্ট কারণও আছে। এটা এমন রোগ যেটা স্পর্শে ছড়ায়, কিছু ক্ষেত্রে নিঃশ্বাসেও ছড়ায়। রোগ তো কত কিছুই আছে কিন্তু এটা নিয়ে আতংকিত হওয়ার কারণ হচ্ছে এ রোগের এখন পর্যন্ত কোনো ভেকসিন আবিষ্কার হয়নি। আক্রান্ত হলে ব্যক্তির নিজস্ব রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এটাকে মোকাবেলা করতে না পারলে মৃত্যু মোটামুটি নিশ্চিত বলা যায়। বিশ্বের প্রথম সারির দেশগুলো আজ প্রতিদিনই মৃত্যের মিছিল দেখে। সবাই আতংকিত। কে কখন মৃত্যুর মিছিলে শামিল হয়ে যায় বলা যায় না। রোগটি ছোঁয়াচে হওয়ার কারণে আক্রান্ত ব্যক্তির কাছে কেউ যেতে চায় না বা চাইলেও যাওয়া যায় না। এমনকি এ রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির মৃত্যু হলে কাফন দাফনেও রয়েছে সীমাবদ্ধতা।

আমরা মৃত্যু ভয়ে ভীত। ভীত হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু কোন কারণে ভীত হওয়া উচিৎ তা আমরা অনেকেই জানি না। মূল কারণ হচ্ছে আমাদের পরকাল কেমন হবে এই ভয়ে ভীত হওয়া প্রয়োজন। মৃত্যু পরবর্তী জীবনে আমলনামা যদি ভাল না হলে খুবই বিপদ। কিন্তু যদি মৃত্যু পরবর্তী জীবনে আমলনামা ভাল হয়ে যায় তবে এমন নেয়ামতপূর্ণ পরকাল হবে যেটা দুনিয়ার জীবনের আরাম আয়েশের তুলনায় অনেক অনেক বেশি। একজন মুমীনের জীবনে করোনা ভাইরাসের প্রভাব কেমন হওয়া উচিৎ এ বিষয়ে কথা বলতেই কলম ধরা।

শুরুতে মুমীনের একমাত্র গ্রহণযোগ্য ধর্ম ইসলাম এ রোগের ব্যাপারে কী বলছে একটু জানা যাক। ছোঁয়াচে রোগের অস্তিত্ব সম্পর্কে ইসলাম কী বলে? রাসূলূল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন “সংক্রমণ রোগ বলতে কিছু নেই” আবার বলেছেন: “তোমরা সিংহ থেকে পালানোর ন্যায় কুষ্ঠরোগী (চামড়া বাহিত ছোঁয়াচে রোগ) থেকে পালাও” (বুখারী) । তাহলে এখন কী বুঝবো? ছোঁয়াচে রোগ আছে নাকি নেই? হাদীস বিশারদগণ এ হাদীস গুলোর ব্যাখ্যা এভাবে করেছেন যে, সংক্রমণ রোগ আছে তবে ঐ রোগের নিজস্ব কোনো ক্ষমতা নেই ছড়ানোর বরং আল্লাহ তায়ালা ঐ রোগকে ছড়ানোর ক্ষমতা প্রদান করেন অতঃপর আল্লাহ থেকে প্রাপ্ত ক্ষমতা বলে এটা ছড়িয়ে পড়ে।

একটা উদাহরণ দেই- একটা বৈদ্যুতিক তারে যতক্ষণ পর্যন্ত বিদ্যুৎ সংযোগ দেয়া হবে না ততক্ষণ পর্যন্ত সেটাতে বিদ্যুৎ আসবে না। তারের নিজস্ব ক্ষমতা নেই বিদ্যুৎ উৎপাদনের। বরং বিদ্যুৎ সংযোগ পেয়ে সে নিজের কাজ করে। ক্রেডিট তারের নয় বরং বিদ্যুতের। ঠিক এভাবেই ছোঁয়াচে বা সংক্রমণ রোগ। নিজস্ব ক্ষমতা নেই ছড়িয়ে পড়ার বরং আল্লাহ তায়ালার নিকট থেকে ক্ষমতা পেয়ে তাঁর ক্ষমতায় ছড়িয়ে পড়ে।

