December 3, 2020

মাই পেটারসন. লাইফ

ভয়েস অফ দ্যা কমিউনিটি

বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু প্রণব: প্রধানমন্ত্রী না হয়েও তিনি ভারতের ‘সেরা প্রধানমন্ত্রী’

জন্মলগ্ন থেকেই বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু প্রণব মুখোপাধ্যায়। ওই সময়ে রাজ্যসভার তরুণ সদস্য হিসেবে ভারত সরকারের কাছ থেকে বাংলাদেশের প্রবাসী সরকারের স্বীকৃতি আদায়ে সরব হয়ে ওঠেন তিনি। আর সে কারণেই তৎকালীন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী তাকে গুরুত্ব দিতে শুরু করেন। নিজের আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ ‘দ্য ড্রামাটিক ডিকেড: দ্য ইন্দিরা গান্ধী ইয়ারস’র একটি অধ্যায়ে এ কথা নিজেই জানিয়েছেন তিনি। লিখেছেন, এরপরই তাকে একের পর এক দায়িত্ব দিয়ে বাংলাদেশের পক্ষে জনমত গঠনে বিভিন্ন দেশ সফরে পাঠান ইন্দিরা। আর এর মধ্য দিয়েই বাংলাদেশের জনগণের সঙ্গে অকৃত্রিম বাধনে জড়িয়ে পড়েন তিনি
ভারতের প্রবীণ রাজনীতিবিদ, সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায় করোনায় আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সোমবার (৩১ আগস্ট) সন্ধ্যা সোয়া ৬টার দিকে মারা গেছেন। তার বয়স হয়েছিল ৮৪ বছর।

সন্ধ্যায় প্রণব মুখার্জির ছেলে অভিজিৎ মুখার্জি টুইটে জানিয়েছেন, খুবই দুঃখের সঙ্গে জানাচ্ছি, আমার বাবা প্রণব মুখার্জি মারা গেছেন। চিকিৎসকরা সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালিয়েছেন। ভারতজুড়ে মানুষের কাছ থেকে প্রার্থনা পেয়েছি। এরপরও বাবাকে ফেরাতে পারিনি। আমি আপনাদের সবাইকে ধন্যবাদ জানাই পাশে থাকার জন্য।

সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, এর আগে সোমবার দিল্লির সেনা হাসপাতাল তার শারীরিক অবস্থার অবনতির কথা জানিয়েছিল। অবশ্য শনিবার (২৯ আগস্ট) হাসপাতাল জানিয়েছিল, প্রণব মুখার্জির শারীরিক অবস্থা আগের চেয়ে কিছুটা উন্নতি হয়েছে। চিকিৎসায় সাড়া দিচ্ছেন। তবে এখনও গভীর কোমায় আচ্ছন্ন। তার ফুসফুস সংক্রমণের চিকিৎসা চলছে।

প্রায় তিন সপ্তাহ ধরে দিল্লির আর্মি রিসার্চ অ্যান্ড রেফারেল হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন বর্ষীয়ান এই কংগ্রেস নেতা। গত ৯ আগস্ট পড়ে গিয়ে মাথায় আঘাত পেয়েছিলেন তিনি। এরপর স্নায়ুঘটিত সমস্যা দেখা দেওয়ায় গত ১০ আগস্ট তাকে আর্মি রিসার্চ অ্যান্ড রেফারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেদিনই অপারেশন হয় তার মাথায়। এছাড়া এর আগে থেকেই তিনি করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত ছিলেন।

ভারতের ত্রয়োদশ রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি। ২০১২ সালে দেশের রাষ্ট্রপতি হওয়ার আগে প্রণব মুখার্জি কয়েকবার অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন। ১৯৮০ সাল থেকে তিনি একাধিক সরকারের অর্থমন্ত্রী ছিলেন। আনুগত্য ও অসামান্য প্রজ্ঞাবান এই বাঙালি ভারতের সর্বক্ষেত্রে শ্রদ্ধার পাত্র। গতবছরের আগস্টে তিনি ভারতের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা ‘ভারতরতœ’ পুরস্কারে ভূষিত হন।

প্রণব মুখার্জির মৃত্যুতে কেবল রাজনৈতিক অঙ্গন নয়, গোটা ভারতে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। জননন্দিত এই রাজনীতিকের প্রয়াণ ভারতের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি বলে শোক প্রকাশ করছেন বিভিন্ন মহলের রাজনীতিবিদ। এমন নির্ভেজাল ও দেশপ্রেমিক একজন রাজনীতিবিদকে হারিয়ে বেদনাহত তারা।

