ভাষা বড় বিচিত্র এক বস্তু, বিচিত্র তার ইতিহাস

সৌরদীপ চট্টাপাধ্যায়

আজ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। সারা পৃথিবীর সমস্ত মাতৃভাষার দিন আজ-ঊনসত্তর বছর আগে যার পথ দেখিয়েছিল একদল বাঙালি ছাত্র। ভাষা বড় বিচিত্র এক বস্তু, বিচিত্র তার ইতিহাস। বোধ হয় তার থেকেও বিচিত্র হল-তাকে নিয়ে ঝগড়া করা। মজার কথা হল, এই ঝগড়া করতে গেলেই প্রায়ই সেমসাইড গোল হয়ে যায়। অথচ আমরা খেলাটা এতই কম বুঝি যে, ওতেই ধেই ধেই করে নাচতে থাকি, বুঝিও না যে বল কোন পোস্টে ঢুকল। চলুন সেরকমই কিছু গল্প হোক একটু।

আজ থেকে এক হাজার বছর আগে হিন্দুকুশ পেরিয়ে ভারতে অভিযান চালিয়েছিলেন মুহম্মদ ঘুরী, তার পাঁচশো বছর পরে বাবর। আজ একশ্রেণির বাঙালি রোজ ভয়ে দিন গুনছেন, এই বুঝি সেইরকম কোনও সৈন্য ইছামতী পেরিয়ে বনগাঁর দিকে ধেয়ে আসে। তারা সেই যুদ্ধের বিরুদ্ধে চোলায় চোলায় জয়ের ভেরি বাজাতে চান। ফলে বাংলায় কেন আরবি শব্দ থাকবে, কেন ফারসি থাকবে, ‘পানি’ বলা হবে, কেন ‘গোসল’ শব্দটি থাকবে-সেসব নিয়ে ঘোর আপত্তি তুলছেন। খুবই সঙ্গত দাবি। তবে তাহলে বোধ হয় তাদের উচিত, আইনকানুনের জন্য উকিলের কাছে না যাওয়া, মহকুমা কোনটা সেটাও না দেখা, অন্যকে হাজতবাসের ভয় না দেখানো বা কলকাতার বাইরে কোনও জেলার বাসিন্দা হলে সেটাও না বলা। কেননা-‘আইন’, ‘কানুন’, ‘উকিল’, ‘মহকুমা’, ‘হাজত’, ‘জেলা’ (দিলা) ইত্যাদি সবই আসলে আরবি শব্দ। আপনি ইংরেজিতে পেন না বলে বাংলায় কলম বলুন, সে কলমও আসলে আরবি। কাউকে বিদায় দিতে চাইবেন, সেই ‘বিদায়’-ও আরবি। আমার কথা নয়, স্বয়ং সুকুমার সেন ‘ভাষার ইতিহাস’ বইতে এসব লিখে গেছেন। চাইলে কোনও অভিধান খুলেও শব্দমূল দেখে নিতে পারেন।
শুধু কি তাই? আপনি যে শব্দের আগে বসান ‘আম-আদমি’, ‘আমজনতা’, ‘খাসজমি’, ‘খাসমহল’-সেই আম বা খাস সবই আরবির দেওয়া। গরম লাগলে যে একটু হাওয়াবাতাস গায়ে লাগাবেন তারও উপায় নেই। ‘হাওয়া’ আরবি; ‘বাতাস’ ফারসি। এদিকে আপনি যদি সংস্কৃত শব্দটা ধরে বলেন, একটু ‘বায়ু’ খেতে যাচ্ছি; পাবলিক অন্যকিছু ধরে নেবে। বায়ুত্যাগ বললে আরও জ্বালা, লোকে গ্যাস ছাড়া ধরে নিয়ে নাকে রুমাল দিতে পারে। সেই যে রবীন্দ্রনাথের উপেন বলেছিল, ‘শুধু বিঘে দুই, ছিল মোর ভুঁই…’, ব্যাস, তারপর আর কেউই ভুঁই (তদ্ভব) কেনে না, সবাই ‘জমি’ (ফারসি) কেনে। তা, জমি থাকলে একটা বাগানবাড়িও তুলে ফেলতে পারেন। ওহো, আবার গোলমাল হল-‘বাগান’ তো তুর্কি। আপনাকে ‘উদ্যানবাটী’ বানাতে হয় তাহলে। দেখবেন, বানান ভুল করবেন না যেন! অবশ্য বাগানবাড়ি তুলতে খুবই খরচ। এই ‘খরচ’ আবার ফারসি। খরচ বেশি না করাই ভাল যদিও। অমুক ডেটে অমুক খরচা বলে অনেকে হিসাব করে। অবশ্য ডেট আবার কী, আজ মাতৃভাষা দিবস, বলুন, তারিখ। কিন্তু এও এক জ্বালা… ‘তারিখ’ আবার আরবি। দোকানে জিনিসপত্র দর করবেন, সেই ‘দর’-ও তাই, আরবি। ‘দোকান’-ফারসি। কী জ্বালা বলুন দিকি!

