নারী! তুমি শুধু শস্যক্ষেত্র!!

“তোমাদের স্ত্রীগণ তোমাদের শস্যক্ষেত্র”

-আল কোরআন

পুষ্পা, সাকিব, মাহদী ও নুসরা। ওরা চারজন বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসমেটের পাশাপাশি বন্ধু ও। শুধু বন্ধু বললে ভুল হবে বরং বলতে হবে জানে জিগর বন্ধু। সবাই সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী।

পুষ্পা ধনি পিতার একমাত্র মেয়ে। পড়াশোনার পাশাপাশি জাতিকে ক্রান্তিময় সামাজিক অবস্থা থেকে উদ্ধার করার লক্ষ্যে বিভিন্ন রাজনৈতিক কার্যক্রমে জড়িত। নারী নেত্রী হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে প্রসিদ্ধ। ধর্মকর্মের ধার ধারে না। তার নিকট ধর্ম হল- “কিছু অন্ধ মানুষের তৈরিকৃত জঞ্জাল”। সবচেয়ে অপছন্দ হল ইসলাম। কারণ এ ধর্ম নারীদের করেছে চরম অপমান।

সাকিব, বেচারা নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে। মাঝেমধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হলে বাড়িতে গিয়ে কাজও করতে হয় অর্থের অভাব পূরণের জন্য। বড় স্বপ্ন দেখলেও বাস্তবতা ভেবে ভয় পায়। বই পড়তে পছন্দ করে। গ্রামের ধর্মপ্রাণ পরিবারে জন্ম হওয়ায় ধর্ম একটু আধটু পালন করে। তুলনামূলক অর্থবিত্ত কম হলেও অসাধারণ ব্যক্তিত্বের অধিকারী। এ জন্য পুষ্পা সাকিবকে মন থেকে পছন্দ করে তবে সাকিবের প্রতি পুষ্পার সদা অনুরোধ হল- “প্লিজ ধর্মের জালে আবদ্ধ হইস না”। কিন্তু সাকিব বুঝেও না বুঝার ভান করে। সাকিবের আরেকটি গুণ হল- তার কন্ঠ খুব শ্রুতিমধুর। সুরের মোহনায় ভাসিয়ে কঠিন হৃদয়কেও হাবুডুবু খাওয়াতে জানে।

মাহদী আর নুসরা পড়াশোনার বাইরে শুধু ভালবাসা বুঝে। উভয়েই উচ্চ মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান। ধর্মের বিরুদ্ধে বা পক্ষে কোন দিকেই নয়। এ দু’জনের মধ্যে মন বিনিময় হয়ে গেছে। দু’জন একে অপরকে ছাড়া বাঁচেনা! মাহদী প্রয়োজনে অন্যসব বন্ধু বান্ধব ছেড়ে দেবে তবু নুসরাকে চাই। নুসরার একই অবস্থা। সাকিবের এটা মেনে নিতে কষ্ট হচ্ছিল। কারণ সাকিব মাহদীকে খুব ভালবাসে। তবে মাহদীর একদিনের ধমকে সাকিব মাহদীর ঐ ব্যাপারে একদম নাক গলানো ছেড়ে দিয়েছে।

ক্লাস না থাকলে ওরা চারজন ডিপার্টমেন্টের সামনের পুকুর পারে বসে গল্প করে, আড্ডা দেয়। আজ ডিপার্টমেন্টে একটি প্রোগ্রাম থাকায় আর ক্লাস হবে না। পুষ্পা, মাহদী ও নুসরা এসে বসল পুকুর পারে সিমেন্ট আর বালুর তৈরি লাল চেয়ারে।

পুষ্পা : কিরে কপোত কপোতী, কেমন আছিস?

