November 25, 2020

মাই পেটারসন. লাইফ

ভয়েস অফ দ্যা কমিউনিটি

বাড়ছে মৃত্যুর মিছিল: কীভাবে শেষ হতে পারে মহামারি?

এক অন্যরকম মহামারির কবলে পড়েছে বিশ্ব। মহামারির কবলে দিন দিন বেড়েই চলেছে মৃত্যুর মিছিল। মহামারি করোনা থেকে মুক্তির পথ হিসেবে আশা দেখাচ্ছে এর ভ্যাকসিন আবিষ্কারের চেষ্টা চলছে, যদিও তা এখনও আবিষ্কার হয়নি। কিন্তু পূর্ববর্তী মহামারি এবং তার প্রভাব দিচ্ছে ভিন্ন বার্তা। আমাদের পূর্বপুরুষদের দ্বারা সংক্রমিত বেশিরভাগ ভাইরাস এখনও আমাদের সাথে রয়েছে বলে এক গবেষণায় উঠে এসেছে।ওই গবেষণায় পূর্ববর্তী মহামারিগুলো কিভাবে শেষ হয়েছিল সেই আলোকে বর্তমান মহামারি কীভাবে ভবিষ্যতে শেষ হতে পারে তার একটা ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে।

ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের প্রফেসর স্টিভেন রিলের সার্বিক সহযোগিতায় লুসি রজার্স এর এক গবেষণায় দেখানো হয়, জেসমিনের (ছদ্মনাম) পূর্বপুরুষরা কীভাবে নানা সময় ঘটে যাওয়া মহামারি মোকাবেলা করেছে। তার পূর্বপুরুষরাও বহু মহামারি থেকে বেঁচে গিয়েছিলেন। এসময় তারা কী কী রোগের মুখোমুখি হয়েছিল এবং তা নির্মূলে কী কী ভূমিকা কার্যকরী হয়েছিল তা তুলে ধরা হয়েছে।

প্লেগ:
প্লেগ একটি মারাত্মক ধ্বংসাত্মক রোগ যা এখনও আমাদের সাথে রয়েছে। পাঁচশ’ শতকের শুরুর দিকে এই রোগের সূচনা হয়। তিন ধাপে এ রোগে প্রায় ২০ কোটির বেশি মানুষ মারা যায়। বলা যায় জেসমিনের ৬০ প্রজন্ম আগে প্লেগের প্রাদুর্ভাবের মধ্য দিয়ে জীবনযাপন করেছিলেন। ওই সময় এই রোগটি ইঁদুরের মাধ্যমে ছড়িয়ে বিপর্যয় সৃষ্টি করেছিল। ১৩৪৬ সাল থেকে ১৩৫৩ সাল পর্যন্ত সময়ে সবচেয়ে মারাত্মক প্রকোপ হিসাবে বিবেচনা করা হয়।

এটি বিশ্বাস করা হয় যে, এই রোগটি অবশেষে কঠোরভাবে কোয়ারেন্টাইন এবং স্যানিটেশন উন্নত করার পাশাপাশি অন্যান্য জিনিসের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়।

লন্ডনের ইম্পেরিয়াল কলেজের সংক্রামক রোগ গতিবিদ্যার অধ্যাপক স্টিভেন রিলে বলেছেন, তবে সংক্রমণ কীভাবে সংঘটিত হয়েছিল তা বোঝা ছাড়া এগুলোর কিছুই হতে পারে না। এটি এমন কিছু যা আজও ঘটে চলেছে।

তিনি বলেন, যখন কেউ এ রোগের গতির বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করেন এবং এ জ্ঞান ভাগাভাগির মাধ্যমেই কেবল রোগের সংক্রমণকে রোধ করা সম্ভব। প্লেগের ঘটনা এখনও দেখা যায়, উদাহরণস্বরূপ, এই বছরের জুলাইয়ে মঙ্গোলিয়ায় দেখা যায়। যদিও সংখ্যা কম, এবং এই রোগটি এখন অ্যান্টিবায়োটিকের মাধ্যমে সফলভাবে চিকিৎসা করা যেতে পারে।

গুটি বসন্ত:
১৫২০ সালের শুরুর দিকে গুটি বসন্তের প্রাদুর্ভাব হয়। বিজ্ঞান দ্বারা এ ভাইরাস এখন নিশ্চিহ্ন। প্লেগের কয়েকশো বছর পরে জেসমিনের ২০ প্রজন্ম আগের পূর্বপুরুষরা এ রোগের মুখোমুখি হয়েছিল। এই রোগে আক্রান্ত প্রতি দশ জনের মধ্যে প্রায় তিন জন মারা যায়। প্লেগ ও গুটি বসন্তে বিংশ শতাব্দীতে ত্রিশ কোটি লোক মারা যায়।