ভারতের রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দ, প্রধানমন্ত্রীর নরেন্দ্র মোদী, কংগ্রেস নেত্রী সোনিয়া গান্ধী, রাহুল গান্ধী ও পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বরেণ্য রাজনীতিবিদ প্রণব মুখার্জির মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন।
কংগ্রেস সমালোচকদের কাছে তিনি প্রধানমন্ত্রী না হয়েও ‘ভারতের সেরা প্রধানমন্ত্রী’ ছিলেন। প্রণব মুখোপাধ্যায় আমৃত্যু কংগ্রেসের সদস্য ছিলেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেছেন। হয়েছেন ভারতের প্রথম বাঙালি রাষ্ট্রপতি।

১৯৬৯ সালে ইন্দিরা গান্ধী রাজ্যসভায় নির্বাচনের পর থেকে প্রায় প্রতিটি কংগ্রেস সরকারের মন্ত্রী ছিলেন প্রণব। ২০০৪ সালে সোনিয়া গান্ধী প্রধানমন্ত্রী হতে অস্বীকৃত জানালে ওই পদের জন্য তাকে প্রথম পছন্দ হিসেবে প্রত্যাশা করা হয়েছিল। পরে নিরপেক্ষ মনমোহন সিংকে বেছে নিয়েছিল কংগ্রেস। তবে ২০১২ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত ভারতের রাষ্ট্রপতি হিসেবে দর্শনীয় কেরিয়ার শেষ করেছিলেন প্রণব।

২০১৭ সালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং উল্লেখ করেছিলেন তাকে যখন প্রধানমন্ত্রী করা হয়েছিল তখন প্রণব মুখোপাধ্যায়ের মনখারাপ হয়েছিল। সাবেক এই রাষ্ট্রপতির বইয়ের উদ্বোধনকালে মনমোহন বলেছিলেন, তার মন খারাপ হওয়ার কারণ ছিল। কিন্তু তিনি আমাকে শ্রদ্ধা করেছেন এবং আমাদের একটি দুর্দান্ত সম্পর্ক রয়েছে যা আজীবন অব্যাহত থাকবে।

ভারতের বীরভূম জেলার কীর্ণাহারের অদূরের মিরিটি গ্রামে ১৯৩৫ সালের ১১ ডিসেম্বর প্রণব মুখোপাধ্যায়ের জন্ম। বাবা কামদাকিঙ্কর ছিলেন বিশিষ্ট স্বাধীনতা সংগ্রামী ও কংগ্রেস নেতা। জেলা কংগ্রেস সভাপতি, এআইসিসি সদস্য ও পশ্চিমবঙ্গ বিধান পরিষদেরও সদস্য হয়েছিলেন তিনি।

তবে সিউড়ির বিদ্যাসাগর কলেজ বা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থাকাকালীন রাজনীতির সঙ্গে ছিলেন প্রবণ। ইতিহাস ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তরের পরে মন দিয়েছিলেন আইন পড়ায়। এরপর ডাক ও তার বিভাগে সাধারণ কেরানি এবং হাওড়ার বাঁকড়া স্কুলে শিক্ষকতার পরে ১৯৬৩ সালে দক্ষিণ ২৪ পরগনার বিদ্যানগর কলেজে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের শিক্ষকতায় যোগ দেন।

১৯৫৭ সালে শুভ্রাদেবীকে বিয়ের সময় স্বজনদের আপত্তি ছিল। কারণ শুভ্রা ব্রাহ্মণ পরিবারের মেয়ে ছিলেন না। প্রণব তাতে তোয়াক্কা করেননি। ৯৬৬ সালে বিদ্যানগর কলেজের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা হরেন্দ্রনাথ মজুমদারের হাত ধরে শুরু হয় প্রণবের রাজনৈতিক সফর। ১৯৬৭ সালের বিধানসভা ভোটে হরেন্দ্রনাথ প্রার্থী হন। তার প্রচারে নামেন প্রণব। খুব দ্রুতই বাংলা কংগ্রেসের প্রধান ও রাজ্যের সেসময়কার মুখ্যমন্ত্রী অজয় মুখোপাধ্যায়ের নজরে পড়েন।

