November 24, 2020

মাই পেটারসন. লাইফ

ভয়েস অফ দ্যা কমিউনিটি

ধর্ম ব্যবসায়ীদের কাছে আত্মসমর্পণ করেছেন সাকিব


বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক

ছন্দের পতন হয় বলেই তো কথাটির প্রচলন। কিন্তু এভাবে ছন্দের পতন হবে তা ভাবতে পারিনি। যেদিন শুনলাম সাকিব কলকাতায় যাচ্ছেন শ্যামা পূজার অনুষ্ঠানে যোগ দিতে, সেদিন আনন্দে বুকটা ভরে উঠেছিল এই ভেবে যে, আমাদের বিশ্বজয়ী টাইগারদের নেতৃস্থানীয়জন দ্বারা শ্যামা পূজার উদ্বোধন, সম্প্রীতির উজ্জ্বল, অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করতে যাচ্ছে। কিন্তু দুই দিন পরেই হলো ছন্দ পতনের পালা। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী, মুজিব আদর্শের ধারক, ধর্মনিরপেক্ষ এবং অসাম্প্রদায়িকতার ধারণাকে মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম চেতনা হিসেবে যারা ধারণ করেন তাদের সবাইকে মারাত্মকভাবে হতাশ করে, মর্মাহত করে, ক্ষুব্ধ করে আমাদের কথিত ব্যাঘ্ররাজ সাকিব আসলে ধর্ম ব্যবসায়ীদের রক্তচক্ষু দেখে রণে ভঙ্গ দিয়েছেন। ঘটনাটা অনেকটা এমন বাঘ শিকারে প্রস্তুতি নিয়ে যখন দেখল একদল হরিণ তেড়ে আসছে তখন সে পিছুু হটল। এর মধ্যে অবশ্য এক মগজ ধোলাই করা ধর্মান্ধ ফেসবুকে সাকিবকে হত্যা করার ভয় দেখাল।