সবচেয়ে বড় কথা, এই যে ‘পানি’-র বিরুদ্ধে জিহাদ করছেন…সরি, যুদ্ধ করছেন, সে পানি আদপেই আরবি নয়, তা সংস্কৃত ‘পানীয়’ থেকেই এসেছে।

এমনকি আরবি-ফারসি ঠেকাতে এই বোদ্ধা এবং যোদ্ধারা যার হাত ধরছেন, সেই হিন্দিতেই কি সমস্যা কম? কম তো নয়, বরং বেশি-বাংলার চেয়ে হিন্দির অনেক বেশি শব্দ আরবি-ফারসি থেকে নেওয়া। বেশিদূর যেতে হবে না, এই যে গান করেন, ‘অগর’ তুম মিল যাও, এই ‘অগর’ (যদি) এসেছে ফারসি থেকে। অমিতাভের ব্লগবাস্টার সিনেমা দিওয়ার-শব্দটা আসলে ফারসি। ‘শহর’ ফারসি, ‘নগর’ সংস্কৃত। ‘হাম আভি জিন্দা হ্যায়’-সেই ‘জিন্দা’ ফারসি, ‘কুদরত’ আরবি, ‘দুনিয়া’-বাংলা হিন্দি উভয়েই আছে-আরবি। ‘গুজরনা’ ফারসি, ‘বাবু কো কুর্সি দো’-এই কুর্সি আরবি। ‘ওয়াক্ত’ (সময়)-আরবি, ‘তকরীবন’ (ওই মোটের ওপর), ‘মুশকিল’, ‘খবর’, ‘অখবর’ (বহুবচন), ‘মহব্বত’, ‘বিলকুল’, ‘আখির’, ‘আজিজ’, ‘ফিলহাল’ (বর্তমানে), ‘মওত’ (মৃত্যু), ‘সহি’, ‘ইজাজত’ (অনুমতি)-এসবই হল আরবি থেকে আসা। বল মা তারা, দাঁড়াই কোথা—!

আমাদের দেশে ঝালে-ঝোলে, অম্বলে, ডায়োভলে, প্যানফর্টিতে ধর্ম গুঁজে দেওয়ার রীতি আছে। ফলে এইভাবেই ভাষার সঙ্গেও ধর্মকে ভিড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। হিন্দি হিন্দুর ভাষা, উর্দু মুসলমানের ভাষা, বাঙালি না মুসলমান-ইত্যাদি অনেক কিছুই চলে। এ’ অবশ্য আজকের নয়, বহুদিনের। ১৮৭৭ সালে ভরতেন্দু হরিশচন্দ্র-যাকে বলা হয় আধুনিক হিন্দি ভাষার জনক-তিনি একে প্রায় গণ-অভ্যুত্থানের রূপ দিয়েছিলেন। তার আগে অবধি উত্তরপদেশে-তৎকালীন যুক্তপ্রদেশে উর্দুই ছিল সরকারি ভাষা, দপ্তরের ভাষা। পরে ব্রিটিশের আগমনে ইংরেজি এসেছিল সঙ্গে। অথচ মজার কথা, হিন্দি বা উর্দু আসলে একই ভাষার দুই সন্তান, যাকে বলে হিন্দুস্তানি। এই হিন্দুস্তানি বা হিন্দভি ভাষাই ছিল যুক্তপ্রদেশ থেকে রাজপুতানার এক বিরাট অংশের ভাষা। আঠারো শতকের আগে সম্ভবত ‘উর্দু’ বলে কোনও শব্দের অস্তিত্বই ছিল না। উর্দু আরবের ভাষা নয়, পারস্যের ভাষা নয়, এমনকি আফগানিস্তানের ভাষাও নয়। উর্দুর জন্ম এদেশে, এই ভারতবর্ষেই। তাও একেবারে ভারতের মধ্যভাগে, গাঙ্গেয় সমভূমিতে। বাংলা, ওড়িয়া, তামিল, অসমীয়ার মত উর্দুও একটি খাঁটি ভারতীয় ভাষা।

