ডোনাল্ড ট্রাম্পের হাসি-ঠাট্টা ও একগুচ্ছ করোনা বচন!

করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্প । বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় সময় সকালে স্ত্রীসহ করোনা আক্রান্তের এই খবর নিজেই এক টুইট বার্তায় দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। ট্রাম্পের সস্ত্রীক করোনা আক্রান্তের খবরে সমবেদনা জানানোর পাশাপাশি বিশ্বজুড়ে হাসাহাসি করছে মানুষ, চলছে বিস্তর আলোচনা-সমালোচনা।

বর্তমানে কোয়ারেন্টাইনে থাকা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প করোনাভাইরাস নিয়ে বিভিন্ন সময়ে বিতর্কিত নানা মন্তব্য করেছেন। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা করোনাভাইরাস সংক্রমণ ঠেকাতে মাস্ক পরার পরামর্শ দিলেও ট্রাম্প বরাবরই এর বিরোধিতা করেছেন। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বড় ধরনের জনসমাগম এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিলেও তাতে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে মাস্কবিহীন সমর্থকদের নিয়ে বিশাল বিশাল সমাবেশ করেছেন তিনি।

করোনাভাইরাস মহামারি মোকাবিলায় হোয়াইট হাউসের নেয়া ব্যবস্থা নিয়ে ব্যর্থতার অভিযোগ উঠলেও মাথা ঘামাননি ট্রাম্প। এই ভাইরাসে যুক্তরাষ্ট্রে ২ লাখের বেশি মানুষের প্রাণ কাড়লেও সঙ্কট মোকাবিলায় প্রশাসনের সফলতার গুণগান গেয়েছেন তিনি।

চলুন এক নজরে দেখে নেয়া যাক ট্রাম্পের বিভিন্ন সময়ে করা বিতর্কিত কিছু মন্তব্য

২২ জানুয়ারি: সিএনবিসিকে ট্রাম্প বলেন, ‘এটি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আছে। চীন থেকে আসা এক ব্যক্তি ভাইরাসটি এনেছে। এটি ঠিক হয়ে যাবে।’

২৪ জানুয়ারি: তিনি টুইট করেন, ‘চীন করোনাভাইরাস নিয়ন্ত্রণে জোর চেষ্টা চালাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র তাদের প্রচেষ্টা ও স্বচ্ছতার প্রশংসা করে। এটি ঠিক কাজ করবে। আমেরিকার জনগণের পক্ষ থেকে আমি প্রেসিডেন্ট শিকে ধন্যবাদ জানাই।’

২৩ ফেব্রুয়ারি: সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা একান্তভাবে কাজ করছি। যা হচ্ছে, সে বিষয়ে যথেষ্ট সচেতন আছি। আমাদের দেশে এটি যথেষ্ট নিয়ন্ত্রণে।’

২৭ ফেব্রুয়ারি: হোয়াইট হাউসে তিনি বলেন, ‘এটি নাই হয়ে যাচ্ছে। একদিন যাদুর মতো উধাও হয়ে যাবে।’

১০ মার্চ: রিপাবলিকান সিনেটরদের সঙ্গে দেখা করার পর ট্রাম্প বলেন, ‘এটি অপ্রত্যাশিত। বিশ্বব্যাপী আঘাত হেনেছে। আমরা প্রস্তুত এবং আমরা এটি নিয়ে ভালোভাবে কাজ করে যাচ্ছি। এটি চলে যাবে। শান্ত থাকুন, চলে যাবে।’

১৩ মার্চ: সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘হ্যাঁ। না। আমি মোটেও দায়িত্ব নেব না। কারণ, পরিস্থিতি বিবেচনা করে একটা সময় থেকে নিয়ম, বিধিবিধান জারি করা হয়েছে।’

১৫ মার্চ: হোয়াইট হাউসে ব্রিফিংকালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘এটি খুবই সংক্রামক ভাইরাস। অবিশ্বাস্য। তবে, এর ওপর আমাদের যথেষ্ট নিয়ন্ত্রণ আছে।’

১৮ মার্চ: ট্রাম্প টুইট করেন, ‘আমি চীনা ভাইরাসকে সবসময়ই অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখেছি। প্রথম থেকেই খুব ভালোভাবে কাজ করেছি। প্রায় সবার ইচ্ছার বিরুদ্ধে আমিই চীনের সঙ্গে সীমান্ত বন্ধ করেছি।’

৩ এপ্রিল: হোয়াইট হাউসে ব্রিফিংয়ে তিনি বলেন, ‘মাস্ক পরাটা স্বাধীন বিষয়। আপনি পরতেও পারেন, নাও পারেন। আমি পরব না। কেউ এটি পরতে পারে, সেটি ঠিক আছে। আমাকে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, রাজা, রাণীর সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করতে হয়। নিজের কথা বলছি, আমি পরব না।’