হত্যার ভীতি নিশ্চিতভাবে প্রায় সবাইকে শঙ্কিত করে। কিন্তু বিচক্ষণ মানুষদের উচিত সেই ভীতি ঠেকানোর জন্য কার্যকর পন্থা অনুসরণ করা, ভীতিকারদের কাছে আত্মসমর্পণ করা নয়। আমি যখন কাদের মোল্লার ফাঁসির রায় দেওয়ার জন্য হাই কোর্টের পথে তখন বেশ কয়েকজন আমাকে হত্যার ভয় দেখিয়েছিল। আমি সেই ভয়কে মোটেও ভ্রুক্ষেপ করিনি। তাদের ভয়ে সেদিন ভীত হলে তা হতো দেশের প্রতি চরম বিশ্বাসঘাতকতা। দেশের মানুষ আমাকে নর্দমায় নিক্ষেপ করতেন। সব হুমকি উপেক্ষা করে আমি কোর্টে পৌঁছে অন্য তিন মাননীয় বিচারপতির সঙ্গে কাদের মোল্লার ফাঁসির আদেশে দস্তখত করেছিলাম। একজন স্বাভাবিক মানুষের কাছ থেকে এটাই প্রত্যাশা হওয়ার কথা। সাকিব বলেছেন, তার শ্যামা পূজায় উপস্থিতির জন্য যারা কষ্ট পেয়েছে তাদের কাছে তিনি ক্ষমাপ্রার্থী। অথচ তার এ কাপুরুষসুলভ ক্ষমা চাওয়াতে যে বিরাট অসাম্প্রদায়িক জনগোষ্ঠী বিক্ষুব্ধ হয়েছেন সে কথা তার মনে আসেনি। তিনি যদি মনে করে থাকেন দেশে সাম্প্রদায়িক পাপীর সংখ্যা বেশি তাহলে বলব একজন জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব হিসেবে তার জানা উচিত যে এ কট্টর ধর্মান্ধরা ’৭১ এ আমাদের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে ছিল, যাদের মনে এখনো পাকিস্তান জিন্দাবাদ ধ্বনি বাজে, যারা মূলত ধর্ম ব্যবসায়ী, তাদের মূল উদ্দেশ্য মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সরকার হটিয়ে দেশকে পাকিস্তানে পরিণত করা, ইসলামিক রিপাবলিক বানানো বা তালেবান শাসন প্রতিষ্ঠা এবং এদের সংখ্যা দেশের গোটা জনসংখ্যার ২০% এর বেশি নয়। অর্থাৎ দেশের ৮০% মানুষ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির প্রতি দৃঢ়ভাবে শ্রদ্ধাশীল। দেশের ৮০% মুসলমান পূজার অনুষ্ঠানে গিয়ে থাকেন এবং এটি হাজার বছর ধরে চলছে, এটি আমাদের ঐতিহ্যের অংশ। একইভাবে হিন্দু জনগোষ্ঠী যোগ দেন মুসলমানদের ঈদ অনুষ্ঠানে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী প্রতিনিয়ত পূজার অনুষ্ঠানে গিয়ে থাকেন। ২০১৮ সালে কিছু ধর্মান্ধ তাঁর পূজায় যাওয়ার বিষয়ে প্রতিবাদ করলে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, যিনি নিজে একজন অত্যন্ত ধার্মিক মুসলমান, তিনি দ্বিধাহীনভাবে বলেছিলেন, ‘ধর্ম যার যার উৎসব সবার’। আমাদের মহামান্য রাষ্ট্রপতিও রামকৃষ্ণ মিশনের পূজামন্ডপে গমন করে থাকেন এবং বঙ্গভবনে পূজা আয়োজনকারী নেতৃবৃন্দকে পূজার দিন আপ্যায়ন করে থাকেন। এতে তাদের কারোরই ধর্ম নষ্ট হয়ে যায়নি। সিলেটের সাধক কবি, প্রয়াত শাহ্ আবদুল করিম, যার দেশব্যাপী ব্যাপক জনপ্রিয়তা তাঁকে প্রাতঃস্মরণীয় করে রেখেছে, তিনি লিখেছেন, ‘গ্রামের নওজোয়ান হিন্দু মুসলমান, মিলিয়া বাউলা গান আর মুর্শিদি গাইতাম, আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম’। তিনি সে কবিতায় উল্লেখ করেছেন মুসলমানগণ হিন্দুদের পূজায় যেতেন এবং হিন্দুরা আসতেন ঈদের অনুষ্ঠানে। এটাই সম্প্রীতির কথা। ইসলাম ধমের্র শ্রেষ্ঠতম দার্শনিকদের অন্যতম মাওলানা জালালউদ্দিন রুমি বলেছেন- ধর্ম, বর্ণ, জাত নির্বিশেষে সব মানুষকে ভালোবাসাই ধর্ম। সুলতান আমলে যখন শ্রী চৈতন্য দেব সেই ভালোবাসার বাণী প্রচার করতেন তখন কিছু কিছু ধর্মান্ধ শ্রী চৈতন্যকে বিরক্ত করতে চাইলে মুসলিম সুলতান তাদের প্রতিহত করে বলতেন, শ্রী চৈতন্য একটি মহৎ কাজ করছেন তাঁকে বিরক্ত করোনা। (সূত্র : ড. হারুন অর রশিদ, উপাচার্য জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়) বঙ্গবন্ধু বলতেন, ‘সৃষ্টিকর্তা রাব্বুল আল-আমিন অর্থাৎ সকল মানুষের প্রভু, তিনি রাব্বুল মোসলেমিন নন অর্থাৎ শুধু মুসলমানদের প্রভু নন। ধর্মের নামে মানুষকে ঘৃণা করা মানে প্রকারান্তরে সৃষ্টিকর্তার বিরুদ্ধেই অবস্থান নেওয়া। বঙ্গবন্ধু যে কত বড় একজন তাত্ত্বিক ছিলেন, দার্শনিক ছিলেন তার এই উক্তিসহ এমনই বহু উক্তি তারই স্বাক্ষর। তাঁকে হত্যা করেই ধর্ম ব্যবসায়ীরা সাম্প্রদায়িকতা এবং ঘৃণা প্রচারে লেগে যায়। ভারতের প্রয়াত রাষ্ট্রপতি শঙ্কর দয়াল শর্মা, যিনি একজন কবিও ছিলেন এবং যাঁর প্রচুর জ্ঞান ছিল ইসলাম ধর্মের ওপর, তিনি এক কবিতায় লিখেছিলেন- পবিত্র কোরআনে রয়েছে বহু অমূল্য বাণী অথচ কিছু ধর্ম ব্যবসায়ী সেসব বাণীর মূল অর্থ মানুষের কাছে পৌঁছাতে দিচ্ছে না।
