বিয়ে নারীকে কী দেয়?

তারকা জেমসের প্রথম স্ত্রী রথিকে মনে আছে? ফটোসুন্দরী হয়েছিলেন, এক সময় বিজ্ঞাপনচিত্রে, নাটকে, টেলিছবিতে এমন কি চলচ্চিত্রেও অভিনয় করেছেন। সেই রথিকে বিয়ের পর অভিনয় ছাড়তে হয়েছিল, কারণ স্বামীর আদেশ। স্বামী জেমস সোজা বলে দিয়েছিলেন নাটক সিনেমা করা চলবে না। শেষ অবধি দুটো সন্তান জন্মাবার পর জেমস তালাক দেন স্ত্রীকে। অন্য একটি বিয়েও তখন তিনি করে নিয়েছেন। সন্তান নিয়ে রথিকে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেতে হয় ২০০৩ সালে। সেই থেকে তিনি নিজেই সন্তান বড় করেছেন। আমাদের জনপ্রিয় জেমস সন্তান লালন-পালনে কোনও রকম সাহায্য করেননি, নিজের ধন-দৌলতের কিছুই খরচ করেননি তাদের জন্য। বিয়ের পর রথিকে তাঁর অভিনয় থেকে সরে আসতে হয়েছিল, জেমসকে কিন্তু তাঁর গান থেকে সরে আসতে হয়নি। আজও সমাজে এমন ঘটনা ঘটে। মেয়েদের স্বাধীন এবং স্বনির্ভর হওয়ার পথে শিক্ষিত সচেতন পুরুষ বলে যাঁদের বিশ্বাস করি, তাঁরাই সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ান।

বিয়ে প্রথাটি আমাদের এই উপমহাদেশে নারী-পুরুষের বৈষম্যের ওপর এই একবিংশ শতাব্দীতেও দাঁড়িয়ে আছে। পৃথিবীর সকল প্রাণী যেমন প্রতিনিয়ত বিবর্তিত হচ্ছে, প্রাণীর তৈরি নিয়ম-নীতিগুলোরও বিবর্তন ঘটছে। কিন্তু বিয়ের বিবর্তন প্রায় হচ্ছে না বললেই চলে। এখনও মেয়েকে শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে উঠতে হয়। হিন্দু মেয়েদের সিঁথিতে সিঁদুর পরতে হয়, নানা কুসংস্কারের প্রতীক শাঁখা, পলা, লোহাও পরতে হয় হাতে। গলায় পরতে হয় মঙ্গলসূত্র। দীর্ঘদিন যাবৎ নারীর সমানাধিকারের জন্য দেশে বিদেশে আন্দোলন চলছে, ওতে প্রভাবিত হয়ে কিছু শিক্ষিত এবং সচেতন মেয়ে শাঁখা সিঁদুর পরা বাদ দিয়েছেন। কোথায় প্রগতিশীলরা অন্তত মেয়েদের এই স্বাধীনতাকে সাদরে গ্রহণ করবেন, তা নয়, গৌহাটি হাই কোর্টের বিচারকরাই সেদিন প্রমাণ করলেন এখনও বৈষম্যকে আঁকড়ে ধরে আছে সমাজের প্রভাবশালী ক্ষমতাধর মানুষেরা। গৌহাটির হাই কোর্ট বিবাহ বিচ্ছেদের একটি মামলায় বিচ্ছেদ মঞ্জুর করার পক্ষে কারণ দেখালেন, স্ত্রীটি যেহেতু শাঁখা সিঁদুর পরছেন না, সেহেতু ধারণা করা যায় তিনি তাঁর স্বামীকে আর স্বামী হিসেবে মনে করেন না। বিচারকদের মতে শাঁখা-সিঁদুর না-পরা মানে নিজেকে অবিবাহিতা মনে করা বা সেই বিয়ে মেনে না-নেওয়া। এটা কুসংস্কারাচ্ছন্ন এবং নারীবিরোধী মানুষের বিচার হতে পারে, একে আদালতের বিচার বলে তো মানা যায় না। যে আদালতের কাজ লিঙ্গসাম্য প্রতিষ্ঠা করা, মানবাধিকার এবং নারীর সমানাধিকার রক্ষা করা, সেই আদালতই যদি বিয়ের চিহ্ন হিসেবে শাঁখা-সিঁদুর পরা মেয়েদের জন্য বাধ্যতামূলক বলে মনে করেন, তাহলে নিশ্চয়ই তা দুর্ভাগ্যজনক। পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার পরিবর্তন যতদিন না হবে, ততদিন নারীকে ভুগতে হবে। দুর্ভাগ্যজনক তো বটেই। ভুলেই গিয়েছিলাম আদালত সমাজের বাইরের কিছু নয়। এর বিচারকরাও এই সমাজেরই লোক।