যেহেতু ছোঁয়াচে রোগের অস্তিত্ব আছে তবে কোথাও এটা ছড়িয়ে পড়লে করণীয় সম্পর্কে ইসলামের বক্তব্য জানা প্রয়োজন। রাসূলূল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: “যদি কোথাও (ছোঁয়াচে) মহামারী ছড়িয়ে পড়ে তবে তোমরা সেখানে যেও না, যদি তোমরা মহামারী স্থলে থাকো তবে সেখান থেকে বের হবে না”

ফিলিস্তিনের আমওয়াস শহর। মসজিদে আকসা উদ্ধারের পর মুসলিম বাহিনী সে শহরে অবস্থান করছিল। সেনাপতি ছিলেন হযরত আবু উবাইদা ইবনুল জাররাহ। তখন সেখানে মহামারী চলছিল। মুসলিম জাহানের খলীফা তখন হযরত ওমর রাঃ। হযরত ওমর রাঃ রাষ্ট্রীয় সফরে আমওয়াস শহরের দ্বার প্রান্তে। এমতাবস্থায় ওমর রাঃ এর নিকট সংবাদ পৌঁছল আমওয়াসে মহামারী চলছে। মহামারী চলমান অবস্থায় ওমর রাঃ সেখানে প্রবেশ করবেন কি না এ ব্যাপারে পরামর্শ সভা আহ্বান করলেন। একাংশ বললেন খলীফাতুল মুসলিমীন আপনি প্রবেশ করবেন না। অপরাংশ বললেন আপনি আল্লাহর উপর ভরসা করে প্রবেশ করুন। তখন সেখানে আব্দুর রহমান ইবনে আউফ রাঃ এসে উপস্থিত হলেন। বললেন- খলীফাতুল মুসলিমীন এ ব্যাপারে আমার কাছে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীস আছে। এ কথা বলে কোথাও মহামারী হলে সেখানে বাহির থেকে প্রবেশ না করার হাদীসটি বললেন। অতঃপর ওমর রাঃ প্রবেশ ব্যতীত সেখান থেকে মদীনা ফিরে এলেন। (কোনো বর্ণনায় সিরিয়ার কথা উল্লেখ রয়েছে)

এ হাদীস এবং সিংহ থেকে পালানোর ন্যায় ন্যায় ছোঁয়াচে রুগে আক্রান্ত ব্যক্তি থেকে পালানোর কথায় বুঝা গেল ছোঁয়াচে রোগ থেকে বেঁচে থাকার জন্য সতর্কতা প্রয়োজন। আর এই সতর্কতা আল্লাহর উপর ভরসার পরিপন্থী নয় বরং আল্লাহর উপর ভরসা রাখতে হবে এবং সতর্কও থাকতে হবে।

কিন্তু সতর্ক থাকার পরও কেউ যদি মহামারী রোগে আক্রান্ত হন তাহলে এটা কি ঐ ব্যক্তির জন্য শাস্তি স্বরূপ? এটার তিনটি উত্তর রয়েছে-

১. এরকম রোগ ঐ ব্যক্তির কর্মের ফল। কারণ আল্লাহ বলেছেন : “জলে স্থলে প্রকাশিত ফাসাদ মানুষের হাতের কামাই” (সূরা শুরা, আ. নং ৩০) ।
২. এরকম রোগ দিয়ে আল্লাহ মানুষকে পরীক্ষা করেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন : “আমি অবশ্যই তোমাদেরকে ভয়, ক্ষুধা, জান মাল সম্পদ ও ফসলাধি বিনষ্ট করার মাধ্যমে পরীক্ষা করব। যারা ধৈর্য্য ধারণ করবে তাদের জন্য সুসংবাদ” (সূরা বাক্বারা, আ. নং ১৫৫)
৩. রোগের মধ্যেও হয়তো কোনো কল্যাণ রয়েছে যেটা মানুষ দেখছে না। এ ব্যাপারে আল্লাহ বলেন: “তোমরা নিজেদের জন্য এমন কিছু অপছন্দ করছো অথচ এরমধ্যে তোমাদের কল্যাণ রয়েছে, আর তোমরা এমন কিছু পছন্দ করছো যার মাঝে তোমাদের ক্ষতি রয়েছে। আল্লাহ তায়ালা যা জানেন তোমরা তা জানো না।” (সূরা বাক্বারা, আ.ন : ২১৬)