আমি বেশ কয়েকবার দুর্গাপূজার অনুষ্ঠান উদ্বোধন করার সুযোগ পেয়েছি। বহু পূজার অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হওয়ার গৌরবে ভূষিত হয়েছিলাম। এগুলো আমার জন্য অত্যন্ত গর্বের বিষয়। আমাকে পূজা উদ্বোধনের সভাপতি হিসেবে নিমন্ত্রণ করে পূজা আয়োজকরা যে মর্যাদা দিয়েছেন তার জন্য আমি তাদের কাছে কৃতজ্ঞ। এতে আমার মুসলমান পরিচয় নষ্ট হয়ে যায়নি। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম পূজাকে নিবেদন করে যত কবিতা লিখেছেন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথও পূজা উপলক্ষে তত কবিতা লিখেননি। এতে কবি নজরুলের ধর্ম নষ্ট হয়ে যায়নি। তিনি একই সঙ্গে লিখেছেন, তাঁকে যেন মসজিদের পাশে কবর দেওয়া হয়, যেন তিনি আজানের ধ্বনি শুনতে পান। একেই বলে সম্প্রীতি। গাফ্ফার চৌধুরী সাহেব লন্ডনে অনেক পূজার অনুষ্ঠানে প্রধান বক্তা হিসেবে ভাষণ দিয়েছেন। এতে তাঁর ধর্ম নষ্ট হয়নি। প্রথম জীবনে মাদ্রাসা শিক্ষিত গাফফার ভাই যেমন ইসলামিক ধর্ম তত্ত্বে প্রাজ্ঞ, সনাতন ধর্মেও তাঁর জ্ঞান অপরিসীম। এই ধর্মান্ধরা পয়লা বৈশাখের অনুষ্ঠানের বিরোধিতা করে অথচ হাজার বছর ধরে পয়লা বৈশাখ উদ্যাপন আমাদের বৈশিষ্ট্য, যাতে আনন্দ করে থাকেন দেশের প্রায় সব মুসলমান। একইভাবে ধর্মান্ধরা মঙ্গল শোভাযাত্রা, নবান্ন, চৈত্র সংক্রান্তি এবং পয়লা ফাল্গুনের উৎসবেরও বিরোধী। ইসলাম ধর্মের কোথাও বলেনি এগুলো পাপ। পৃথিবীর অন্যান্য মুসলিমপ্রধান দেশেও, যেমন- ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, তুরস্ক, পূর্ব ইউরোপের বিভিন্ন দেশ, আফ্রিকার বিভিন্ন দেশেও স্থানীয় ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতিকে লালন করেন সে দেশের মুসলমানরা। এ ধর্মান্ধরা যে ধর্ম বিষয়ে অশিক্ষিত, অজ্ঞ তা ধর্মতত্ত্বে আসল শিক্ষিত, জ্ঞানীজনরা বলে থাকেন, কিন্তু তারা সোচ্চার নন বলে ধর্ম ব্যবসায়ীদের কণ্ঠ বেশি শোনা যায়। গত কয়েক দিন আমি তেমনি কয়েকজন প্রকৃত ধর্ম জ্ঞানসম্পন্ন হুজুরের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ পেয়েছি। তারা বললেন ধর্ম ব্যবসায়ীদের প্রচুর পয়সা আছে বলেই তাদের কণ্ঠ অধিক শোনা যায়। আসলেই সরল মানুষদের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে এসব ধর্ম ব্যবসায়ী একেকটি ওয়াজ থেকে লাখ লাখ টাকা আয় করেন এবং প্রদান করেন হিংসার বাণী, বিভেদের বাণী, ঘৃণার বাণী, মহিলাদের কর্মক্ষেত্রে না যাওয়ার বাণী। আমি খুব কমই ওয়াজ শুনেছি যেখানে আসল ধর্মতত্ত্ব সম্পর্কে, মানবতা সম্পর্কে, ধর্মীয় আদর্শ সম্পর্কে, মানুষে মানুষে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন সম্পর্কে অথবা সমাজ কল্যাণকর কথা বলা হয়। তারা না জানে বিদায় হজের বাণী না জানে মদিনা সনদের মর্মকথা। ধর্ম ব্যবসা ছাড়া এদের মূল উদ্দেশ্য হলো মুক্তিযুদ্ধের এ সরকারকে উৎখাত করে দেশকে পাকিস্তানে পরিণত করা, তালেবানি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা। তাদের স্পর্ধা এতই বেড়ে গেছে যে, তারা আজ বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য বুড়িগঙ্গায় ফেলে দেওয়ার কথা বলছে। আজ সময় এসেছে তাদের ভৌতিক দাবির কাছে আত্মসমর্পণ না করে তাদের সমুচিত শিক্ষা দেওয়ার। আমাদের মাননীয় মুক্তিযুদ্ধ বিষয়কমন্ত্রী অ্যাডভোকেট মোজ্জাম্মেল হক বলেছেন, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বঙ্গবন্ধুর ২৬ ফুট ভাস্কর্য বসানো হবে এবং ভাস্কর্যের বিষয়ে অর্বাচীন লোকদের কথায় কান দেবেন না। তিনি সবার প্রশংসার দাবিদার এ জন্য যে, তিনি ধর্ম ব্যবসায়ীদের উচিত জবাব দিয়ে দিয়েছেন। একই ধরনের উচিত জবাব দিয়েছেন মাহবুবুল হক হানিফ, ব্যারিস্টার নওফেল এবং নৌ প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী। তাদের সবাইকে সাধুবাদ।