১৯৬৯ সালের বিধানসভা ভোটে রাজ্যের নানা প্রান্তে প্রচারে পাঠানো হয় প্রণবকে। মেলে রাজ্যসভার সাংসদ পদ। ওই বছর মেদিনীপুর লোকসভা কেন্দ্রের উপনির্বাচনে বাংলা কংগ্রেস সমর্থিত নির্দলীয় প্রার্থী সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী কে ভি কৃষ্ণমেননের জয়ের নেপথ্যেও বড় ভূমিকা পালন করেন। এরপর নজরে পড়েন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর। ১৯৭৫ সালে কংগ্রেসের টিকিটে দ্বিতীয়বার রাজ্যসভার সদস্য হন প্রণব। এর আগে ১৯৭৩ সালে শিল্প প্রতিমন্ত্রী হিসেবে প্রথমবার কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় প্রবেশ।

ইন্দিরা নিহত হওয়ার পরে কংগ্রেসে কোণঠাসা হয়ে পড়েছিলেন প্রণব। রাজিব গান্ধীর আমলে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিত্ব থেকে সরিয়ে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে কংগ্রেসের সভাপতি করে পাঠানো হয় তাকে। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই হাইকমান্ডের সঙ্গে ঝামেলার জেরে দল থেকে বহিষ্কৃত হন। এরপর রাষ্ট্রীয় সমাজবাদী কংগ্রেস নামে নতুন দল গড়ে ১৯৮৭ সালের বিধানসভা ভোটে বহু আসনে প্রার্থী দিয়েছিলেন প্রণব। তবে তাদের একজনও জিততে পারেননি। কিন্তু কয়েক ডজন আসনে কংগ্রেস প্রার্থীদের হার নিশ্চিত করেছিলেন। প্রধানমন্ত্রিত্বের শেষ পর্বে রাজীব দলে ফিরিয়েছিলেন তাকে।

কিন্তু ১৯৯১ সালের লোকসভা ভোটের মাঝেই তামিল জঙ্গিদের হামলায় নিহত হন রাজীব। এরপর পি ভি নরসিংহ রাওয়ের জমানায় প্রথমে যোজনা কমিশনের ডেপুটি চেয়ারম্যানের দায়িত্ব দেওয়া হয় প্রণবকে। অর্থমন্ত্রী মনমোহন সিংহের আর্থিক সংস্কার নীতি রূপায়ণে পালন করেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। দু’বছর পরে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দিয়ে প্রণবকে ক্যাবিনেটে ফিরিয়েছিলেন রাও। ১৯৯৫ সালে পান পররষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব।

১৯৯৬ সালের লোকসভা ভোটে কংগ্রেসের আসন সংখ্যা ২৩২ থেকে নেমে এসেছিল ১৪০ এ। ভোটে ভরাডুবির দায় নিয়ে নরসিংহ রাও কংগ্রেস সভাপতির পদ থেকে ইস্তফা দেন। এরপর তার সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে প্রণবের নাম উঠে এসেছিল জোরালোভাবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সভাপতি হয়েছিলেন সীতারাম কেসরী।
১৯৯৮ সালে লোকসভা ভোটের পরে কংগ্রেসের অন্দরে ‘অভ্যুত্থানে’ গদি হারান কেসরী। ‘স্বেচ্ছা নির্বাসন’ শেষে দলের দায়িত্ব নেন সোনিয়া গান্ধী। ২০০৪ সালের লোকসভা ভোটে অটলবিহারী বাজপেয়ী সরকারের পতনের পরে কেন্দ্রে আনুষ্ঠানিক আত্মপ্রকাশ হয় ইউপিএ জোটের। আর সেই ভোট প্রণবের জীবনেও নতুন জোয়ার এনে দিয়েছিল। অধীর চৌধুরীর ‘আমন্ত্রণে’ মুর্শিদাবাদের জঙ্গিপুর লোকসভা কেন্দ্রে প্রার্থী হয়ে সেই প্রথমবার ভোটে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি হন।

এরপর সোনিয়া প্রধানমন্ত্রী হতে অপারগতার কথা জানানোর পরে আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসেন প্রবীণ রাজনীতিবিদ প্রণব মুখোপাধ্যায়। কিন্তু কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বেছে নেয় ‘অরাজনৈতিক’ মনমোহনকে। এরপর ইউপিএ-র দু’টি মেয়াদে প্রতিরক্ষা, বিদেশ, অর্থমন্ত্রীর পাশাপাশি নানা গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক দায়িত্ব সামলান। ২০১২ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার পরে ইতি টানেন বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের। দেশ-বিদেশের নানা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সম্মানসূচক ডিগ্রি পাওয়ার পাশাপাশি ভারতীয় অর্থনীতি ও দেশ গঠন ইস্যুতে বেশ কয়েকটি বইও লিখেছেন প্রণব মুখোপাধ্যায় ।

error: Content is protected !!