উর্দু সম্পর্কে এও বলা হয়-উর্দু নাকি ‘লস্করি জবান’-অর্থাৎ সৈনিকের ভাষা। কারণ অনেকে মনে করেন, উর্দুর জন্ম হয় মুঘল সৈন্যবাহিনীতে। এ মতও আজ আর চলে না। উর্দু বলে যা আমরা চিনি, সেই হিন্দুস্তানির জন্ম ভারতীয় অপভ্রংশ অবহটঠ থেকেই। মুঘলযুগের আগেও এর অস্তিত্ব ছিল, স্বয়ং আমির খসরুও এই ভাষাতেই কাব্যচর্চা করেছেন।

হিন্দিকে আজ মানা হয় হিন্দুর ভাষা বলে, পবিত্র ভাষা বলে। হিন্দি কীভাবে পবিত্রতা পেল তা অবশ্য জানা নেই। তবু বহু বঙ্গসন্তান আজ পশ্চিমবঙ্গকে আরব-পারস্যের দস্যুদের হাত থেকে বাঁচাতে হিন্দিতে কথা বলার পথ ধরছেন। যদিও এও আজকের কথা নয়। ১৯২৯ সালে বেরিয়েছিল ‘হিন্দি সাহিত্য কা ইতিহাস’, লেখক বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ের খ্যাতনামা পণ্ডিত আচার্য রামচন্দ্র শুক্লা। তিনিই অত্যন্ত সুচারুভাবে হিন্দিকে সংস্কৃতের উত্তরসূরি হিসেবে দাঁড় করিয়েছিলেন এবং উর্দুর সঙ্গে সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন করেছিলেন। মজার কথা, ‘হিন্দি’ শব্দটাই আসলে সংস্কৃত নয়, সম্ভবত বৈদিকও নয়। ‘হিন্দি’ এসেছে ফারসি থেকে, যার অর্থ হিন্দের অধিবাসী। এমনকি ‘হিন্দু’ শব্দটিও তাই-পারস্যের। বেশিদূর যেতে হবে না, এনসিইআরটির সরকারি বইতেই এই তথ্য মিলবে, স্কুলে পড়ানো হয়।

উর্দু নিয়েও সে কি টানাটানি! দেশভাগের পর স্বাধীন পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম হল, তার অফিশিয়াল ভাষা করা হল উর্দুকে। অথচ পাকিস্তান যে যে অংশ নিয়ে তৈরি, তা হল সিন্ধ-যার ভাষা সিন্ধ্রি, পশ্চিম পাঞ্জাব-যার ভাষা পাঞ্জাবি, বালোচিস্তানের একাংশ-যার ভাষা বালোচ, খাইবার পাখতুনখোয়ার ভাষা পশতো এবং এদিকে পূর্ব বাংলা-যার ভাষা বাংলা। এছাড়া দুইদিকেই রয়েছে প্রচুর ছোটোখাটো ভাষাগোষ্ঠী। আজও গোটা পাকিস্তানের সম্ভবত ১০%-এরও কম লোকের মাতৃভাষা উর্দু। তারপরেও উর্দুই পাকিস্তানের ‘লিঙ্গুয়া ফ্রাঙ্কা’-ইসলামের প্রতীক। এ এক বিচিত্র প্যারাডক্স! পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা জিন্নাহ নিজেও এর চেয়ে কম বৈচিত্র্যময় ছিলেন না। জিন্নাহ নিজে খিলাফত আন্দোলনেও যোগ দেননি, কোনোদিন দাড়ি রাখেননি, বিবাহ করেছিলেন এক অমুসলিমকে এবং শোনা যায় কোনোদিন নাকি নামাজ অবধি পড়েননি। এককালে ছিলেন কামাল আতাতুর্কের ভক্ত। অথচ সেই তিনিই পরে দ্বিজাতিতত্ত্ব প্রচার করলেন।

আরও একটা কথা কী জানেন? আমাদের দেশের প্রথম ফারসি সংবাদপত্র দিল্লি, হায়দরাবাদ, লাহোর বা আগ্রাতে নয়, প্রকাশিত হয়েছিল এই কলকাতায়। নাম ছিল-‘মীরাট-উল-অখবর’। প্রকাশক কোনও মুঘল বা পাঠান ছিলেন না। তার নাম ছিল রামমোহন রায়। ভাষাবিদ সুকুমার সেন যার সম্পর্কে লিখেছেন, “তিনি সংস্কৃত জানিতেন, ফারসি (এবং আরবিও সম্ভবত) আরও ভাল করিয়া জানিতেন, তিনি ভারতবর্ষের ইংরেজি শিক্ষিতদের অগ্রণী।…”