নুসরা : (একটুখানি হেসে) আজ প্রথম ক্লাস করেই পিঠ ব্যথা হয়ে গেছে। আজ আর ক্লাস না হওয়ায় ভালই হল। মাহদীও নুসরার কথায় সায় দিল।

পুষ্পা : হুম। আচ্ছা! দু’দিন ধরে সাকিব ক্লাসে আসছে না। ফোনও বন্ধ। কিছু জানিস?

নুসরা : আমিও তাই ভাবছিলাম।

মাহদী : (মুখ ভেংচি করে) উনি বংশগত হুজুর মানুষ। শুনেছি সৌদিআরবের কিং সাউদ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুর রহমান আল-আরেফী ও জিম্বাবুয়ের প্রধান মুফতি শাইখ ইসমাঈল মূসা মেংক নামক দুজন ইসলামি চিন্তাবিদ দু’দিন ধরে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে ইসলামের বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা করছেন ও সরাসরি প্রশ্নোত্তর প্রদান করছে। আমাদের সাকিব সাহেব ওখানে গিয়েছেন।

পুষ্পা : সাকিব ছেলেটার সব ভাল লাগে। কিন্তু এ জিনিসটা আমি কোনো ভাবেই মানতে পারি না। ওর মত স্মার্ট একটা ছেলে এরকম ফালতু ধর্মকর্মের পেছনে ছুটে কীভাবে? যত্তোসব!!!

নুসরা : (পুষ্পাকে উদ্দেশ্য করে) মজে গেছ বুঝি প্রেম দরিয়ায়?

পুষ্পা : মজে লাভ নেই। এক হাতে কী আর তালি বাজানো যায়…

মাহদী : ঐ দেখ! সাকিব আসছে….

পুকুরপার দিয়ে ধীর গতিতে সাকিব এদিকে এগিয়ে আসছে। গায়ে নীল বর্ণের পাঞ্জাবী। পুষ্পা মনে মনে ভাবে- ছেলেটাকে কতই না সুন্দর লাগছে। কি ব্যক্তিত্ব মাইরি কিন্তু কেন যে এই গোঁড়ামি করে। সাকিব ততক্ষণে কাছে চলে এসেছে। এক হাতে একটি বই আর অপর হাতে গোলাপের একটি ডাল। দু’দিকে ঘুরাচ্ছে আর গুনগুনিয়ে কী জানি পড়ছে। শব্দ গুলো ছিল এরকম : নিসা উকুম হারসুল লাকুম, ফা তু হারসাকুম আন্না শি তুম…..

পুষ্পা : কিরে হারানো মানিক, কই হারিয়ে গেছিলি? আর গোলাপ তোর হাতে! ঘটনা কী?

মাহদী : সম্বোধনের কি ভাষা মাইরি…. সা.কা চৌধুরী এটা শুনলে তাঁর নিজস্ব ভাষায় কিছু একটা বলতেন।

সাকিব : হুম। আমারে হাবাগোবা পাইয়া সবাই মজা নেয়।

পুষ্পা : (মাহদীকে ধমক দিয়ে) এই চুপ কর। সাকিব কই ছিলি, মোবাইলও অফ কেন?

সাকিব : একটা সেমিনারে গেছিলাম। মোবাইল ‘চুর মামা’ নিয়ে গেছেন। সেমিনারে থাকায় নতুন ফোন বা সিম পুনঃউত্তোলন হয়নি। এটা একটা বই আর গোলাপ সেমিনার থেকে গিফট দিয়েছে ইসলাম প্র্যাকটিস করার দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করেছি বলে।

পুষ্পা : দোস্ত! অনেক দিন হল তুই গান শোনাস না, আজ একটা শোনা না?

সাকিব : অনেকদিন হল গান গাই না। গান ভুলে গেছি। একটাও পারি না।

পুষ্পা : এইমাত্র না তুই গান গাইলি আসতে আসতে! নিসা উকুম হারসুল লাকুম…… এটা কি তামিল গান?

সাকিব : পাগলী! এটা গান না। এটা কুরআনের একটি বাক্য। জীবনে পড়ছনি জানবি কেমনে?

