বার্সার অনুশীলনে মেসি

সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে দুইদিন আগে আরেকটি মৌসুম বার্সায় থাকার ঘোষণা দেন লিওনেল মেসি । এবার বার্সেলোনার অনুশীলন কমপ্লেক্স সেন্ট হুয়ান দেস্পিতে ফিরেছেন লিওনেল মেসি। খবরটি নিশ্চিত করেছে স্প্যানিশ ক্রীড়ামাধ্যম মার্কা।

সোমবার (০৭ সেপ্টেম্বর) সেশনের দেড়ঘণ্টা আগে তিনি পৌঁছান। তার একদিন আগে পিসিআর টেস্ট করান তিনি। ক্যাম্প ন্যু’র নতুন কোচ রোনাল্ড কোম্যানের অধীনে প্রথমবারের মতো অনুশীলন করতে প্রস্তুত আর্জেন্টাইন ফরোয়ার্ড।

সেই ২০০১ সালে মাত্র ১৩ বছর বয়সে বার্সেলোনায় এসেছিলেন লিওনেল মেসি। মাঝের ২০টি বছর এই বার্সেলোনাই মেসির ঘর-পরিবার, জীবন সবকিছু। ছোট্ট বয়সে আর্জেন্টিনা থেকে এসে আপন করে নিয়েছেন বার্সেলোনা শহরটিকে। এই শহর এই ক্লাব ছেড়ে এখন যাবেন কী করে! আগামী মৌসুমের অভিযানের জন্য সতীর্থদের সঙ্গে অনুশীলন শুরু প্রস্তুতি নিচ্ছেন তিনি।

বাবার মতোই অবস্থা ছেলে থিয়াগো মেসি রোকুজ্জোর। বাবা তো ১৩ বছর বয়সে এসেছিলেন বার্সেলোনায়, কিন্তু থিয়াগোর জন্ম এখানেই। বেড়ে ওঠাও। পড়ালেখার সূত্রে বিস্তর বন্ধুবান্ধব জুগিয়েছে ছোট্ট ছেলেটি। তাই বাবা যখন বার্সেলোনা ছেড়ে যাওয়ার কথা বললেন তখন নিজেকে আর ধরে রাখতে পারেনি ৮ বছরের থিয়াগো। কেঁদে উঠে বাবা মেসির কাছে আবদার করল, এই শহর ছেড়ে যাব না। মেসির স্ত্রী অ্যান্তোনেয়া রোকুজ্জোও কেঁদেছিলেন, কিন্তু আড়ালে। প্রিয় স্বামীকে বুঝতে দেননি নিজের কষ্ট। বার্সেলোনাকে নিয়ে মেসির পরিবারের যখন এই অবস্থা তখন মেসি নিজে ২০ বছরের মায়া ছেড়ে আদৌ কি ক্লাবটি ছাড়তে পারেন?

মেসির বার্সায় আসা

১৯৮৭ সালের ২৪ জুন আর্জেন্টিনার রোজারিওতে জন্ম নেওয়া মেসি বাবা হোর্হে মেসির চতুর্থ সন্তান। মেসির মনে ফুটবলের ভালোবাসা বা আকর্ষণ যাই বলি না কেন ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন তার নানি সেলিয়া। মাত্র চার বছর বয়সে স্থানীয় ক্লাব গ্রান্দোলির হয়ে মেসির প্রতিটি অনুশীলন সেশন বা ম্যাচে তার সঙ্গে মাঠে গিয়েছেন সেলিয়া। নানির প্রতি মেসিরও খুব আকর্ষণ ছিল। তাকে ছাড়া মাঠে যেতেনই না। কিন্তু ১১ বছর হওয়ার কিছু আগে প্রিয় নানিকে হারান মেসি। এতটাই আঘাত পেয়েছিলেন যে কিছুদিন ফুটবল বন্ধ ছিল মেসির। অবশ্য পরে আবার মাঠে ফিরেছেন। কিন্তু সেই থেকে প্রতি গোলের পর আকাশে তাকিয়ে নানির প্রতি গোল উৎসর্গ করে গেছেন, এখনো করেন।

