November 29, 2020

মাই পেটারসন. লাইফ

ভয়েস অফ দ্যা কমিউনিটি

নারায়ণগঞ্জে মসজিদে ভয়াবহ বিস্ফোরণ: নিহতের সংখ্যা বেড়ে ১৮

গত রাতে নারায়ণগঞ্জের তল্লা বায়তুস সালাত জামে মসজিদে এসি বিস্ফোরণের ঘটনায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১৮ জনে দাঁড়িয়েছে। মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। শেখ হাসিনা বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের আবাসিক চিকিৎসক ডাক্তার পার্থ শঙ্কর পাল এ তথ্য জানিয়েছেন।
শেখ হাসিনা বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে মোট ৩৭ জন রোগী ভর্তি করা হয়েছিল। বাকি যারা ভর্তি আছেন তাদের অবস্থাও আশঙ্কাজনক বলে জানিয়েছেন শেখ হাসিনা বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের প্রধান সমন্বয়ক ডা. সামন্ত লাল সেন।
মৃতদের মধ্যে ১৪ জনের নাম জানা গেছে। তারা হলে রিফাত (১৮), মোস্তফা কামাল (৩৪), জুবায়ের (১৮), সাব্বির (২১), কুদ্দুস ব্যাপারী (৭২), হুমায়ুন কবির (৭০), ইব্রাহিম (৪৩), মুয়াজ্জিন দেলোয়ার হোসেন (৪৮), জুনায়েদ (১৭), জামাল (৪০), জুবায়ের (৭) ও রাশেদ (৩৪), বাহাউদ্দিন (৫৫) ও রাসেল (৩৪)। বাকি ৪ জনের নাম এখনও জানা যায়নি।

মসজিদে বিস্ফোরণে নিহত ১৭ জনের মধ্যে ১৬ জনের মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। নারায়ণগঞ্জ সদর থানা নির্বাহী কর্মকর্তা নাহিদ বারিক শনিবার বিকাল ৬টায় সাংবাদিকদের বলেন, এখন পর্যন্ত ১৬ জনের মরদেহ হস্তান্তর করা হয়েছে, তাদের ২০ হাজার করে টাকা দেওয়া হয়েছে। এর আগে শাহবাগ থানার উপপরিদর্শক (এসআই) গোলাম হোসেন খান জানান, স্বজনদের আবেদনের প্রেক্ষিতে শনাক্তের পর বিনা ময়নাতদন্তে বিকাল ৫টা পর্যন্ত ১৪ জনের মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। বাকিগুলো প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

৩টি তদন্ত কমিটি গঠন:
এসি বিস্ফোরণের ঘটনায় তিনটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এর মধ্যে ফায়ার সার্ভিস একটি, তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ একটি ও জেলা প্রশাসন একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে।
ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের পরিচালক (অপস) লে. কর্নেল জিল্লুর রহমানকে প্রধান করে এই তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এছাড়া তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে জানা গেছে। পাঁচ সদস্যের কমিটি গঠন করেছে নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসনও।

আহতদের চিকিৎসায় সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর নির্দেশ

শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র (এসি) বিস্ফোরণে আহতদের সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে চিকিৎসা দিতে নির্দেশ দিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক। একই সঙ্গে তিনি রোগীদের সব রকম সুবিধা নিশ্চিত করতেও নির্দেশ দিয়েছেন। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ বিভাগ থেকে এ তথ্য জানানো হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, স্বাস্থ্যমন্ত্রী আহতদের চিকিৎসার খোঁজ-খবর নিয়েছেন এবং এ বিষয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে নির্দেশনা দিয়েছেন।

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের সচিব আবদুল মান্নান বলেছেন, বার্ন ইউনিটের চিকিৎসক, পরিচালক ও উপদেষ্টাদের সঙ্গে আমি বৈঠক করেছি। তাদের বলেছি সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার জন্য। আমাদের চিকিৎসার মধ্যে সর্বোচ্চ দেওয়ার ব্যবস্থা গ্রহণ করেছি। শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) দুপুরে শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে নারায়ণগঞ্জে মসজিদে বিস্ফোরণের ঘটনায় দগ্ধদের দেখতে এসে তিনি এসব কথা বলেন।

তিনি বলেন, আমি নিজে ব্যক্তিগতভাবে প্রত্যেক রোগীকে দেখেছি। তাদের যে অবস্থা আমরা এমনটা বলতে পারবো না যে তারা প্রত্যেকে সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে যাবে। তবে এইটুকু আমরা বলতে পারি আমাদের বাংলাদেশে যতটুকু চিকিৎসা ব্যবস্থা আছে এই উন্নত হাসপাতালে তার সর্বোচ্চ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।

তদন্ত কমিটির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, নারায়ণগঞ্জে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে এবং তারা কাজ করছে। আমরা যতটুকু শুনেছি তারা ঘটনার সূত্রপাত আইডেন্টিফাই করেছে এবং গ্যাস পাইপের লিক কোনও জায়গা থেকে বের হয়েছে তাও জানা গেছে। তদন্ত শেষ হওয়ার পর জানা যাবে কেন এ ঘটনা ঘটেছে। জেলা প্রশাসকের কাছ থেকে শুনেছি তদন্ত অব্যাহত আছে, আশা করি দ্রুতই আপনারা জানতে পারবেন।