পুষ্পা : তাহলে ওটাই একটু শোনা। আমি তোর কন্ঠ শোনবো। কী শোনাবি সেটা তোর ব্যাপার।

সাকিব হৃদয়ের আবেগ মাখানো সূর দিয়ে “নিসা উকুম ….” আয়াতের শেষ পর্যন্ত পড়লো।

নুসরা : তুই এখন যা পড়লি এর তো নিশ্চয়ই নিজস্ব অর্থ আছে। এবার সেটা একটু বলতো। ভালই লাগছিল শুনতে।

সাকিব : অবশ্যই অর্থ আছে। “তোমাদের স্ত্রীগণ তোমাদের শস্যক্ষেত্র। সুতরাং তোমরা তোমাদের শস্যক্ষেত্রে যেভাবে ইচ্ছা সেভাবে গমন কর এবং ভবিষ্যতে নিজেদের জন্য উত্তম ব্যবস্থা গ্রহণ কর। এবং আল্লাহকে ভয় কর। এবং জেনে রাখ তাঁর সাথে তোমাদের সাক্ষাত হবেই। সুসংবাদ বিশ্বাসীদের জন্য।” (গাভী অধ্যায়, বাক্য নং ২২৩)

পুষ্পা : কি বললি? যা বলছিস সবই কি তোর কুরআনে আছে? নাকি বানিয়ে বললি?

সাকিব : বানিয়ে বলব কেন? এইমাত্র এটার উপর আলোচনা শুনে এসেছি।

পুষ্পা : গোষ্ঠি কিলাই তোর আলোচনার। কোন ধরনের অথর্ব অনর্থক ধর্ম হলে এ রকম ফালতু কথা বলতে পারে? ইসলামের ব্যাপারে দুই এক ছিপি সম্মান যা ছিল আজ থেকে তাও চলে গেল। একই জাতিগোষ্ঠির সদস্যদেরকে বলে এরা নাকি শস্যক্ষেত্র। তোদের আবাল ধর্মে নারীরা বুঝি একমাত্র ভোগের পণ্য ই?

একনাগাড়ে অনেকক্ষণ কথা বলে পুষ্পা থামল। ফর্সা মুখের পুরোটাই রক্তলাল হয়ে গেছে। হবেই না বা কেন? সাকিবের কুরআনের বাক্যটি যে পুষ্পার নারীত্বের সম্মানে আঘাত করেছে।

সাকিব পুষ্পার কথাগুলো শোনে মৃদু হাসল। সাকিবের হাসি দেখে পুষ্পার রাগ যেন বেড়েই চলল। গজগজ করতে করতে সাকিবকে বলল কেন যে এই গোঁড়ামির মধ্যে এখনো আটকে আছিস? এগুলো হল তোদের ধর্মগুরুদের বানানো। যাতে ধর্মান্ধ মানবী গুলোকে আচ্ছামত উপভোগ করতে পারে।

সাকিব : একটু ফ্লোর পেলে আমি কিছু একটা বলতে পারতাম। সাকিব পুকুরের পানির দিকে তাকিয়ে আছে। তার কথা শোনে পুষ্পা বলল- কি আর সাফাই গাইবি? ওকে! কি বলবি বল!

সাকিব : আমি কুরআনের যে বাক্যটি পাঠ করেছি এর পূর্বের বাক্যে বলা হয়েছে “ঋতুস্রাব অবস্থায় স্ত্রী সহবাস করো না; ঋতুস্রাব শেষ হলে পবিত্র হওয়ার পর সম্মুখ পথে সহবাস কর, পশ্চাৎপথে না”। তোমরা মানো আর না মানো কুরআন হল স্রষ্টার আদেশনামা। এখানে দুটি আদেশ দেয়া হয়েছে। একটি হল ঋতুস্রাব অবস্থায় সহবাস না করা, আর আরেকটি হল পবিত্র হওয়ার পরও শুধুমাত্র সম্মুখ পথে সহবাস করা।