আজ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে তাই ভাষা নিয়ে আবেগের পাশাপাশি কিছু সহজ সত্যিকেও জেনে রাখা জরুরি। নিজের দেশকে নিয়ে গর্বিত হওয়াই যায়, কিন্তু সেই গর্বের কারণগুলো ঠিকমত বেছে নিতে পারলে আরও ভাল হয় আরকি। বেদে সব আছে, পুরাণে সব আছে, মহাভারতে প্লাস্টিক সার্জারি ছিল, দুধে সোনা পাওয়া যায়-এসবের চেয়েও জানা জরুরি সেই সব দিকগুলো, যেদিক দিয়ে সত্যিই “এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে না কো তুমি!” ভারতবর্ষই সম্ভবত পৃথিবীর একমাত্র দেশ, যাতে বাইশটা সরকারি ভাষা আছে। ২০১১ সালের জনগণনায় দেখা গেছে, ভারতে ১৯,৫৬৯-টি মাতৃভাষা আছে! এরকম ভাষার বৈচিত্র পৃথিবীতে ইন্দোনেশিয়া ছাড়া আর দেখা যায় না। তাদের মধ্যে অন্তত পাঁচশোটা ভাষা বিলুপ্তির পথে। আজ এক কেন্দ্রীয় শক্তি দেশে হিন্দিকেই জাতীয় ভাষা করার দিকে ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে। অথচ ভারতের কোনও ‘ন্যাশনাল ল্যাঙ্গোয়েজ’ নেই। তাই সর্বত্র সুচারুভাবে হিন্দি চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। অথচ আমরা ঝগড়া করছি, কেন বাবাকে ‘আব্বা’ বলব। মজার কথা, এই ‘আব্বা’ শব্দটি আরবি ভাষাটার চেয়েই অনেক পুরনো, সম্ভবত প্রায় এক হাজার বছরেরও বেশি। আরও মজার কথা, এই শব্দের উৎস সম্ভবত সেমিটিক, যা থেকে হিব্রু বাইবেলে ঈশ্বর বোঝাতে ব্যবহার করা হয়েছিল। এই যে আমরা খুব মান্যগন্য কাউকে বোঝাতে ‘বাবা’ বলি, সেই বাবা এসেছে ফারসি থেকে, আবার বাংলায় পিতা অর্থে বাবা এসেছে সংস্কৃত ‘বপ্র’ থেকে। ঝগড়া করতে গিয়ে যেন নিজের পায়ের দিকে খেয়াল রাখি, কুড়ুলটা কোথায় পড়ছে।

ওই যে বললাম, ভাষা বড় বিচিত্র। আমরা তাস পেটাই, অথচ জানি না যে ‘হরতন’, ‘রুইতন’ আসলে আর্জেন রবেন, ভ্যান ডার সরের দেশ থেকে এসেছে। বালতি বালতি জলে স্নান করি, করে জামা পরে বোতাম আটকাই, তারপর বাসনে খাওয়াদাওয়া করি, খেয়ে তোয়ালেতে হাত মুছি-এই ‘বালতি’, ‘বোতাম’, ‘বাসন’, ‘তোয়ালে’ ইত্যাদি সবই আসলে এসেছে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর দেশ থেকে। এমনকি আমরা বাংলায় ডাচদের ‘ওলন্দাজ’ বলি, এই ‘ওলন্দাজ’ শব্দটিও আসলে এসেছে পোর্তুগিজ ‘holandes’ থেকে। বিশ্বাস না হলে গুগল ট্রান্সলেটে দেখে নিন। বরং এই রবিবারের সন্ধ্যেতে একটু চা খেতে খেতেই দেখুন না হয়। চা হল সেই কয়েকটা বস্তুর একটি, পৃথিবীর বেশিরভাগ ভাষাতেই যার প্রতিশব্দ একই। জাপানি, চীনে, কোরিয়ান, হিন্দি, বাংলা, তুর্কি, ইউক্রেনিয়ান, গ্রিক, পর্তুগিজ, গুজরাটি, আরবি, পাঞ্জাবি, উজবেক ও রুশ ভাষায় চায়ের প্রতিশব্দ চা/চায়ে/চায়/চ’! এদিকে ইংরেজি, লাতিন, হিব্রু, কাতালান, বাস্ক, জার্মান, ফরাসি, এস্তোনিয়ান বা মালয় ভাষায় বলে টি/টে।

(ফেসবুক থেকে সংগৃহীত)

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

error: Content is protected !!