ছোট থেকেই মেসি দৈহিক গড়নে ছোট ছিলেন। তাই তাকে ফুটবলার হিসেবে মেনে নিতে পারেনি অনেকেই। ঠাট্টাও হতো প্রায়। কিন্তু সেই ৬ বছর বয়স থেকে নিওয়েলস ওল্ড বয়েজে নিজেকে চিনিয়ে যাচ্ছিলেন। ১২ বছর বয়সী মেসিকে নিয়ে নিওয়েলস ওল্ড বয়েজের যুব কোচ আদ্রিয়ান কোরিয়া বলেছিলেন, ‘ওকে দেখে যে কেউ বলবে ওর ফুটবলার হওয়া অসম্ভব, কিন্তু ওর খেলা দেখে তারাই আবার বলবে- ওর জন্মই হয়েছে ফুটবলার হওয়ার জন্য।’ মেসির ১৩ বছর হতে না হতেই বার্সার সঙ্গে তার যোগসাজশ শুরু। তার বার্সায় আসায় বিখ্যাত টয়লেট পেপারে চুক্তিপত্র তৈরির পাশাপাশি মেসির হরমোন সমস্যারও কিঞ্চিৎ অবদান আছে। মাত্র ১০ বছর বয়সে শারীরিক ওই সমস্যা ধরা পড়ে মেসির। যার চিকিৎসা খরচ বেশ ব্যয়বহুল। স্টিল কারখানা ম্যানেজার বাবা হোর্হে মেসি এবং চুম্বক তৈরি কারখানায় কাজ করা মা সেলিয়া সুসিত্তিনির জন্য প্রতি মাসে ১ হাজার ডলারের মতো ব্যয় করা কঠিন ছিল। হোর্হে মেসির যে স্বাস্থ্যবীমা ছিল তা থেকে সর্বোচ্চ ২ বছর চিকিৎসা করানো যেত। কিন্তু এই সমস্যার জন্য দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার প্রয়োজন। নিওয়েলস এগিয়ে আসে। তারা কয়েক মাস মেসির পাশে দাঁড়ালেও পরে আর অর্থ দেয়নি। এরপর আর্জেন্টিনার অন্যতম সেরা ক্লাব রিভার প্লেজ পাশে দাঁড়ায়। কিন্তু তারাও দেশের অর্থনৈতিক মন্দার কারণে একটা সময় সরে যায়।

এমন সময় মেসির বাবা-মা যোগাযোগ করেন স্পেনের কাতালান অঞ্চলে থাকা তাদের এক আত্মীয়ের সঙ্গে। উদ্দেশ্য সেখানকার বার্সায় যুব অ্যাকাডেমিতে যুক্ত হতে পারলে চিকিৎসা খরচটা পাওয়া যাবে আর ছেলের ফুটবলার হওয়ার স্বপ্নও এগিয়ে যাবে। ২০০০ সালের সেপ্টেম্বরে সেই আত্মীয়রা বার্সার পক্ষ থেকে মেসির জন্য একটা ট্রায়ালের ব্যবস্থা করে দেয়। তখনকার পরিচালক চার্লি রেক্সাচ সেই প্রথম দেখাতেই ১৩ বছর বয়সী মেসিকে বার্সার জন্য চুক্তিবদ্ধ করে নেন। তখনই হাতের সামনে কোনো কাগজ না পেয়ে টয়লেট পেপার ব্যবহার করেন। মেসিকে বার্সায় আনার পাশাপাশি তার চিকিৎসার দায়িত্বও নেয় ক্লাবটি। আনুষ্ঠানিক ভাবে মেসিরা কাতালান অঞ্চলে চলে আসেন ২০০১ সালের সেপ্টেম্বরে। বার্সার স্টেডিয়াম নু ক্যাম্পের পাশেই ছোট্ট একটা ফ্ল্যাট নেন মেসির বাবা-মা। এখান থেকেই বার্সা-মেসির যুগলবন্দির শুরু। মেসির সঙ্গে তাই বার্সার সম্পর্কটা আত্মিক, দেনা-পাওনারও। এই ক্লাব ছেড়ে অন্য কোথাও ৬ বারের বর্ষসেরা তারকা যোগ দেবেন কীভাবে।