এরপর বলছেন তোমাদের নারীরা তোমাদের শস্যক্ষেত্র। ইচ্ছা অনুযায়ী আসতে পারো তবে অবশ্যই সামনের পথে। উদ্দেশ্য হবে ভবিষ্যতের পাথেয় সংগ্রহ করা, অর্থাৎ বংশধর তৈরি করা যা বৃদ্ধ কালের অবলম্বন হবে। আবার বাক্যের শেষাংশে বলা হয়েছে আল্লাহকে ভয় কর (স্ত্রীদের সাথে আচরণে)। অন্যায় কিছু করলে পরকালে শাস্তি পেতে হবে।

যেরকম ইচ্ছা সেরকম ব্যবহার করা যদি যেত তবে পূর্বের বাক্যে দু’টি নিষেধ থাকতো না। পরে ভীতি প্রদর্শন থাকতো না। তার মানে বুঝা গেল শস্যক্ষেত্রের সাথে তুলনার কোনো স্পেশাল রিজন বা কারণ আছে। কুরআন হল সংবিধান। এখানে সবকিছু তোর আমার কথার মত করে ব্যাখ্যা করা থাকবে না। নিজের বুদ্ধি দিয়ে বুঝে নিতে হবে। স্রষ্টা বুদ্ধি দিয়েছেন সঠিক বিষয় বুঝার জন্য। তারপরও না বুঝলে চতুষ্পদ পশুর চেয়েও অধম হতে হবে।

সাকিব অনেকক্ষণ কথা বলে থামল। মাহদীর হাত থেকে পানির বোতল নিয়ে পানি পান করল।

পুষ্পা : আচ্ছা! বুঝলাম। কিন্তু শস্যক্ষেত্রের সাথে তুলনা দেয়ার কারণ কি? এতে কি নারীদের সম্মানহানি হল না? পুষ্পার কন্ঠ একটু নরম হয়েছে এবার। কুরআনে নারী নির্যাতেনর ব্যাপারে এতবড় ধমকি সে আশা করেনি।

সাকিব : (“ইহ হা হু” গলাটা পরিস্কার করে) আমরা সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী। আমাদের যদি আরবী গ্রামার বা বালাগাত মানতিকের কোনো উদাহরণ হঠাৎ করে দেয়া হয় তবে কি আমরা বুঝব?

মাহদী : বালাগাত মানতিক কী ভাই?

সাকিব : দেখ! তোরা বালাগাত মানতিক বিষয়টি ই বুঝতে পারিস নাই। উদাহরণ বুঝবে তো দূরের কথা। বালাগাত হল আরবী ভাষার অলংকার শাস্ত্র আর মানতিক হল যুক্তিবিদ্যা সংক্রান্ত একটি বিষয়। এমনিভাবে যদি মোবাইলের কোন অংশ দিয়ে যদি আমাদের উদাহরণ দেয়া হয়, তবে আমরা মোবাইলের ছাত্র না হলেও সহযে বুঝে ফেলব। কারণ আমরা মোবাইল ব্যবহারে অভ্যস্ত।

ঠিক তেমনি স্রষ্টা যখন আরববাসীর নিকট মহিলা সংক্রান্ত আদেশ পাঠালেন তখন আরববাসী বিশ্বের মধ্যে তুলনা মূলক বেশি মূর্খ ছিল। এদেরকে বুঝানোর জন্য সহজ উদাহরণ ছিল তাদের ব্যবহৃত কোনো বস্তু। আরববাসীর নিকট সবচেয়ে প্রিয় ব্যবহৃত বস্তু ছিল শস্যক্ষেত্র। সুতরাং তাদেরকে সহজে বুঝানোর জন্য স্রষ্টা শস্যক্ষেত্রের উদাহরণ দিয়েছেন।