২৩ এপ্রিল: হোয়াইট হাউসে ব্রিফিংয়ে ট্রাম্প বলেন, ‘জীবাণুনাশক এক মিনিটে বিষমুক্ত করছে। ফুসফুসে এভাবে কাজ করে কি না, সেটি পরীক্ষা করে দেখতে হবে।’

তবে তিনি জীবাণুনাশক খাওয়ার জন্য মানুষকে উত্সাহিত করছেন না বলে পরে জানিয়েছেন।

২১ মে: ফোর্ড কারখানা পরিদর্শনে গিয়ে তিনি বলেন, ‘যখন পেছনে ছিলাম, তখন একটি (মাস্ক) পরেছিলাম। গণমাধ্যমের সামনে মাস্ক পরে এসে বিনোদন দিতে চাই না।’

১২ জুলাই: প্রথমবারের মতো জনসম্মুখে মাস্ক পরার আগে ট্রাম্প বলেন, ‘যখন হাসপাতালে আছেন, বিশেষ করে যখন আপনাকে অনেক লোক কিংবা সেনাদের সামনে কথা বলতে হচ্ছে, তখন আমার মনে হয়ে মাস্ক পরে নেওয়াটা ভালো।’

২১ জুলাই: হোয়াইট হাউসে ব্রিফিংকালে তিনি বলেন, ‘আমরা সবাইকে বলছি, যখন সামাজিকভাবে দূরত্ব বজায় রাখা যায় না, তখন মাস্ক পরুন। মাস্ক পরা আপনার ভালো লাগুক বা না লাগুক, এর গুরুত্ব আছে। আমি আনন্দের সঙ্গে মাস্ক ব্যবহার করব। এটি কাজে আসবে।’

২৯ সেপ্টেম্বর: প্রেসিডেন্সিয়াল বিতর্কে ট্রাম্প বলেন, ‘যখন প্রয়োজন, আমি মাস্ক পরি।’

ডেমোক্রেটিক প্রতিদ্বন্দ্বী জো বাইডেনকে সবসময় মাস্ক পরেন বলে উপহাস করে তিনি বলেন, ‘আমি তার মতো করে পরি না। আপনি যখনই তাকে দেখবেন, তিনি মাস্ক পরে থাকবেন। ২০০ ফুট দূর থেকে কারও সঙ্গে কথা বলতে গেলেও আমার দেখা সবচেয়ে বড় মাস্কটি মুখে রেখে তিনি কথা বলেন।’

এদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প করোনাভাইরাসের জটিলতার উচ্চ ঝুঁকিতে আছেন। ট্রাম্প করোনায় আক্রান্তের পর শুক্রবার বিবিসি এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে।

৭৪ বছর বয়সী ৬ ফুট ৩ ইঞ্চি উচ্চতার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ওজন ২৪৪ পাউন্ড। সেই হিসেবে তার বডি ম্যাস ইনডেক্স (বিএমআই) ৩০ এর বেশি। ক্লিনিক্যালি ৩০ এর বেশি বিএমআই এর অর্থ হচ্ছে স্থূলতা। স্থূল ব্যক্তিদের বেলায় করোনায় স্বাস্থ্যঝুঁকি তিন গুণ বেশি।

যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোলের (সিডিসি) তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে করোনা মৃতদের প্রতি ১০ জনের মধ্যে আট জনের বয়স ৬৫ এর ঊর্ধ্বে। ট্রাম্পের বয়সী পুরুষদের হাসপাতালের সেবার প্রয়োজন পাঁচ গুণ বেশি। এছাড়া দেশটিতে ২০ থেকে ৩০ বছর বয়সীদের তুলনায় ৬৪ থেকে ৭৪ বছর বয়সীদের করোনায় মৃত্যুর হার প্রায় ৯০ গুণ।

ট্রাম্প পুরুষ হওয়ায় মৃত্যু ঝুঁকিও বেশি। কারণ যুক্তরাষ্ট্রে করোনায় মৃত্যুর হার নারীদের তুলনায় পুরুষদের মধ্যে বেশি।

ট্রাম্পের মধ্যে অবশ্য করোনায় আক্রান্তের লক্ষণগুলো প্রকাশ পেয়েছে কিনা তা জানা যায়নি।

প্রেসিডেন্টের চিকিৎসক ডা. শন কনলি বলেছেন, ‘প্রেসিডেন্ট ও ফার্স্ট লেডি দুজনই ভালো আছেন। করোনা থেকে সুস্থ হওয়ার এই সময়টাতে তারা হোয়াইট হাউসে তাদের ঘরে থাকবেন বলেই পরিকল্পনা করেছেন।’

কিংস কলেজ লন্ডনের ড. নাথালি ম্যাকডারমট বলেছেন, ট্রাম্প হচ্ছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট। তাই অসুস্থ হলে বিশ্বের সেরা স্বাস্থ্যসেবা পাবেন তিনি।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

error: Content is protected !!