তাহলে বুঝা গেলো বর্তমান করোনা ভাইরাস কারো জন্য কর্মফল, কারো জন্য পরীক্ষা আর কারো জন্য ভাল কিছুর মাধ্যম। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন “মহামারী মুমীনের জন্য রহমত” (ইবনে আবি শাইবা)। তিনি আরো বলেছেন :“মহামারী আক্রান্ত এলাকায় কেউ যদি আল্লাহর উপর ভরসা করে সবর করে অবস্থান করে এবং সে এমতাবস্থায় মৃত্যু বরণ করে তবে সে শহীদ”। হযরত আবু উবাইদা রাঃ, মুআজ ইবনে জাবাল রাঃ সহ অনেক সাহাবায়ে কেরাম ফিলিস্তিনের আমওয়াস শহরে মহামারীতে আক্রান্ত হয়ে শহীদ হয়েছেন।

তাই মহামারী করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হলেই নিরাশ হওয়ার কোনো কারণ নেই। পৃথিবীর সবকিছু মরণশীল। আল্লাহ তায়ালা ছাড়া সবাইকেই ইন্তেকাল করতে হবে। “মৃত্যু” যে ব্যাপারে কোনো মতানৈক্য নেই। আর ঈমানদার বিশ্বাস করে মৃত্যুর সময় আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত। কারণ আল্লাহ বলেছেন- “যখন মৃত্যুর সময় আসবে তখন এক মূহুর্ত দেরি করা হবে না, আবার এক মূহুর্ত এগিয়েও আনা হবে না”। ঈমানদারের কাজ হচ্ছে আল্লাহ্‌র উপর ভরসা করে সতর্ক থাকা। যখন মৃত্যু হওয়ার তখন হবে, এটা কেউ ফেরাতে পারবে না।

আর করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে কারো যদি ইন্তেকাল হয় ইনশাআল্লাহ তার শহীদী মৃত্যু হবে। পরকালের নেয়ামতের তুলনায় দুনিয়ার নেয়ামত কিছুই নয়। আমাদের মৃত্যুর জন্য নয় বরং মৃত্যু পরবর্তী জীবনের জন্য করা উচিৎ। মৃত্যু পরবর্তী জীবনে সাওয়াবের আমলনামা ভারী না হলে কিন্তু বিপদ। আর প্রত্যাশা হচ্ছে যদি করোনার মাধ্যমে কারো মৃত্যু হয় তবে শহীদ হিসেবে ইনশাআল্লাহ জান্নাতের উচু আসনে সমাসীন হবেন।

সর্বশেষ একটি বিষয় বলে শেষ করতে চাই, করোনা মানেই মৃত্যু নয়। ভেকসিন না থাকার পরও রিকোভারী রেইট অনেক ভাল। নাইজেরিয়ার একজন সরকারী কর্মকর্তা শুধুমাত্র কালোজিরা আর মধু খেয়ে সুস্থ হয়েছেন। হ্যাঁ! যাদের হায়াত শেষ হচ্ছে তাদের মৃত্যু হচ্ছে। আর করোনা আক্রান্ত কাউকে স্পর্শ করলেই নিজের মাঝে ছড়িয়ে পড়বে এমনও নয়। বরং আল্লাহর হুকুম লাগবে। এমন অনেক পরিবারকে আমি চিনি, যে পরিবারে করোনা আক্রান্ত ব্যক্তির উপস্থিতি থাকা সত্ত্বেও অনেকের হয়নি। মৃত ব্যক্তিকে দাফন করলেই করোনা হয়ে যাবে এমনও নয়। করোনা আক্রান্ত ব্যক্তি শহীদ। তাই আক্রান্ত ব্যক্তিকে হীন মনে করা উচিত নয় বরং এটা পাপ। মৃত ব্যক্তিকে যথাযোগ্য সম্মান প্রদান করে দাফন করা উচিৎ।

আসুন রোগের কারণে ভীত সন্ত্রস্ত না হয়ে আল্লাহর উপর ভরসা করে সতর্কতা অবলম্বন করি। করোনাকে আল্লাহর পক্ষ থেকে আমাদের জন্য সংকেত মনে করি। আমরা তাঁর দিকে ফিরে যাই। আল্লাহ তায়ালা যেন আমাদেরকে দ্রুত সময়ে এ অবস্থা থেকে মুক্তি দেন। আমাদের সবাইকে যেন হেফাজত করেন।

লেখক : মুহাম্মাদ ওয়ালিদ আল হামিদী

error: Content is protected !!