ব্রিটিশ ডাক্তার এডওয়ার্ড জেনার দ্বারা ১৭৯৬ সালে তৈরি একটি ভ্যাকসিন তৈরির মাধ্যমে এই রোগটি পুরোপুরি মুছে ফেলা সম্ভব হয়েছে। যদিও এ ভ্যাকসিন তৈরি করতে প্রায় দুই শতাব্দী সময় লেগেছিল। অধ্যাপক রিলে এই কৃতিত্বকে মানবজাতির অন্যতম সেরা সাফল্য হিসাবে বিবেচনা করেছেন।

কলেরা:
কলেরা স্বল্প আয়ের দেশগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে। তবে মহামারি আকার ধারণ করে ১৮১৭ সালে। অর্থাৎ জেসমিনের ঠিক আট প্রজন্মের পূর্বপুরুষ কলেরা হুমকির মুখোমুখি হয়েছিল। দূষিত খাবার বা খাবার পানির কারণে এই রোগটি ছড়িয়ে সাতটি মহামারিতে লক্ষ লক্ষ লোককে হত্যা করেছিল বলে জানিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।

তবে স্বাস্থ্যবিধি ও স্যানিটেশন উন্নয়নের ফলে এই রোগ থেকে মুক্তি পেতে শুরু করেছে। তবে এটি অনেক স্বল্প আয়ের দেশগুলিতে স্থানীয় বা সাধারণ হিসাবে রয়ে গেছে। প্রতিবছর এখনো এ রোগে লক্ষাধিক লোক মারা যায় বলে জানায় ডব্লিউএইচও।

এ কারণে ভ্যাকসিন এবং এই রোগের সহজ চিকিৎসা সত্ত্বেও জেসমিন এ রোগে আক্রান্ত হতে পারেন। মারা যাওয়ার ঝুঁকিও রয়েছে।

ইনফ্লুয়েঞ্জা:
জেসমিনের পরিবারও অনেকগুলো ফ্লু মহামারীর মধ্যে দিয়ে বেঁচে থাকত। সবচেয়ে বড় রেকর্ডটি বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে, তার দাদার-দাদার সময়কালে ইনফ্লুয়েঞ্জা প্রাদুর্ভাব শুরু হয়। ১৯১৮ সালের ইনফ্লুয়েঞ্জা মহামারিটি, যা কখনও কখনও স্প্যানিশ ফ্লু হিসাবে পরিচিত, এটি সাম্প্রতিক ইতিহাসের সবচেয়ে মারাত্মক প্রাদুর্ভাব, যা বিশ্বব্যাপী দশ কোটি মানুষকে হত্যা করেছিল।

১৯১৮ এবং ১৯২০ এর মধ্যে দুটি তরঙ্গের পরে, সেই নির্দিষ্ট এইচ১এন১ ফ্লুর হ্রাস পেয়ে তা পরির্বতিত হয়ে এখনও প্রতি বছর সঞ্চালিত হয়।

১৯৬৮ সালের হংকং ফ্লুতে দশ লাখ লোক মারা গিয়েছিল এবং এখনও মৌসুমি ফ্লু হিসাবে প্রচারিত হয়। যেমন সোয়াইন ফ্লু এইচ১ এন১ ভাইরাসটি ২০০৯ সালে বিশ্বের প্রায় ২১% লোককে সংক্রামিত করেছিল।

প্রফেসর রিলে বলেন, জেসমিন এবং আমরা এই ধরণের ভাইরাসের কারণে সৃষ্ট অন্য মহামারি হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছি। আমরা মৌসুমি ফ্লু ধরার ঝুঁকিতেও আছি, যা প্রতিবছর কয়েক হাজার মানুষকে হত্যা করে চলেছে।

এইচআইভি/ এইডস:
প্রায় চার দশক আগে, জেসমিনের বাবা-মা এইচআইভি/এইডস ছড়িয়ে পড়ার মধ্য দিয়ে জীবনযাপন করেছিলেন। কেউ কেউ মহামারি হিসাবে বিবেচনা করেছিলেন, তবে ডব্লিউএইচও একে ‘বিশ্ব মহামারী’ হিসাবে বর্ণনা করেছিল। এখন পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে তিন কোটির বেশি লোকের জীবন কেড়ে নিয়েছে।এইচআইভি আক্রান্ত

সার্স এবং মার্স:
জেসমিনের নিজের জীবদ্দশায় এসেছিল সার্স এবং মার্সের হুমকি। ডব্লিউএইচও অনুসারে, সার্স করোনাভাইরাস দ্বারা সৃষ্ট প্রথম মারাত্মক এ মহামারিতে ২০০২ থেকে ২০০৩ সালের মধ্যে ৮০০ এরও বেশি লোক মারা গিয়েছিল।

