November 29, 2020

মাই পেটারসন. লাইফ

ভয়েস অফ দ্যা কমিউনিটি

বরগুনার রিফাত হত্যা মামলা: মিন্নির যত সমালোচনা

দেশজুড়ে আলোচিত বরগুনার শাহনেওয়াজ রিফাত (রিফাত শরীফ) হত্যা মামলায় মিন্নিসহ ৬ জনের ফাঁসির আদেশ দিয়েছেন আদালত। প্রাপ্তবয়স্ক ১০ আসামির মধ্যে বাকি ৪ জনকে খালাস দেয়া হয়েছে।বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিচারক আসাদুজ্জামানের আদালতে এ রায় ঘোষণা করা হয়। নানা কারণেই মিন্নি বরাবরই আলোচিত এবং সমালোচিত হয়েছেন।

২০১৯ সালের ১ সেপ্টেম্বর রিফাত হত্যাকাণ্ডের দুই খণ্ডের ১২৩২ পৃষ্ঠার যে অভিযোগপত্র আদালতে জমা দেন তদন্তকারী কর্মকর্তা মো. হুমায়ূন কবির, তাতে মিন্নির কর্মকাণ্ডই বর্ণনা করা হয়েছিল ৩২ পৃষ্ঠাজুড়ে। জমা দেয়া ওই অভিযোগপত্রে কেন হত্যার পরিকল্পনা, কোথায়-কীভাবে তা করা হয়েছে, পরিকল্পনার বাস্তবায়ন ও হত্যার আগে-পরে পরিকল্পনা বাস্তবায়নকারীদের সঙ্গে মিন্নির যোগাযোগের বর্ণনা দেয়া হয়েছে।

অভিযোগপত্রে বলা হয়, রিফাত শরীফ হত্যাকাণ্ডের মূল কারণ ছিল নয়ন বন্ডের জন্মদিনে মিন্নির অংশগ্রহণ ও নয়নের মুখে মিষ্টি তুলে দেয়া। বরগুনা ইউটিডিসি সরকারি মডেল প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে নয়ন বন্ড জন্মদিন উদযাপন করে। ওই অনুষ্ঠানে মিন্নি ছিলেন প্রধান মেহমান। জন্মদিনের ওই অনুষ্ঠানের ভিডিও করেন নয়ন বন্ডের ঘনিষ্ঠ বন্ধু হেলাল শিকদার। ওই ভিডিওতে দেখা গেছে, মিন্নি নয়ন বন্ডকে মিষ্টি খাইয়ে দিচ্ছেন। ভিডিওটি হেলাল শিকদার অনলাইনে ছেড়ে দিলে রিফাত শরীফ ক্ষুব্ধ হন।

২৪ জুন বেলা সাড়ে ১১টায় রিফাত শরীফ বরগুনা জিলা স্কুল মাঠে ডেকে নিয়ে এ বিষয়ে হেলাল শিকদারকে জিজ্ঞাসা করেন। একপর্যায়ে হেলালের একটি ওয়ালটন মোবাইল ফোন রিফাত শরীফ কেড়ে নেন।


পরে নয়ন বন্ড ওই মোবাইল ফোনটি মিন্নিকে উদ্ধার করে দিতে বলেন। মিন্নি ওই মোবাইল ফোনটি রিফাতের কাছ থেকে কেড়ে নিতে গেলে ঝগড়া শুরু হয়। এক পর্যায়ে মিন্নির গায়ে হাত তোলেন রিফাত। গায়ে হাত তোলায় ক্ষুব্ধ হয় মিন্নি। সেই ঘটনার প্রতিশোধ নিতেই নয়ন বন্ডের সঙ্গে মিন্নি রিফাতকে হত্যার পরিকল্পনা করে বলে তদন্তে উল্লেখ করা হয়।

জানা যায়, মিন্নি রিফাতকে বিয়ের আগে বিয়ে করেছিলেন নয়ন বন্ডকে। নয়ন বন্ড স্বামী থাকা অবস্থাতেই রিফাতকে বিয়ে করেন মিন্নি। রিফাত শরীফের সাথে মিন্নির বিয়ের পরের দিন মিন্নির বাবা কাজীকে ফোনে বলেন, মিন্নি ও নয়ন বন্ড কাল তার কাছে যাবে। আপনি ওদের ডিভোর্স করিয়ে দিয়েন।

মিন্নি ও নয়ন বন্ডের নামে একটি আপত্তিকর ভিডিও বিভিন্ন পর্নসাইটে ছড়িয়ে পড়ে। পর্নসাইট ছাড়াও ওই ভিডিওটির অংশবিশেষ (কাটপিস) সামাজিকমাধ্যম ইউটিউব ও ফেসবুকেও শেয়ার করা হয়।

গণমাধ্যমের খবরে উঠে এসেছে, মিন্নি বলেছেন, নয়নের সঙ্গে তার অনৈতিক সম্পর্ক ছিল এবং নয়ন মাঝে-মধ্যে দু’জনের একান্ত সময়ের ভিডিও ও ছবি ধারণ করতেন।উল্লেখ্য, রিফাত শরীফ হত্যাকান্ডের পর নয়ন বন্ড বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন।


