বুড়িগঙ্গায় লঞ্চ দুর্ঘটনা: খুব কাছে থেকে দেখা মৃত্যুকে

রাজধানীর বুড়িগঙ্গা নদীতে যাত্রীবাহী একটি লঞ্চ ডুবে গেছে। এ ঘটনায় সর্বশেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত নারী ও শিশুসহ ৩২ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।সোমবার (২৯ জুন ) সকালে সঙ্গী কয়েকজনের সঙ্গে আড্ডায় মেতে ছিলেন ওমর চান। হুট করেই বিকট শব্দ আর কাঁপুনি। কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই উল্টে যাচ্ছিল মর্নিং বার্ড। জীবন বাঁচাতে পানিতে লাফিয়ে পড়েন ওমর চান। তার সঙ্গে আরও কয়েকজন পানিতে লাফ দেন। অনেকে পানির নিচ থেকে টেনে ধরছিলেন। কোনো রকমে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে প্রাণ রক্ষা করেন ওমর। তীরে ওঠার আগে তিনি এক নারীকেও উদ্ধার করে আনেন।

রাজধানীর সদরঘাট এলাকার ফরাশগঞ্জে সোমবার সকাল সোয়া ৯টার দিকে এই নৌ-দুর্ঘটনা ঘটে। ময়ূর-২ নামের একটি লঞ্চের ধাক্কায় ডুবে যায় মর্নিং বার্ড নামের লঞ্চটি। মুন্সিগঞ্জের মীরকাদিমের কাঠপট্টি ঘাট থেকে ছেড়ে যাওয়া এই লঞ্চে শতাধিক যাত্রী ছিল। এই নৌ-দুর্ঘটনায় হতাহত লোকজনের অধিকাংশই মুন্সিগঞ্জের বাসিন্দা। তারা বর্ণনা করেছেন মৃত্যুকে খুব কাছে থেকে দেখে আসার অভিজ্ঞতা।

জাহাঙ্গীর হোসেন নামের একজনের বাড়ি মুন্সিগঞ্জের মীরকাদিম পৌরসভার এনায়েত নগরে। রাজধানীর বঙ্গবাজারে কাপড়ের দোকানে কাজ করেন তিনি। আট বছর ধরে কাঠপট্টি থেকে লঞ্চে করে ঢাকায় আসা-যাওয়া করেন।

জাহাঙ্গীর বলেন, প্রতিদিনের মতো সোমবার সকাল পৌনে ৮টায় তিনি মর্নিং বার্ড লঞ্চে করে ঢাকার পথে রওনা করেন। তার সঙ্গে ছিলেন মীরকাদিম পৌর এলাকার প্রায় ১০ জন যাত্রী। কথা আর আড্ডা দিয়ে তারা লঞ্চের ভেতরে সময় কাটাচ্ছিলেন। লঞ্চটি ফরাশগঞ্জ ঘাট এলাকায় পৌঁছায় সকাল সোয়া ৯টার দিকে। এ সময় হঠাৎ তাঁদের লঞ্চটিকে ধাক্কা দেয় ময়ূর-২ নামের একটি লঞ্চ। ধাক্কা খেয়ে একপাশে কাত হয়ে যায় মর্নিং বার্ড। সবাই লঞ্চ থেকে ছিটকে নদীতে পড়তে থাকে। তিনিও পানিতে পড়ে যান। তার গায়ের ওপর পড়েন ১০-১২ জন যাত্রী। চোখের সামনেই অনেকে পানিতে তলিয়ে যান। তিনিও ডুবতে ডুবতে ভেসে ওঠেন। কোনো রকম সাঁতরে তীরে উঠতে সক্ষম নন তিনি।

জাহাঙ্গীরের ভাষায়, ৫ মিনিট আগেও যাদের মধ্যে প্রাণবন্ত আড্ডা চলছিল, তারাই চোখের সামনে ডুবে হারিয়ে গেলেন। এটা যে কতটা কষ্টের, তা ভাষায় বোঝানো যাবে না। এই দুর্ঘটনা থেকে প্রাণ নিয়ে ফিরে আসা নাজমা আক্তার, জুমকি, কাকলি বেগম ও মমিন আলীও একই ধরনের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছেন। মৃত্যুকে এত কাছ থেকে দেখার অভিজ্ঞতা তাঁদের কারোরই এর আগে ছিল না।

নাজমা আক্তার বলেন, তিনি চিকিৎসা নিতে ঢাকায় যাচ্ছিলেন। লঞ্চটি যে পাশ দিয়ে ডুবছিল, তার বিপরীত পাশে ছিলেন। সেখানকার জানালা দিয়ে তিনি বেরিয়ে আসতে সক্ষম হন। তিনি বলেন, চোখের সামনে পরিচিত মুখগুলো লাশ হয়ে গেল। এটা আমি মেনে নিতে পারছি না।

ঢাকার সাতরওজা এলাকার একটি পিভিসি পাইপ কারখানার কিশোর শ্রমিক সৌরভ (১৭)। তার দুই ভাগ্নে সাইফুল (১৭) ও সায়েম (১৯) ওই কারখানাতেই কাজ করতো। ওই এলাকায় একটি মেসে এক সঙ্গে থাকতো তারা।

প্রতি সপ্তাহেই তারা গ্রামের বাড়ি মুন্সিগঞ্জ যায়। এ সপ্তাহে নির্ধারিত ছুটির একদিন পর সোমবার (২৯ জুন) তারা বাড়ি থেকে ‘মর্নিং বার্ড’ লঞ্চে করে কর্মস্থলের উদ্দেশে রওনা দেয়। কিন্তু কাজে যোগ দেওয়া হলো না তাদের।

সদরঘাটে নোঙর করার আগ মুহূর্তে ‘ময়ূর-২’ লঞ্চের সঙ্গে ধাক্কা লেগে ডুবে যায় ‘মর্নিং বার্ড’ লঞ্চটি। তখন সৌরভ এক ভাগ্নে সাইফুলকে নিয়ে সাঁতরে একটি ট্রলারে ওঠতে পারলেও সায়েম নিখোঁজ হয়। পরে স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মর্গে এসে সায়েমের মরদেহ শনাক্ত করে বাকরুদ্ধ হয়ে যায় সৌরভ।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

error: Content is protected !!