নির্বাচনে জেতার গল্প


২০১০ সালে আমি একটা সিরিয়াস নির্বাচনে দাড়ালাম।ব্যাপারটা শুরু হয় হাসি ঠাট্টা দিয়ে। শুভ্র ভাই (অধিকারের প্রধান আদিলুর রহমান খান) আমাকে বললেন: দাড়ায় যাও নির্বাচনে। বললাম, পাগল আপনি! আরে দাড়াও না, মজা দেখবা।
মজা দেখার জন্য দাড়ালাম। বদিউল আলম মজুমদার ভাইও উৎসাহ দিলেন। নির্বাচনটা ছিল সাউদ এশিয়ানস ফর হিউম্যান রাইটস (সাহার)-এর। দক্ষিন এশিয়া ভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা হচ্ছেন আই. কে গুজরাল, আসমা জিলানী আর ড. কামাল ধরনের মানুষজন।
এর বুর‌্যে মেম্বার পদে কয়েকজন নতুন সদস্য নির্বাচিত হবেন, দাড়ালো প্রায় তিরিশ জন। তাদের অনেকে উপমহাদেশের মানবাধিকার আন্দোলনের নামকড়া ব্যক্তি।
বাংলাদেশে থেকে যারা দাড়ালো তারাও হোমরা চোমড়া ধরনের। খুশী কবীর, শীপা হাফিজ, শারমিন মুর্শিদ। তাদের পক্ষে প্রচারনায় নামলো বাংলাদেশের আরো জাদরেল কিছু মানুষ। আমার চোখের সামনে দিয়ে তার অন্যদের জন্য ভোটারদের বলেন, আমার দিকে চোখ পড়লে শুধু শুস্ক হাসি হাসেন।
আমাকে প্রায় কেউ চিনেনা সাহার-্এর তখন। মাত্র মাসখানেক আগে তাদের সাধারন সদস্য হয়েছিলাম। বাংলাদেশের কারো কারো মনোভাব দেখে তাই মনে হলো নির্বাচনে দাড়িয়ে আমি যেন একটা স্পর্ধার কাজ করে ফেলেছি। তাদের এই মনোভাবের জন্য মজা করার নির্বাচনকে সিরিয়াসলি নিয়ে নেই।
নির্বাচনের প্রজেকশন মিটিং এ সবাই নিজের কথা বললেন। আমি শুধু বললাম মানবাধিকার আন্দোলনে কিছু গবেষনা তো প্রয়োজন হয়। আমাকে ভোট দাও, আমি সেটা করে দিতে পারবো। কি প্রতিক্রিয়া হলো বুঝতে পারলাম না। পেছনের সীটে দেখি শুভ্র ভাই হাসছেন আমার দিকে তাকিয়ে। মনে হলো মজাটা আসলে উনি করছেন, আমি না।
ভোটের একটু আগে দেখি এলিট প্রাথীরা গোল হয়ে বসে গল্প করছেন। আমি গেলাম সাধারন ভোটারদের কাছে। নির্বাচনটা নেপালে হচ্ছে বলে স্থানীয় ভোটার অনেক বেশী। তাদের অনেকে আমার মতো সাদামাটা মানুষ। তাদের সাথে চুটিয়ে গল্প করলাম। পরে বললাম ফ্রেন্ড, আমি তো তোমাদের মতো একজন। আমাকে ভোট দিও। তাদের দুএকজন আমার পিঠ চাপড়ে ফাটিয়ে ফেললো প্রায়।
ভোটের পর এর-তার সাথে দুনিয়ার সব আড্ডা দিয়ে ক্লান্ত হয়ে গেলাম। সন্ধ্যায় ব্যাপক পানাহারের ডিনার। আমাকে দেখে বাংলাদেশের একজন বিখ্যাত বললেন: এতো দেরী কেন? বললাম ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। তার বিশ্বাস হলো না। বললেন নির্বাচনে হারা জিতা তো আছে। মনে খারাপ করোনা। আমি বললাম: আপনি কিভাবে জানলেন আমি হারবো! তিনি অবাক হলেন আমার কথা শুনে।
তুমুল খাওয়া দাওয়া চলছে। একসময় শুনি বিজয়ীদের নাম ঘোষনা করা হচ্ছে। একটার পর একটা নাম, একফাঁকে খুশী কবীরের নাম শুনে বাংলাদেশী শিবিরে আনন্দের বন্যা বয়ে গেল। নিজে প্রাথী বলে আমি অবশ্য খুব বেশী খুশী হতে পারলাম না। নাম পড়া প্রায় শেষ, টেনশনে গলা শুকিয়ে গেছে আমার। হঠাৎ শুনি অলৌকিক কণ্ঠে ঘোষনা হলো আরেক বিজয়ীর নাম। আসিফ নজরুল! সবাই দেখি হাততালিও দিচ্ছে।
আমি বীরদপে স্টেজে যাওয়ার জন্য উঠে দাড়ালাম। শুভ্র ভাই পন্ডিতের মতো বললো, বলছিলাম না, জিতবা!
যাই হোক সাহারের হয়ে বহু গুরুত্বপূর্ন অভিজ্ঞতা হয়েছে। মালদ্বীপে ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশনে গেছি, শ্রীলংকায় মাঠ পযায়ে তদন্ত করেছি, নেপাল সেমিনারের জন্য বাংলাদেশে একজনের লেখা এডিট করতে গিয়ে পুরোটা নিজে লিখেছি, আফগানিস্তানে সশস্র সৈন্যদের নিয়ে কাবুল ঘুরেছি, পাকিস্তানে ভিসা ছাড়া প্লেনে উঠে করাচীতে গিয়ে ভিসা নিয়েছি। অমূল্য সব অভিজ্ঞতা। কিন্তু সবচেয়ে মজার ছিল নির্বাচনে জেতার অভিজ্ঞতাই।
সাহারের ইতিহাসে সেটা ছিল ভোটারের উপস্থিতিতে একমাত্র সরাসরি ভোটে নির্বাচন। আমাদের পরে ভোট হয় ইমেইলে। বাংলাদেশ থেকে নির্বাচিত হন সুলতানা কামাল ও সারা হোসেন।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

error: Content is protected !!