‘বঙ্গবন্ধুর আদর্শ থেকে বিচ্যুত হচ্ছে পাঠক্রম’

অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ ও বৈষম্যহীন সমাজ নিয়ে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ স্কুল-কলেজের পাঠ্যসূচিতে প্রতিফলিত হচ্ছে না বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক সাদেকা হালিম৷
অনেকক্ষেত্রে সংবিধানের সঙ্গে পাঠক্রম সাংঘর্ষিক হচ্ছে বলেও মনে করেন তিনি৷

ডয়চে ভেলে: বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীর ক্ষণগণনা তো শুরু হয়েছে৷ ১৭ তারিখ আনুষ্ঠানিকভাবে মুজিববর্ষ শুরু হবে৷ এই আয়োজন নিয়ে আপনার সার্বিক মূল্যায়ন কী?

সাদেকা হালিম: এটা খুবই ভালো উদ্যোগ৷ এর প্রস্তুতি আমরা গত এক বছর ধরেই নিচ্ছি এবং ধীরে ধীরে বাস্তবায়নের দিকে যাচ্ছি৷ সরকারি-বেসরকারি নানা উদ্যোগ নেয়া হয়েছে৷ কিন্তু আমরা মনে হয় খুব শিগগিরই মূল্যায়ন করার চেষ্টা করছি৷ আমার মনে হয় আরো কিছু দিন যেতে হবে৷ তবে যতোটুকু বলতে পারি সরকারি কর্মকর্তা আছেন, দলীয় নেতারা আছেন, কিন্তু জনগণ কী চায়?

বঙ্গবন্ধু একটি দলের নেতা ছিলেন, কিন্তু তিনি স্বাধীনতা যুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছেন, মুক্তিযুদ্ধের ডাক দিয়েছেন, তিনি বাংলাদেশের একজন তেজস্বী স্থপতি৷ ফলে তার যে স্পিরিটটা সেটাকে ধারণ করার বিষয়টা আমি বেশি গুরুত্ব দিয়ে দেখবো৷ কিন্তু আমরা দেখতে পাচ্ছি তার বিপরীত কিছু ঘটনাও ঘটে যাচ্ছে৷ যেমন নানা পোস্টারের মধ্যে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে আসা হচ্ছে৷ কিছু খেলো পোস্টার যেগুলোর ওপর দেখেছি ফুটপাতের ওপর পুলিশ বসে আছে৷ টিস্যুবক্সে বঙ্গবন্ধুকে, পানির বোতলে বঙ্গবন্ধুকে, শপিং ব্যাগে বঙ্গবন্ধুর ছবি দেয়া হয়েছে, মুখোশে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে আসা হয়েছে৷ এটা আমাদের মধ্যে কিছু উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার জন্ম দিচ্ছে যে, কারা আসলে এগুলো করছে৷ কিছু অশুভ শক্তি নিশ্চয়ই এর মধ্যে সম্পৃক্ত হয়েছে, কিছু অপরাজনীতি তো এর মধ্যে অবশ্যই আছে৷ এভাবে আমরা জাতির পিতাকে দেখতে চাই না৷

যে অনুষ্ঠানগুলো হচ্ছে, সেগুলোতেও তার যে দর্শন, যেমন মুক্তিযুদ্ধ, সেটা থেকে আমরা সরে যাচ্ছি কিনা৷ অর্থাৎ, তিনি বৈষম্যবিহীন একটি সমাজের কথা বলেছেন, উনি সমতার কথা বলেছেন, উনি অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের কথা বলেছেন, উনি সুশাসনের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন, উনি দুর্নীতি দমনের কথা বলেছেন৷ এখন টিভি-রেডিওতে আমরা সবসময় যে ভাষণের কথা শুনতে পাচ্ছি, সেগুলোতেও একই কথা উঠে আসছে৷ কিন্তু বাস্তবে আমরা দেখছি কোনো কোনো ক্ষেত্রে রাজনীতিকে, বিশেষ করে আওয়ামী রাজনীতিকে ব্যবহার করে আমরা পাপিয়ার মতো নারী নেত্রীর উত্থান দেখছি, ক্যাসিনো কালচার দেখছি, পার্লামেন্ট সদস্যদেরও দেখছি অপরাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে যাচ্ছেন৷ সেগুলো তো মুজিববর্ষের যে স্পিরিট, তার সঙ্গে যায় না৷

বঙ্গবন্ধু জাতির পিতা হিসেবে কোনো দলের নন, বরং দল-মত নির্বিশেষে সবার৷ কিন্তু অনেকেই অভিযোগ করছেন, মুজিববর্ষের আয়োজনে সবাইকে সম্পৃক্ত করা হয়নি৷

সমালোচনা রয়েছে৷ কিন্তু আওয়ামী লীগ দায়িত্ব নিয়ে এ আয়োজন করছে৷ এবং এটা তাদের ম্যান্ডেট৷ কিন্তু আমি এটাও মনে করি বড় রাজনৈতিক দল হিসেবে তাদের অনেক সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে থাকতে হবে এবং অন্যান্য রাজনৈতিক মতে যারা বিশ্বাসী তাদেরকেও নিয়ে আসতে হবে৷ তবে এখানে আরেকটা কথা থেকে যায়, আমি কোন রাজনৈতিক মতে বিশ্বাসী লোকজনকে নিয়ে আসবো৷ যারা মুক্তিযুদ্ধকে বিশ্বাস করেনি, যারা যুদ্ধাপরাধীদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়েছেন তাদের নিয়ে আসলে তো আমাদের মধ্যেই একটা দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হবে৷ সে কারণেই আমি মনে করি তারা নিশ্চয়ই আমন্ত্রণ জানাতে চান, কিন্তু এর আগে এ বিষয়গুলোও চলে আসছে৷ এগুলো অনেক সংবেদনশীল বিষয়৷
পুনর্মিলনীতে যদি নানা পার্টি একসঙ্গে হতে পারি, তাহলে মুজিববর্ষেও আমরা সবাইকে এক করতে পারি৷ তবে যেসব রাজনৈতিক দল রয়েছে, সকলের কাছেই দল-মত নির্বিশেষে তিনি জাতির পিতা৷ ফলে তাদেরও দায়িত্ব আছে, সরকারের দিকে তাকিয়ে না থেকে তারা নিজেরাও কিন্তু মুজিববর্ষ পালন করতে পারেন৷