মুশকিল হলো, বাপ মায়ের বাড়িতে বিয়ে করে বউ তোলে পুরুষেরা, আজও। পুরুষেরা প্রাপ্তবয়স্ক হতে চায় না। তারা মা বাপের ‘কোলের শিশু’ হয়ে আজীবন কাটিয়ে দিতে চায়। বাপ মা ভাই বোন গায়ে গতরে বড় হওয়া পুরুষটির দেখভাল করে, তারপর যোগ হয় বধূ। আরেক সেবাদাসী। প্রাপ্তবয়স্কের মতো নিজের দায়িত্ব নেওয়ার কাজটি আজও আমাদের বেশির ভাগ পুরুষ দ্বারা সম্ভব হচ্ছে না। বধূটি সম্পূর্ণ একটি নতুন পরিবেশে হিমশিম খায়। সবার মন রক্ষা করে চলতে হবে, না হলে লোকে তাকে মন্দ বলবে। নিজের স্বকীয়তা স্বাধীনতা সম্পূর্ণ বিসর্জন দিয়ে শ্বশুরবাড়িতে থাকতে হয় মেয়েদের। এক্ষুনি আমি জানি শয়ে শয়ে মেয়ে এসে বলবে তাদের শ্বশুর শাশুড়ি কত ভালো, একেবারেই তাদের স্বাধীনতা বিসর্জন দিতে হয়নি। কিন্তু কথা হচ্ছে, একটি মেয়েকে কেন স্বামীর আত্মীয়স্বজনের সংগে বাস করতে হবে, স্বামীকে তো মেয়ের আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে বাস করতে এবং সবার মন জুগিয়ে চলতে বলা হয় না! বিয়ে হলে একটি মেয়েকে আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব, পাড়া প্রতিবেশী, চেনা পরিবেশ, চেনা এলাকা ত্যাগ করে স্বামীর বাড়িতে আশ্রয় নিতে হয়। একটি পুরুষকে বিয়ের কারণে কিছুই ত্যাগ করতে হয় না। অসাম্যের একটা সীমা থাকা দরকার। বিয়ে সব সীমা ছাড়িয়ে যায়।
আসামের যে লোকটি স্ত্রীকে তালাক দিয়েছেন, তাঁর অভিযোগ ছিল, স্ত্রী শ্বশুরবাড়িতে বাস করতে চান না। এটিই লোকটির তালাক দেওয়ার কারণ। স্ত্রী যদি পছন্দ না করেন স্বামী ছাড়া অন্য কারও সংগে বাস করতে, তখন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষেরা স্ত্রী নিয়ে আলাদা সংসার করেন, কিন্তু মা বাপের কোলের শিশুরা মা বাপের সংগে বাস করার জন্য গোঁ ধরেন, স্ত্রীকে ত্যাগ করতে আপত্তি নেই তাঁদের। আমাদের পুরুষেরা কি শুধু মা বাপের কোলের শিশু? তাঁরা তো ছলে বলে কৌশলে স্ত্রীদেরও কোলের শিশু বনে যান। স্ত্রীরা তাঁদের নাওয়া খাওয়া থেকে শুরু করে তাঁদের জুতো-মোজারও তদারকি করবেন- এটাই চান তাঁরা।