স্বজনদের জন্য পুলিশের হটলাইন

এসি বিস্ফোরণের ঘটনায় আহত ও নিহতদের সহায়তায় শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে একটি জরুরি সহায়তা কেন্দ্র খোলা হয়েছে। নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসেনর পক্ষ থেকে এই সহায়তা কেন্দ্র খোলা হয়েছে। স্বজনরা এখান থেকে সব ধরনের তথ্য ও সহযোগিতা পাবেন। এছাড়া নিহতদের মরদেহ হস্তান্তরের বিষয়ে স্বজনদের একটি হটলাইন খুলেছে পুলিশ। শনিবার দুপুরে নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসক জসিম উদ্দিনের পক্ষ থেকে এ তথ্য জানানো হয়। মরদেহ গ্রহণ ও হস্তান্তরের জন্য স্বজনদের এই ০১৭৩২৮৯২১২১ নম্বরে যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে।

খোঁজ রাখছে ধর্ম মন্ত্রণালয়

এসি বিস্ফোরণের ঘটনায় আহত মুসল্লিদের চিকিৎসার বিষয়ে ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয় খোঁজ খবর রাখছে বলে জানিয়েছেন সচিব ড. নুরুল ইসলাম। মর্মান্তিক এই দুর্ঘটনায় মুসুল্লিদের মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করে তিনি। এছাড়া মারা যাওয়া মুসল্লিদের বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন এবং শোক সন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান।

সব ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের বিদ্যুৎ সংযোগ ও এসির অবস্থা পরীক্ষা করার নির্দেশ

মসজিদে এসি বিস্ফোরণের ঘটনায় তিতাস তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। এ কমিটি পাঁচ কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দেবে। পাশাপাশি সব বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানির আওতাধীন এলাকায় মসজিদ-মন্দির ও অন্যান্য ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের বিদ্যুৎ সংযোগ ও এসির অবস্থা পরীক্ষা করার জন্য নির্দেশ দিয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ। এদিকে মসজিদে এসি বিস্ফোরণে হতাহতের ঘটনায় গভীর শোক ও দুঃখ শোক প্রকাশ করেছেন বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ।

নারায়ণগঞ্জের পশ্চিম তল্লা বায়তুস সালাত জামে মসজিদের তিতাস গ্যাসের লিকেজ থেকে ভয়াবহ বিস্ফোরণে এ পর্যন্ত ১৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। নিহত ও আহতরা সবাই তল্লা চামারবাড়ি বায়তুস সালাত জামে মসজিদের আশেপাশের বাসিন্দা। আহত ও নিহতদের স্বজনদের আহাজারিতে পুরো তল্লা এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। ঘরে ঘরে বইছে শোকের মাতম আর কান্নার রোল। কে কাকে সান্ত¡না দেবেন সেই ভাষা হারিয়ে ফেলেছেন। স্বাধীনতার পর একসঙ্গে এতো মানুষের মৃত্যু ও আহত হওয়ার ঘটনা এই প্রথম দেখলো তল্লাবাসী।

বিস্ফোরণে আহত ও নিহতের মধ্যে বেশিরভাগই পরিবারের উপাজনক্ষম ব্যক্তি-গার্মেন্ট কর্মী ও নিম্ন আয়ের মানুষ। উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে অনেক পরিবার বাকরুদ্ধ। যারা আহত হয়ে বার্ন ইউনিটে ভর্তি রয়েছেন তাদের অনেকের পরিবারের আর্থিক সামর্থ্য নেই এই চিকিৎসার ব্যয় ভার বহন করার।
বায়তুস সালাত জামে মসজিদ থেকে প্রায় ৫শ’ গজ দূরে তল্লা খামারবাড়ি এলাকায় একটি টিনশেড রুম নিয়ে ভাড়া থাকেন ডেকোরেটর কর্মচারী স্বপন মিয়া। তিন ছেলেমেয়ের মধ্যে মেজ সিফাত। এবার এসএসসি পাস করেছে। কিন্তু আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে একটি গার্মেন্টস কারখানায় কাজ নিয়ে টাকা জোগাড় করছিলেন এইচএসসিতে ভর্তি হওয়ার জন্য। শুক্রবার রাতে মসজিদে নামাজ পড়তে গিয়ে বিস্ফোরণে ঝলসে যায় তার পুরো শরীর। কিন্তু পরিবারের আর্থিক অবস্থা এতটাই নাজুক যে ছেলেকে ঢাকা মেডিক্যালে গিয়ে দেখবে সেই পরিবহন ভাড়াটুকু পর্যন্ত নেই। তাই ঘরে বসেই দোয়া করছেন আর বিলাপ করে কাঁদছেন মা। আর বলছেন হাতে মাত্র ৫০ টাকা আছে। ঘরে চাল নেই যে এক বেলা রান্না করে খাবেন। তিনি বলেন, ছেলেটার কী অবস্থা, টাকার জন্য দেখতে যেতে পারছি না।
প্রসঙ্গত, শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর) রাতে এশার নামাজের সময় এ বিস্ফোরণ ঘটে। ফরজ নামাজের মোনাজাত শেষে অনেকে সুন্নত ও অন্য নামাজ পড়ছিলেন। এসময় মসজিদের ভেতরে প্রায় ৪০ জনের মতো মুসল্লি ছিলেন। বিস্ফোরণে তাদের প্রায় সবাই দগ্ধ হয়েছে।

error: Content is protected !!