আরেকটি যুক্তি শোন (এটি ডাঃ শামছুল আরেফিন ভাইয়ের নিকট থেকে সংগৃহীত) – পুষ্পা, মাহদী, নুসরা, আমি খুব গরীব ঘরের ছেলে। এতদিন বাস্তবতা ভেবে তোদের বলিনি। কারণ তোরা ধনীর দুলাল দুলালী। আমি গরীবের সাথে তোরা মিশবি না। কিন্তু আমি যে তোদের বন্ধু হিসেবে খুব ভালবাসি। স্কুল থেকে আমরা একসাথে আছি। তোদের ছাড়া থাকা কষ্টকর হবে ভেবে সত্যটা তোদের বলিনি। আমি বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হলে বাড়ি গিয়ে বাবার সাথে কাজ করি। আমার বাবা একজন কৃষক। আমাদের কয়েক কেদার ফসলি জমি আছে। এ ফসলী জমির আয় দিয়েই আমাদের খরচ সরবরাহ হয়। আমাদের নিকট এ জমির মূল্য খুবই বেশী।

একজন বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র বা শিল্পপতির নিকট এক টুকরো জমি শুধুই প্রপার্টি। কিন্তু একজন কৃষকের নিকট এটা হল বেঁচে থাকার সম্বল। “তোমাদের নারী তোমাদের শস্যক্ষেত্র” এটি বুঝতে হলে তোকে বুঝতে হবে একজন কৃষেকর কাছে তার জমিটুকুর মূল্যায়ন কতটুকু।

শস্যক্ষেত্রের সাথে তুলনা করে আল্লাহ স্ত্রীর মর্যাদা আর অধিকারকে কীভাবে বুঝিয়েছেন শোন তাহলে।

প্রথমত, ক্ষেতের ফসল চাষীর ভবিষ্যতের পাথেয়।
ঠিক তেমনই স্ত্রীর গর্ভজাত সন্তান পুরুষের বৃদ্ধ বয়সের অবলম্বন।

দ্বিতীয়ত, চাষী শস্যক্ষেত্রের যত্ন নেয়, বীজ বোনে, নিড়ানি দেয়, সার দেয়, সেঁচ দেয়। ক্ষেতেই তার সারা দিন কাটে। স্ত্রীও তেমনি সারা দিন স্বামীর মনোজগৎ জুড়ে থাকবে। স্বামীও স্ত্রীর যত্ন নেবেন, আর সুযোগ সুবিধা রোগশোক এসবের প্রতি খেয়াল রাখবেন।

তৃতীয়ত, চাষী তার জমি ডিফাইন করে, আইল দেয়- যে ‘এটা আমার জমি’। সেখানে অন্য কারও হস্তক্ষেপ সহ্য করে না। এর জন্য সে সব করতে প্রস্তুত। মামলা মোকদ্দমা থেকে শুরু করে মারপিট সব। জীবন দিতেও তৈরি, জীবন নিতেও তৈরি। স্ত্রীও স্বামীর কাছে এমন রত্ন। যে কোনো মূল্যে সে স্ত্রীকে রক্ষা করবে। অধিকারবোধের কারণে স্ত্রীর বিষয়ে কারো হস্তক্ষেপ তার কাছে অসহ্য হবে। ‘ও শুধুই আমার’ এই অনুভূতি কাজ করবে স্ত্রীর প্রতি।

ফাইনালি, জমিটুকু চাষীর সম্বল। ওটাই তার দুনিয়া। পরম নির্ভরতা ও আবেগের জায়গা। তার কাছে ঐ জমিটুকুই তার সবকিছু। চাষীর চব্বিশ ঘণ্টার সব সাধ্য সাধনা স্বপ্ন বেদনা তাঁর জমিটুকু ঘিরে। সব ভাবনা চিন্তা কল্পনা তার জমির জন্য। স্বামীর কাছে স্ত্রীর মর্যাদা ও এমন। স্ত্রী তার স্বামীর গর্বের ধন, তার আশ্রয় সম্বল, স্ত্রী স্বামীর কাছে তার দুনিয়া, তার সবকিছু। তার নির্ভরতা, তার কল্পনা ভাবনা পরিশ্রমের কেন্দ্র।

