বাংলাদেশে ৬৭ ভাগ মানুষ মাস্ক পরলে গরম ও অস্বস্তিতে ভোগেন

কেউ জানে না, এর শেষ কোথায়। মহামারি করোনায় ঘরে বসে প্রতিটা মানুষ এক অজানা শত্রুকে মোকাবেলা করছে।করোনায় স্বাস্থ্য সুরক্ষা বিষয়ক একটি মতামত জরিপে জানা গেছে, শতকরা ৬৭.৪০ ভাগ মানুষ মাস্ক পরলে গরম ও অস্বস্তিতে ভোগেন। নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হয় বলে মত দিয়েছে ২০.৯০ শতাংশ।

জরিপের ৬১.১০ শতাংশ মতে বলা হয়েছে, শারীরিক দূরত্ব বজায়ের নিয়ম অন্যরা মানে না বলে ইচ্ছা থাকলেও তারা মানতে পারেন না।

নিয়মিত হাত ধোয়াকে ৭২.৬০ শতাংশ মতে উপকারী বলা হলেও ৬.১০ শতাংশে এই সতর্কতার কথা মনেই থাকে না বলে জানানো হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) এক ডিজিটাল অনুষ্ঠানে এই জরিপের ফলাফল প্রকাশর পর এ নিয়ে আলোচনা করা হয়।

এ সময় উপস্থিত ছিলেন আইইডিসিআর-এর সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন, ইউনিলিভার বাংলাদেশের মার্কেটিং ডিরেক্টর আফজাল হাসান খান, ব্র্যাকের স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও জনসংখ্যা কর্মসূচির সহযোগী পরিচালক মোর্শেদা চৌধুরী, প্রথম আলোর বিশেষ প্রতিনিধি শিশির মোড়ল। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন প্রথম আলোর বিশেষ বার্তা সম্পাদক শওকত হোসেন।

ব্র্যাক ও লাইফবয়ের যৌথ উদ্যোগে প্রথম আলো ৩১ জুলাই থেকে ১১ আগস্ট পর্যন্ত সারা দেশে এই জরিপ পরিচালনা করে।

জরিপে করোনা মহামারীতে হাত ধোয়া, মাস্ক ব্যবহার করা, প্রয়োজনীয় নিয়ম মেনে চলা ও নিয়ম পালনে কী কী বাধা বা প্রতিকূলতার সম্মুখীন হতে হচ্ছে- এই সম্পর্কিত ১০টি প্রশ্ন করা হয়।

উদ্যোক্তারা জানান, প্রথম আলোর অনলাইনে পরিচালিত এই জরিপটি মূলত মতামতনির্ভর। এতে ৩ লাখ ২০ হাজার ৭৮১টি মতামত পাওয়া গেছে। জরিপের ১০টি প্রশ্নের মধ্যে ৫টি ছিল মাস্ক সম্পর্কিত, ৪টি হাত ধোয়া এবং ১টি সামাজিক দূরত্ব সম্পর্কে।

জরিপের অন্যতম প্রশ্ন ছিল, মাস্ক ব্যবহারের ফলে কীভাবে ঝুঁকি কমে?

এর জবাবে ৮৫.২০ শতাংশ মত এসেছে সঠিকভাবে মাস্ক ব্যবহার করলে হাঁচি-কাশির জলীয় কণার মাধ্যমে ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ে না। ৮.৭০ শতাংশ মতে, এতে করে দূষিত বাতাস ফুসফুসে যায় না। অপরদিকে মাস্ক ব্যবহারে যে ঝুঁকি কমে তা বিশ্বাসই করেন না- এমন মত পাওয়া গেছে ৫.৪০ শতাংশ।

জরিপে অংশ নেওয়ার আগে দিন ৩ থেকে ৫ বার হাত ধুয়েছেন বলে ৩৫.৫০ শতাংশ মতে জানানো হয়। ৬ থেকে ৯ বার ধোয়ার হার কমে দাঁড়িয়েছে ২৭.৭০ শতাংশ। তবে ২৫.৬০ শতাংশ মতে দিনে ১০ বারেরও বেশি হাত ধোয়ার অভ্যাসের কথা জানা গেছে। শতকরা ৯ ভাগ মতে আগের দিন ১ থেকে ২ বার হাত ধোয়ার কথা বলা হয়েছে।

৩৮.৪০ শতাংশ মতে হাত ধোয়ার ক্ষেত্রে মনে না থাকাকেই সবচেয়ে বড় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। আবার প্রয়োজনের সময় সাবান-পানি পাওয়া যায় না বলে মত এসেছে ৪৪.৯০ শতাংশ। ৭.৬০ শতাংশ মতে, সাবানের দাম বেশি বলে অনেকের হাত ধোয়া হয় না। হাত ধোয়ার জন্য সময়ই পাওয়া যায় না- এমন মত এসেছে ৯.২০ শতাংশ। বেশিরভাগ (৯০.১০) মতে নিয়ম মেনে ২০ সেকেন্ড হাত ধোয়া উচিত জানানো হলেও ৪.৬০ শতাংশ মত ১০ সেকেন্ডেই হাত ধোয়ার কাজটি সেরে ফেলার পক্ষপাতী।

