নিউইয়র্কে জাহানারা ইমামের মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আলোচনা

২৬শে জুন শহীদ জননী জাহানারা ইমামের মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে একাত্তরের ঘাতক দালাল কমিটি, নিউইয়র্ক, ২৭শে জুন, শনিবার বিকাল ৪ টায় নিউইয়র্ক চ্যাপ্টার জুম -এর মাধ্যমে এক আলোচনা সভার আয়োজন করেছে। সংগঠনের উপদেষ্টা মণ্ডলী ও কার্যকরী পরিষদের সকল নেতৃবৃন্দকে এই আলোচনা সভায় অংশগ্রহণের জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ জানানো হচ্ছে।

জাহানারা ইমামঃ যার শৈশবকালে মুসলিম পরিবারের মেয়েদের নিকট আধুনিক শিক্ষালাভের দ্বার ছিল সম্পূর্ণ বন্ধ। সেই তিনি বাবার তত্তবাবধানে আধুনিক শিক্ষা লাভ করেন। তিনিই হলেন  শহীদ জননী জাহানারা ইমামঃ

অবিভক্ত বাংলার মুর্শিদাবাদ জেলার সুন্দরপুর গ্রামের এক রক্ষণশীল পরিবারে ১৯২৯ সালের ৩ মে জাহানারা ইমাম জন্মগ্রহণ করেন। ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট পিতা আবদুল আলীর তত্ত্বাবধানে রক্ষণশীলতার বাইরে এসে আধুনিক শিক্ষা লাভ করেছিলেন তিনি।  বিবাহিত জীবনে লেখাপড়ায় তিনি পুরকৌশলী স্বামী শরীফ ইমামের দিক থেকেও উৎসাহ ও আনুকূল্য পেয়েছিলেন।

ষাট ও সত্তর দশকে সাহিত্যজগতে জাহানারা ইমাম অল্প-বিস্তর পরিচিত ছিলেন শিশুকিশোর উপযোগী রচনার জন্য। তাঁর সর্বাধিক খ্যাতির কারণ দিনপঞ্জিরূপে লেখা তাঁর অনবদ্য গ্রন্থ একাত্তরের দিনগুলি। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকালে তিনি পুত্র রুমী ও স্বামীকে হারান। মুক্তিযুদ্ধের দীর্ঘ নয় মাস কেটেছে তাঁর একদিকে উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা ও ত্রাসের মধ্য দিয়ে; অন্যদিকে মনের মধ্যে ছিল দেশপ্রেম ও স্বাধীনতার স্বপ্ন। সেই দুঃসহ দিনগুলিতে প্রাত্যহিক ঘটনা এবং মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কাজ করার বৃত্তান্ত লিখেছিলেন তিনি নানা চিরকুটে, ছিন্ন পাতায়, গোপন ভঙ্গি ও সংকেতে।

কিন্তু সেই চিরকুট সংকেতগুলো ১৯৮৬ সালে গ্রন্থরূপ পাওয়ার পর তা জনমনে বিপুল সাড়া জাগায়। বস্তুত বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক একটি শিহরণমূলক ও মর্মস্পর্শী ঘটনাবৃত্তান্ত হলো একাত্তরের দিনগুলি।

স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে জাহানারা ইমাম লেখালেখিতে ব্যস্ত সময় কাটান এবং তাঁর প্রধান গ্রন্থগুলি এ সময়ে প্রকাশ পায়। একাত্তরের দিনগুলি ছাড়া গল্পঙ্গনেন্যাস হিসেবে তার অনেক লেখনি সৃষ্টি রয়েছে। রাজনীতিবিদ না হলেও তার রাজনীতেসচতনতাই তাকে পরবর্তিতে রাজনীতির অঙ্গনে টেনে আনে।

একাত্তরে তাঁর পুত্র রুমী দেশের মুক্তিসংগ্রামে অংশগ্রহণ করেন এবং কয়েকটি সফল গেরিলা অপারেশনের পর পাকিস্তানি মিলিটারির হাতে নিহত হন। বিজয় লাভের পর রুমীর বন্ধুরা রুমীর মা জাহানারা ইমামকে সকল মুক্তিযোদ্ধার মা হিসেবে বরণ করে নেন। তখন থেকেই তিনি ‘শহীদ জননী’র মর্যাদায় ভূষিত।

শহীদ জননী হিসেবে খ্যাত জাহানারা, ১৯৯২ সালে  মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন ও ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটির আহবায়করূপে তিনি ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেন। 

মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সকল বরেণ্য  ব্যক্তিদের সক্রিয় সমর্থনে জাহানারা ইমাম ১৯৭১-এর স্বাধীনতাবিরোধী চক্রের বিরুদ্ধে গণ-আদালত গড়ে তোলেন। গণ-আদালত ছিল স্বাধীনতাবিরোধী চক্রের অপকর্মের বিরুদ্ধে একটি প্রতীকী প্রতিবাদ।

১৯৮১-র দিকে জাহানারা ইমাম মুখের ক্যান্সারে আক্রান্ত হন; রোগ উত্তরোত্তর বাড়তে থাকে, কথা বলাও দুঃসাধ্য হয়ে পড়ে। ১৯৯৪ সালের ২৬ জুন, মিশিগান স্টেটের ডেট্রয়েটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর জীবনাবসান ঘটে। 

                                                            রওশন চৌধুরী

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

error: Content is protected !!