সাকিব সাহেব বলেছেন, তিনি পূজায় যাওয়ায় যারা কষ্ট পেয়েছে তাদের কাছে তিনি ক্ষমাপ্রার্থী। সাকিব সাহেব বুঝতে পারলেন না তার এই কাপুরুষসুলভ এবং অন্যায় ক্ষমা প্রার্থনায় গুটিকয়েক ধর্ম ব্যবসায়ী যদি খুশি হয়েও থাকে এর ফলে মর্মাহত হয়েছেন, হতাশ হয়েছেন কোটি কোটি মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী জনতা, যারা সম্প্রীতির মহান ঐতিহ্যে বিশ্বাস করা সত্যিকারের ধার্মিক লোক, কেননা মানুষকে ভালোবাসাই ধর্ম, বলেছেন মাওলানা রুমিসহ অন্য ধর্মবিশারদরা। যেসব কোটি কোটি মুসলমান শাহ্ আবদুল করিমের সেই অমর গানটি আনন্দভরে প্রতিদিন শুনে থাকেন তারা নিশ্চয়ই সাকিবের ক্ষমা প্রার্র্থনায় গভীরভাবে আহত হয়েছেন। সাকিব সাহেব যদি ধর্মান্ধ মুক্তিযুদ্ধবিরোধীদের অন্যায় দাবির কাছে আত্মসমর্পণ না করে, সত্যিকার টাইগার নেতার মতো অবস্থানে থেকে ধর্ম ব্যবসায়ীদের দাঁতভাঙা জবাব দিতেন তাহলে তিনি বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মনে গৌরবের জায়গায় থাকতেন। তিনি সম্ভবত ভুলে গিয়েছিলেন যে এ পাকিস্তানপন্থি, তালেবানপন্থি ধর্মব্যবসায়ীরা ২০১৩ এর ৫ মে মাত্র কয়েকটি সাউন্ড গ্রেনেডের শব্দে মাথায় হাত দিয়ে দৌড়ে পালিয়েছিল ভয়ার্ত শৃগালের মতো। এই হচ্ছে তাদের শক্তি, সাহস। সাকিব সাহেব কোনো অন্যায় বা পাপ করেননি যার জন্য ক্ষমা চাইলেন, বরং ক্ষমা চেয়ে তিনি নীতির প্রশ্নে শক্ত অবস্থানে থাকার অক্ষমতা প্রদর্শন করেছেন।সূত্র: বিডি প্রতিদিন।

            লেখক : আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি।
error: Content is protected !!