৩ ফুটের শারীরিক দূরত্ব বজায়ের ক্ষেত্রে প্রধান বাধা যথেষ্ট জায়গা না পাওয়া, এমনটা প্রকাশ পেয়েছে ৩০.১০ শতাংশ মতে। ৬১.১০ শতাংশ মত এসেছে- অন্যরা এই নিয়ম মানে না বলে তাদেরও সবসময় মানা হয় না। অল্পসংখ্যক মত (৬.১০) পাওয়া গেছে-এই সতর্কতার কথা মনেই থাকে না বলে।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত আইইডিসিআর-এর সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়ে বলেন, এই দেশে মার্চ মাসে করোনা শুরু হওয়ার পর আগস্ট মাসে এসেও আমরা ঘরে বসে থাকতে পারি না। যুক্তিপূর্ণ আচরণ আর কার্যকর ব্যবস্থা নিয়ে আমাদের দৈনন্দিন কাজগুলো চালিয়ে যেতে হবে। স্বাস্থ্যবিধি প্রচার, সুবিধাজনক স্থানে সাবান-পানির ব্যবস্থা রাখা, রোগী শনাক্ত করা, কোয়ারেন্টাইনের ব্যবস্থা করা ও সমাজে এ বিষয়ে নেতিবাচক মনোভাব দূর করতে প্রতিটি এলাকায় ভলান্টিয়ার নিয়োগ করতে হবে। এরকম জরিপের মাধ্যমে মাঠের অবস্থা বোঝা যাবে।

ইউনিলিভার বাংলাদেশের মার্কেটিং ডিরেক্টর আফজাল হাসান খান বলেন, লাইফবয় ব্র্যান্ডের একটা লক্ষ্য হলো মানুষের জীবন বাঁচানো। পরিচ্ছন্নতা বজায় রেখে রোগ প্রতিরোধে অনেকদিন থেকেই আমরা কাজ করছি। তাই এই করোনা মহামারীতেও সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে আমরা ব্র্যাক ও প্রথম আলোর এই উদ্যোগে যুক্ত হয়েছি।

ব্র্যাকের সহযোগী পরিচালক মোর্শেদা চৌধুরী বলেন, করোনার শুরু থেকেই সারা দেশে বিশাল কর্মীবাহিনি ব্র্যাক সেবা দিয়ে যাচ্ছে। স্বাস্থ্যবিধি প্রচার, সচেতনতা তৈরি, অসহায় পরিবারে খাদ্য সহায়তা, আর্থিক সহায়তা প্রভৃতি কাজ করেছি আমরা। করোনার শুরু থেকে এ পর্যন্ত ৭ কোটি ৯০ লাখ মানুষকে সরাসরি সেবা দিয়েছি। এই জরিপ করোনা প্রতিরোধে ভূমিকা রাখতে সহায়ক হবে।

প্রথম আলোর বিশেষ প্রতিনিধি শিশির মোড়ল সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন জেলায় ঘুরে করোনা পরিস্থিতি নিয়ে তাঁর পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন। তিনি বলেন, সাধারণ মানুষ এই বিপদকে খুব একটা আমলে নিচ্ছে না। এটা কঠোরভাবে নজরদারিতে না রাখলে ভোগান্তি অনেক বাড়তে পারে।  
প্রসঙ্গত,বাংলাদেশে কোভিড-১৯ প্রাদুর্ভাবের ১৭৩তম দিনে নতুন করে ২ হাজার ৪৩৬ জনের দেহে করোনাভাইরাসের উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে। আক্রান্তদের মধ্যে ৪৫ জন মারা গেছেন। এসময়ে সুস্থ হয়েছেন ৩ হাজার ২৭৫ জন।

বৃহস্পতিবার দুপুরে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. নাসিমা সুলতানা সাক্ষরিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানায়, নতুন করে ১৫ হাজার ৫০১টি নমুনা সংগ্রহ করা হয়। আগের কিছু নিয়ে পরীক্ষা করা হয়েছে ১৫ হাজার ১২৪টি। এ নিয়ে দেশে মোট নমুনা পরীক্ষা করা হলো ১৫ লাখ ৩৮৫টি। নমুনা পরীক্ষার তুলনায় গত ২৪ ঘণ্টায় শনাক্তের হার ১৬ দশমিক ১১ শতাংশ।

সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, নতুন নমুনা পরীক্ষায় আরও ২ হাজার ৪৩৬ জনের দেহে করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়েছে। এ নিয়ে দেশে মোট আক্রান্ত হয়েছেন ৩ লাখ ৪ হাজার ৫৮৩ জন। মোট সংক্রমণের শনাক্তের হার ২০ দশমিক ৩০ শতাংশ। আক্রান্তদের মধ্যে মারা গেছেন আরও ৪৫ জন। এ নিয়ে মৃতের সংখ্যা দাঁড়াল ৪ হাজার ১২৭ এ। শনাক্ত বিবেচনায় মৃত্যুর হার ১ দশমিক ৩৫ শতাংশ।

নতুন করে সুস্থ হয়েছেন আরও ৩ হাজার ২৭৫ জন। সবমিলিয়ে এ পর্যন্ত সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ১ লাখ ৯৩ হাজার ৪৫৮ জন। শনাক্ত বিবেচনায় সুস্থতার হার ৬৩ দশমিক ৫২ শতাংশ।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

error: Content is protected !!