আসামের অপদার্থ লোকটির প্রাপ্তবয়স্ক এবং দায়িত্বশীল পুরুষ হওয়ার কোনও ইচ্ছে নেই। তাই তালাকের আয়োজন। দুজন মানুষ একত্রে বাস করতে না চাইলে, দুজনের মধ্যে ভালোবাসা অবশিষ্ট না থাকলে, কেউ একজনও ভেবে-চিন্তে তালাকের সিদ্ধান্ত নিলে কোনও রকম সমস্যা ছাড়াই তালাক সম্পন্ন হওয়া উচিত। হয়েছেও তাই। তালাক নিয়ে আপত্তি নেই। কিন্তু বিচারকের মন্তব্যটি নিয়ে আপত্তির আওয়াজ কানে আসছে। বিচারক বলেছেন বিবাহিত মেয়েদের শাঁখা সিঁদুর পরতে হবে। ওদিকে বিবাহিত পুরুষ মানেই কিন্তু অবিবাহিত পুরুষ। একটি পুরুষকে দেখে কেউ বলতে পারবে না সে বিবাহিত না কি অবিবাহিত। বিবাহিত এবং অবিবাহিত পুরুষেরা দেখতে একই। বিবাহিত পুরুষদের সকাল সন্ধ্যে কোনও বিবাহের চিহ্ন বহন করতে হয় না। তাদের কোনও শাঁখা সিঁদুর পরতে হয় না। অসাম্যের একটা সীমা থাকা দরকার। সীমা যে নেই, আমরা জানি। বলছি, মেয়েদের, এমনকি স্বামীকে ভালোবাসেন এমন মেয়েদেরও যদি ইচ্ছে না করে শাঁখা সিঁদুর পরতে? তাহলে নিশ্চয়ই তাদের স্বাধীনতা থাকা উচিত ওসব না পরার? বিয়েটা বন্দিত্ব না হয়ে মুক্তি কেন হতে পারে না?

ইউরোপ আমেরিকায় বিবাহিত ক্রিশ্চান আর ইহুদি পুরুষ এবং নারী উভয়েই অনামিকায় বিয়ের অঙ্গুরি পরে। ওটিই তাদের বিয়ের চিহ্ন। কোনও দম্পতির যদি ইচ্ছে না হয় অঙ্গুরি পরার, পরে না। সব ধর্মের মানুষদের মধ্যে এই স্বাধীনতা থাকা উচিত। মুসলমান পুরুষকে তো নয়ই, মুসলমান মেয়েকেও বিয়ের কোনও চিহ্ন বহন করতে হয় না, ব্যাপারটি ভালো। কিন্তু বিয়ের চিহ্ন বহন করতে হয় না বলে মুসলমান মেয়েরা যে অন্য ধর্মের মেয়েদের চেয়ে অধিক স্বাধীনতা ভোগ করে তা নয়। মুসলমান মেয়েরাও একই রকম পুরুষতান্ত্রিক সমাজের ভুক্তভোগী।

বিয়েটা দিন দিন ক্রমশ অপ্রয়োজনীয় হয়ে উঠছে। প্রভু-দাসীর সম্পর্ককে আইনত বৈধ করার জন্য বিয়ে নামক ব্যবস্থা শুরু হয়েছিল। মেয়েদের দুর্বল, পরনির্ভর ভাবা হতো বলে, মেয়েদের শুধু যোনি আর জরায়ু ভাবা হতো বলে শুরু হয়েছিল। মেয়েদের শরীরকে পুরুষের অধিকারভুক্ত করার জন্য শুরু হয়েছিল। ওইসব কারণের প্রতিটি এখন অকেজো এবং অর্থহীন। যে মেয়ে দুর্বল নয়, যে মেয়ে স্বনির্ভর, যে মেয়ের পরিচয় যোনি আর জরায়ু নয়, যে মেয়ে নিজের স্বাধীনতা এবং অধিকারে বিশ্বাস করে, যে মেয়ে প্রভু-দাসীর সম্পর্ক মানে না, সমতা এবং সমানাধিকারে বিশ্বাস করে, সে মেয়ে বিয়েটা কোন দুঃখে করবে? বিয়েটা দরকার কিছু কোলের শিশু হওয়ার বাসনায় বুড়ো আঙ্গুল চুষছে যে পুরুষগুলো, তাদের।

বিয়ের মতো একটি প্রাচীন প্রথাকে টিকিয়ে রাখতে হলে এর পরিবর্তন এবং বিবর্তন জরুরি। এর নারীবিদ্বেষী আদি রূপটিকে বিদেয় করে নারী-পুরুষের সমানাধিকারের ভিত্তিতে একে আধুনিক করতে হবে। বিয়ে যেন স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ককে প্রভু-দাসীর সম্পর্ক না করে। দুজনের ভালোবাসা আর বিশ্বাসের ওপর যেন গড়ে ওঠে এই সম্পর্ক। কারও মানবাধিকার যেন খর্ব না হয় এই বিয়ের কারণে। বিয়ে যেন বন্দি না করে মেয়েদের, এ যেন হয়ে ওঠে বরং সব রকম বন্দিত্ব থেকে মুক্তি, এ যেন হয়ে ওঠে স্বাধীনতার আরেক নাম।

লেখক :তসলিমা নাসরিন

নির্বাসিত লেখিকা।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

error: Content is protected !!