মামলায় ফাঁসির আদেশ পেয়েছে রিফাত ফরাজি, আল কাইউম ওরফে রাব্বি আকন, মোহাইমিনুল ইসলাম সিফাত, রেজওয়ান আলী খান হৃদয় ওরফে টিকটক হৃদয়, মো. হাসান, আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নি।খালাস পেয়েছেন মো. মুসা, রাফিউল ইসলাম রাব্বি, মো. সাগর এবং কামরুল ইসলাম সাইমুন।এ মামলায় ৬ জনের মৃত্যুদণ্ড ছাড়াও ৪ জনকে খালাস প্রদান করা হয়েছে। এছাড়া প্রত্যেককে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করেছেন আদালত। রায় ঘোষণা করেন বরগুনার জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিচারক মো. আছাদুজ্জামান।

সকালে ‌ক‌ঠোর নিরাপত্তার মধ্য দি‌য়ে বেলা ১১টা ৪০ মি‌নি‌টে কারাগার ‌থে‌কে আসামি‌দের আদাল‌তে আনা হয়। দুপুর ১টা ২০ মিনিটে বরগুনা জেলা দায়রা জজ আদালতের বিচারক এ রায় ঘোষণা শুরু করেন। এ সময় জামিনে থাকা আয়শা সিদ্দিকা মিন্নি ও কারাগারে থাকা ৮ আসামি উপস্থিত ছিলেন।
 
মামলায় রিফাতের স্ত্রী আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নিসহ ৬ জনের ফাঁসির আদেশ দেওয়ায় অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন মিন্নির বাবা মো. মোজাম্মেল হোসেন কিশোর।বেলা সোয়া দুইটার দিকে রায় ঘোষণা শেষ হওয়ার পর আদালত প্রাঙ্গণে গণমাধ্যমকে এসব কথা বলেন মোজাম্মেল হোসেন কিশোর।

রায়ে অসন্তুষ্ট মিন্নির বাবা মো. মোজাম্মেল হোসেন কিশোর বলেন, আমরা আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলাম। কিন্তু মিন্নির প্রতি অবিচার করা হয়েছে। আমরা উচ্চ আদালতে যাব।


এর আগে ১৬ সেপ্টেম্বর এ মামলার দুই পক্ষের যুক্তিতর্কের শুনানি শেষে বরগুনার জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিচারক মো. আসাদুজ্জামান রায়ের জন্য বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) দিন ধার্য করেন।

 
২০১৯ সালের ২৬ জুন বরগুনা সরকারি কলেজের সামনে শত শত লোকের উপস্থিতিতে স্ত্রীর সামনে রিফাত শরীফকে (২৫) কুপিয়ে হত্যা করা হয়। পরে রিফাতকে কুপিয়ে হত্যার একটি ভিডিও ফেসবুকে ভাইরাল হয়। ঘটনার পরদিন ১২ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত আরও পাঁচ-ছয়জনের বিরুদ্ধে মামলা করেন রিফাতের বাবা আবদুল হালিম দুলাল শরীফ।প্রসঙ্গত, ২০১৯ সালের ২৬ জুন বরগুনা সরকারি কলেজের সামনে নয়ন বন্ড ও তার সহযোগী সন্ত্রাসীরা প্রকাশ্যে রামদা দিয়ে কুপিয়ে রিফাত শরীফকে গুরুতর আহত করে। এরপর বীরদর্পে অস্ত্র উঁচিয়ে এলাকা ত্যাগ করে তারা। গুরুতর আহত রিফাত বরিশাল শের-ই বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ওই দিনই মারা যান।


গত ১ সেপ্টেম্বর রিফাত শরীফ হত্যা মামলায় রিফাতের স্ত্রী মিন্নিসহ ২৪ জনের বিরুদ্ধে বরগুনার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে দুই ভাগে বিভক্ত অভিযোগপত্র দেয় পুলিশ। একই সঙ্গে রিফাত হত্যা মামলার এক নম্বর আসামি নয়ন বন্ড বন্দুকযুদ্ধে নিহত হওয়ায় তাকে মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। নৃশংসভাবে রিফাতকে কুপিয়ে হত্যার বহুল আলোচিত এ মামলায় পুলিশ যে ২৪ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দিয়েছিল, তাদের মধ্যে ১০ জনের বিচার চলে জজ আদালতে। বাকি ১৪ জন অপ্রাপ্তবয়স্ক হওয়ায় তাদের বিচার চলছে বরগুনার শিশু আদালতে আলাদাভাবে।

গত ১ জানুয়ারি রিফাত হত্যা মামলার প্রাপ্তবয়স্ক ১০ আসামির বিরুদ্ধে চার্জ গঠন করেন বরগুনার জেলা ও দায়রা জজ আদালত। অন্যদিকে গত ৮ জানুয়ারি রিফাত হত্যা মামলার অপ্রাপ্তবয়স্ক ১৪ আসামির বিরুদ্ধে চার্জ গঠন করেন বরগুনার শিশু আদালত।

এ মামলার চার্জশিটভুক্ত প্রাপ্তবয়স্ক আসামি মো. মুসা এখনও পলাতক রয়েছেন।    
   

error: Content is protected !!