বার্সায় মেসির যা কিছু

সেই ২০০৮ থেকেই মেসির ভালোবাসার পাত্রী রোকুজ্জো। তার স্ত্রীর সঙ্গে সম্পর্কের কথা শুরুর এক বছর গোপন রেখেছিলেন বার্সা তারকা। কিন্তু ২০০৯-এ প্রকাশ পায় জন্ম শহর রোজারিওর মেয়েকেই ভালোবেসেছেন মেসি। দুজনের বিয়ে হয় ২০১৭ সালে সেই রোজারিও শহরেই। কিন্তু দেশের সঙ্গে মনের সম্পর্ক থাকলেও মেসি কিন্তু বার্সেলোনার, তার স্ত্রীও। তাই বার্সা ছাড়ার কথা বলতেই কেঁদেছে মেসির পরিবার। ঘটনাটা মেসি নিজের মুখেই বলেছেন, ‘আমার ইচ্ছা শোনার পর পুরো পরিবারই কাঁদতে শুরু করে। আমার ছেলেরা বিশেষ করে থিয়াগো বার্সেলোনা ছাড়তে চায়নি। সে তার প্রিয় স্কুল পরিবর্তন করতে চায় না কখনই। মাতেও এখনো ছোট, সে বুঝে না অন্য কোথাও যাওয়ার মানে কি। কিন্তু থিয়াগোর কাছে ব্যাপারটা খুবই কঠিন ছিল। সে একটু বড় হয়েছে। সে টিভিতে এ সংক্রান্ত কিছু একটা দেখে। তারপরই আমাকে জিজ্ঞাস করে। আমি তাকে জোর করে অন্য জায়গায় যাওয়া, নতুন স্কুলে ভর্তি হওয়া, নতুন বন্ধু তৈরি করা- এসব নিয়ে কিছুই বলতে চাইনি। যদিও পরে আমাকে সব বলতে হয়েছে। এরপরই সে কেঁদে ফেলে এবং অন্য কোথাও না যাওয়ার জন্য আমাকে বলে।’

বার্সেলোনার হয়ে চারটি চ্যাম্পিয়নস লিগ, ছয়টি কোপা দেল রে, ১০টি লা লিগার পাশাপাশি আরও শিরোপা জিতেছেন। তাই মেসির পরিবারের কাছে বার্সেলোনাই একমাত্র ঘর। এই জায়গা অন্য কোনো ক্লাবের পক্ষে নেওয়া সম্ভব না।

এছাড়া বার্সায় মেসির যে বাড়িটি আছে সেটাও তো নান্দনিক সৌন্দর্যে নিজের মতো করে গড়ে তুলেছেন মেসি। ডুপ্লেক্স ধাঁচের তিনতলা বাড়িটিতে আধুনিক জীবনের সব কিছুই আছে। বাড়ির ছাদ কাঠের তৈরি যেন রোদে গরম না হয়ে যায়, আর সেই ছাদে বসেই পাশের সুইমিংপুল থেকে গোসল করে এসে রোদ পোহান মেসিরা। সুইমিংপুলের পাশে সবুজ মাঠ, অর্ধেক ফুটবল সাইজের। তাতে প্রিয় কুকরকে নিয়ে খেলতে দেখা গেছে মেসিকে। ছেলেদের নিয়েও খেলেন অনেক সময়। বাড়ির জানালাগুলো দিয়ে কাতালান পাহাড় দেখা যায়। তাতে প্রতি সকালেই নান্দনিক সৌন্দর্যে দিন শুরুর উপলক্ষ পান মেসিরা। আর ডিজাইনাররা এই বাড়ির নাম দিয়েছেন ওয়ান-জিরো ইকো হাউজ (পরিবেশবান্ধব বাড়ি)। আর বিশ্বের সেরা গাড়ি প্রস্তুতকারক কোম্পানির সবকটির গাড়ি তার গ্যারেজে মজুদ আছে। এর মধ্যে মাসেরাতি, ফেরারি, অডি, মার্সিডিজ, বেন্টলি ও ক্রিসলার কোম্পানির গাড়ি আছে তার।

এখন কথা হলো বার্সায় এই সব কিছু রেখে আর এক বছর পর পরিবারের মনের বিরুদ্ধে গিয়ে ম্যানচেস্টার সিটি বা অন্য ক্লাবে পাড়ি জমাতে পারবেন কি এই ফুটবল জাদুকর?

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

error: Content is protected !!