তবে ২০০৩ সালের জুলাইয়ের শেষের দিকে নতুন কোনও সনাক্তের খবর পাওয়া যায়নি এবং ডব্লিউএইচও বিশ্বব্যাপী প্রকোপ শেষ হওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। এর কিছুদিন পরে মধ্যপ্রাচ্য উটের মাধ্যমে মার্সে আক্রান্ত হয়ে প্রাণ হারায় ৯১২ জন। যদিও অন্যান্য দেশে মার্সের সংক্রমণের আশঙ্কা কম তারপরও জেসমিন এখনো মার্স দ্বারা আক্রান্ত হতে পারেন।

করোনাভাইরাস:
জেসমিন এবং আমাদের জীবদ্দশায় আমরা নতুন সার্স করোনাভাইরাসের মুখোমুখি হচ্ছি যা শ্বাসযন্ত্রের রোগ কোভিড -১৯। ২০০৩ সালের সার্স ভাইরাসের একটি বিবর্তিত সংস্করণ হলো করোনাভাইরাস। রোগ বিশেষজ্ঞরা এ ভাইরাসকে অনন্য হিসাবে বিবেচনা করেছেন। তবে এর লক্ষণগুলির পরিসীমা জানা গেছে, লক্ষণ ছাড়াই মানুষের শরীরে উচ্চ স্তরের সংক্রমণ ঘটাতে সক্ষম এ ভাইরাস। এ কারণে অনেকেই এটি নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হয়নি বলে জানিয়েছেন অধ্যাপক রিলে। এখন পর্যন্ত এ ভাইরাসে প্রায় ১০ লাখের বেশি মানুষ মারা গেছেন।

যদিও করোনার ভ্যাকসিন এবং কার্যকর চিকিৎসার জন্য অনুসন্ধান অব্যাহত রয়েছে, বিশ্বব্যাপী জনসংখ্যার বিশাল অংশের জন্য ঝুঁকিটি সত্যই রয়ে গেছে। জেসমিনও আমাদের মতো এখনও ঝুঁকিতে রয়েছে। সুতরাং এখন আমাদের কমিউনিটিতে করোনাভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়ছে ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়ার মতো সৃষ্ট মহামারিগুলির দীর্ঘ লাইনে।

ঐতিহাসিক রোগের প্রভাব বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বড় মহামারিতে প্রায় ১০ কোটি মানুষের প্রাণ গেছে। সময়ের সাথে সাথে বিশ্বব্যাপী জনসংখ্যা যেহেতু যথেষ্ট বৃদ্ধি পেয়েছে, জনসংখ্যা কম হলে ঐতিহাসিক রোগের প্রভাব আরও বেশি হতো বলে জানিয়েছে হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়।

Vaccineভাইরাস ট্রান্সমিশন, জনস্বাস্থ্য প্রচারণা, নতুন চিকিৎসা এবং ভ্যাকসিন আবিষ্কার পূর্ববর্তী সংকটগুলো নিরসনের ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছে। বর্তমান মহামারিটির জন্য শেষ খেলাটিও একই ধরণের পদক্ষেপের সংমিশ্রণ থেকে আসতে পারে।

একটি ‘নিরাপদ, অত্যন্ত কার্যকর’ ভ্যাকসিন তার সমাপ্তি আনতে পারে বলে জানিয়েছেন অধ্যাপক রিলে। এর পরিবর্তে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে এটির সাথে অভ্যস্ততা আরও ভাল হতে পারে।

‘অবশ্যই পাঁচ বছরের মধ্যে, আশা করি খুব তাড়াতাড়ি, আমাদের কাছে সত্যিই একটি ভাল ভ্যাকসিন থাকবে যা পুরো বিশ্বজুড়ে ব্যবহৃত হবে বা আমরা পর্যাপ্ত প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে ছোট ছোট মহামারী সাথে কীভাবে বাঁচতে হয় তা শিখব’, জানান এই অধ্যাপক।

গুটি বসন্ত নির্মূলের প্রমাণ থেকে বলা যায়, যখন বিশ্বের বৈজ্ঞানিক সম্প্রদায় একত্রিত হয়, তখন দুর্দান্ত কিছু সম্ভব হয়।

উচ্চ পর্যায়ের অবিস্মরণীয় ট্রান্সমিশনের কারণে যদিও নতুন করোনাভাইরাসটি নির্মূল অনেক বেশি জটিলতর চ্যালেঞ্জ, তারপরও অধ্যাপক রিলে আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেছেন, পৃথিবীতে এর আগে আর কখনও এরকম একটি ভাগাভাগি প্রকল্প হয়নি, তবে আশা করি এটি এক পর্যায়ে একটি সমন্বিত সাফল্য হয়ে উঠবে।

তবে এটি আমাদের মনে রাখতে হবে যে অতীতে যে সমস্ত রোগজীবাণু মহামারির মতো ছড়িয়ে পড়েছিল তাদের বেশিরভাগ এখনও রয়েছে। সংকট শেষ হওয়ার পরও ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া এবং সংক্রমণগুলো রয়ে গেছে তাদের।

error: Content is protected !!