সাকিব এবার থামল। জমির আলোচনা করতে গিয়ে তার নিজেদের জমির কথা মনে পড়ল। এবার বন্যার কারণে ফসল হয়নি। বাবা মা বাড়িতে খুব কষ্টে দিনাতিপাত করছেন। এগুলো ভেবে সাকিবের চোখে জল চলে আসল। সাকিবের চোখের জল যেন সবাইকেই ছূয়ে গেল।

নিজেকে সামলে নিয়ে সাকিব বলল- রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্প ‘হৈমন্তী’ এর সবচেয়ে জোশ লাইন কোনটা ছিল কে বলতে পারবে?

মাহদী : ‘সে আমার সম্পত্তি নয়, সে আমার সম্পদ’ এটা?

সাকিব : তোর দেখছি স্মৃতিশক্তি ভালই আছে। হুম এটাই। বন্ধুরা রবীন্দ্রনাথ বললে ঠিক আছে, সেটা হয় সাহিত্যের চরম উৎকর্ষ। একই জিনিস আল্লাহ শস্যক্ষেত্রের উপমা দিয়ে বুঝাতে চাচ্ছেন। এখন এত প্রশ্ন? এই আমাদের বিবেক?

একটু দম নিয়ে সাকিব মাহদির কাঁধে হাত রেখে আবার বলা শুরু করল- কুরঅান এখনো নতুন, চির নতুন। ইসলাম তখনো নারীদের অধিকার নিয়ে বলেছে এখনো বলছে। যেটুকু অধিকার পেলে নারীরা সত্ত্বাগত ভাবে ভালো থাকবে। নারীর নারীত্ব ভালো থাকবে। ইসলাম নারীদের অপমান করেনি। বরং বর্ববরতার যুগে নারীকে দিয়েছে নতুন করে সম্মান।

ইসলামের ডেফিনেশনের বাইরে যদি কেউ অধিকার দিতে চায় সেটা অধিকার নয়। সেটা ফাঁদ, যে ফাঁদে আটকে ছটফট করবে নারীর নারীত্ব। যে নারীত্বের ওপর নির্ভর করে পুরোটা সমাজ, পুরোটা ভবিষ্যৎ।

কবিগুরু রবিন্দ্রনাথ বলেছিলেন-
“প্রেমের ফাঁদ পাতা এ ভূবনে,
কখন কে ধরা পরে কে জানে?”

ইসলাম এখনো আধুনিক আছে। যতকাল পৃথিবী থাকবে ততকাল ইসলাম আধুনিকই থাকবে। শুধু চোখ থেকে ঔপনিবেশিক মনিবদের চশমাটা সরাতে হবে। একরোখা না হয়ে ডান বাম বুঝতে হবে।

পুষ্পা নীরব। অনেকক্ষণ নীরবতায় দেখে নুসরা পুষ্পার মুখ উপরে তুলে ধরল। লোনা জলে ভিজে যাচ্ছে পুষ্পার গাল। সাকিবের আর্থিক অভাবের ব্যথায় সে ব্যতীত। মনে মনে যে সে ভালবাসে ছেলেটাকে। চোখে ভাবান্তরের দৃষ্টি। এ দৃষ্টি যেন পুষ্পাকে ডেকে বলছে- “হে পুষ্পা! একচোখে দেখ কেন? নিরপেক্ষ দৃষ্টিকোণ থেকে সাকিবের কথাগুলো ভেবে দেখবে কি? “