বঙ্গবন্ধুর যে আদর্শের কথা বলছেন, বৈষম্যহীন বাংলাদেশ, অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ, সে আদর্শ কি জাতির কাছে পৌঁছে দেয়া হচ্ছে?

এটা খুব জটিল একটা বিষয়ে পরিণত হয়েছে৷ আমরা অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের কথা বলছি, আমরা বলছি আমরা একটা ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র৷ আমরা নীতিগত কথা বলতেই পারি এবং আমরা বক্তৃতা দিতে পারি, টিভিতে টক শো করতে পারি৷ কিন্তু যখন আমি বাস্তবে দাঁড়িয়ে এ বিষয়টি নিয়ে বলছি, তখন বাস্তবতা সেটি কতোটুকু মেনে নিচ্ছে? আমি শিক্ষক হিসেবে বলতে চাই, এই বিষয়গুলো খুব সংবেদনশীল হয়ে গেছে৷ এটাকে বাস্তবায়ন করতে হলে একেবারে প্রাইমারি লেভেল থেকে শুরু করে আমাদের আসতে হবে৷ কিন্তু আমরা মাঝেমধ্যেই দেখছি আমাদের স্কুল-কলেজের কারিকুলাম বদলে যাচ্ছে৷ কোনো কোনো ক্ষেত্রে দেখতে পাই আমরা সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক জায়গায় চলে যাচ্ছি৷ ফলে মনস্তাত্ত্বিক জায়গায় সঠিক ম্যাসেজ আমরা দিতে পারছি না৷ সে কারণেই আমি অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ দেখতে চাই, নারী-পুরুষের ব্যবধান কমাতে চাই৷ আমার নীতি আছে, কিন্তু আমি যাকে দিয়ে করাবো সে জায়গায় গিয়ে বিষয়টা কঠিন হয়ে যাচ্ছে৷ এই জায়গাটাকেই রাজনৈতিক দল হিসেবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করি৷

মুজিববর্ষে ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে আমন্ত্রণ জানানো নিয়ে নানা ধরনের বিতর্ক ও আপত্তি উঠছে৷ একদিকে অসাম্প্রদায়িক চেতনায় মুজিববর্ষ পালনের কথা বলা হচ্ছে, অন্যদিকে নরেন্দ্র মোদী ও তার দল বিজেপির বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িক উসকানি ও সহিংসতার অভিযোগ উঠছে৷ এই বিষয়টি কীভাবে দেখছেন?

আমাদের এটা বুঝতে হবে যে নরেন্দ্র মোদীকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে ভারতের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে৷ ভারতের প্রধানমন্ত্রী আজকে যে কেউ থাকতে পারতেন, তাকেই আমরা আমন্ত্রণ জানাতাম৷ এটা অবশ্যই সত্য, ভারতে নাগরিকত্ব আইন নিয়ে আমরা যে ধরনের সহিংসতা দেখছি বিভিন্ন প্রদেশে, বাংলাদেশের মানুষও তা নিয়ে নিজেদের মতো করে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা প্রকাশ করেছে৷ মুক্তিযুদ্ধের সময় থেকে ভারতের সঙ্গে আমাদের যে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক, যে সহযোগিতা তারা করেছে, সেটার প্রতিই বাংলাদেশ সম্মান জানাচ্ছে৷ বঙ্গবন্ধুর সাথেও ভারতের যে সম্পর্ক ছিল, সেটিকেই আমরা বড় করে দেখছি৷ আমার মনে হয় একটি দেশের সাথে আরেকটি দেশের সম্পর্ককে আমরা এখানে বড় করে দেখছি৷

একজন ব্যক্তিবিশেষকে নিয়ে কথা হতেই পারে৷ আমাদের দেশের মেজরিটি মানুষ ইসলাম ধর্মের অনুসারী এবং সেখানে যে ধরনের সহিংসতা হচ্ছে তাতে মুসলিম কমিউনিটির ওপরেই বেশি আঘাত এসেছে৷ ফলে এ নিয়ে ধর্মীয় সংগঠনগুলো তাদের মতামত দিয়েছে, সাধারণ মানুষও তাদের কথা বলেছেন৷ কিন্তু এটাকে ছাপিয়ে যে কথাটা সত্য সেটা হচ্ছে, আমাদের সাথে ভারতের যে সম্পর্ক সেটাকে ভুললে চলবে না৷

অনেকেই বলেন, মধ্যবিত্ত মুসলিম পরিবার থেকে এলেও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান বাঙালির সাংস্কৃতিক পরিচিতিকে (ভাষা ও ঐতিহ্য) বড় করে দেখেছেন৷ ‘বাঙালি’ শব্দটিই ছিল জাতীয়তাবাদের একটি অসাম্প্রদায়িক পরিচয়৷ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি তারিক আলী বলেন, ‘‘বঙ্গবন্ধুর যে বিষয়টি আমাকে অনুপ্রাণিত করে তা হলো, কেমন করে মুসলিম লীগের ছাত্রনেতা থেকে তিনি বাঙালির মুক্তি আন্দোলনের নেতা বনে গেলেন৷’’-ডয়চে ভেলে।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.