এতক্ষণে পুষ্পার মুখ খুলল, সাকিব! অর্থের জন্য এ সম্পর্ক ভাংবে নারে। পুষ্পা ফুফাচ্ছে। আমার কথায় কষ্ট পাস না। আর ইসলামে নারী অধিকার নিয়ে যে কথাগুলো আছে সেগুলো আমাকে দিস কাইন্ডলি। আমি তো জানতাম না ইসলামে নারীর অধিকারের কথা এভাবে বলা আছে।

সাকিব এখনো পুকুরের পানির দিকে তাকিয়ে আছে।পুকুরের পানির সৌন্দর্যের মধ্যে যেন হারিয়ে গিয়েছে।আরেকটি সৌন্দর্য সাকিব দেখেনি, দেখবে কি না কখনো সেটা অজানা। কপাল থেকে নারীবাদী ইউনিফর্ম বড় টিপটা খুলে মাথায় ওড়না দিয়েছে পুষ্পা ওড়না দিলে পুষ্পা কে অনেক সুন্দর লাগে। অন্য দিকে নুসরার ওড়না রূপ নিয়েছে হিজাবে।

মাহদী সাকিবকে জড়িয়ে ধরল। ভেঙ্গে গেল এতক্ষণের বাঁধ। স্রোত হল বহমান। এ স্রোত “অমূল্য রতন কাছে পেয়েও পায়ে ঠেলার কারণে”। স্রোত যেন মাহদিকে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে সিরাতে মুস্তাকিমের দিকে। নদীর স্রোত তো এর চেয়ে বেশী, কিন্তু এর থেকে কি গভীর? না মনে হয়।

সাকিবের হাতে থাকা বইটির নাম “ইন দ্যা ইউনিভার্সিটি ক্যান্টীন” লেখক হচ্ছেন ড. আরেফী।

সাকিব মাথা নীচু রেখে হাতের বইটি পুষ্পার দিকে এগিয়ে ধরে বলল- এই বইয়ে নারী সম্পর্কে আরো অনেক কিছু বলা আছে। পড়ে নিছ।

আর হ্যাঁ! ফ্রি মিক্সিং এর ব্যাপারে ইসলামে নিষেধ আছে। আছে নির্ধারিত সীমারেখা টানা। এগুলো আগে জানতাম নাহ। সুতরাং তোমাদের সাথে আমি আগের মত চলতে পারবো না। একটা ডিসটেন্স মেইন্টেইন করতে হবে।

মাহদি : আচ্ছা! তাই নাকি? এ ব্যাপারে একটু ক্লিয়ার করে জানতে হবে তোর নিকট থেকে। কাল আসবি ক্যাম্পাসে?

সাকিব : না। কালও ড. আরেফী আর মুফতি ম্যান্ক আলোচনা করবেন। আমি সেখানে যাবো। মাহদি সাকিবের মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বলল- তাহলে আমাকে নিয়ে যাবি।
সাকিব : আচ্ছা। সকালে তৈরি থাকবি।

ততক্ষণে সূর্য হলুদ বর্ণের রশ্মি ছড়িয়ে পশ্চিম দিকে হেলে পড়েছে। সবাই পেটে দুপুরের খাবার গ্রহণের ইঙ্গিত পাচ্ছে। সাকিব বলল- চল! আজকের মত উঠি। সবাই ফিরে চলল আপন নীরে….

কাল্পনিক এ গল্পের কল্পনা গুলো বাস্তবতার সাথে অমিল নয়। এরকম শতশত সাকিব মাহদী পুষ্পা নুসরা আমাদের সমাজে ছড়িয়ে আছে। মহান প্রভু যেন সবাইকে সরল পথের সন্ধান দেন। গল্পের ধর্ম ভীরু সাকিবের মত শতশত সাকিবের মাধ্যমে সমাজে আসুক পরিবর্তন। সবাই চলুক প্রভুর দিকে, প্রভুর দূতের পথে……

লেখক : (মুফতি) ওয়ালিদ আল হামিদী আল মাদানী।
ইসলামি স্কলার।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

error: Content is protected !!