November 28, 2020

মাই পেটারসন. লাইফ

ভয়েস অফ দ্যা কমিউনিটি

টারান্টের যাবজ্জীবন দণ্ডে স্বজন হারানো বাংলাদেশিদের মিশ্র প্রতিক্রিয়া

২০১৯ সালের ১৫ মার্চ ক্রাইস্টচার্চে পর পর দুটি মসজিদে হামলা চালায় ২৮ বছরের ব্রেন্টন। প্রথমে নূর মসজিদ এবং পরে লিনউড মসজিদে হামলা চালায় সে। হামলার আগে মুসলিমবিদ্বেষী পোস্টার শেয়ার করেছিল নিজের সোশ্যাল মিডিয়ার ওয়ালে। গোটা ঘটনাটা লাইভ স্ট্রিম করে দেখিয়েছিল সে। ২৭ আগস্ট বৃহস্পতিবার দেশটির হাইকোর্ট ব্রেন্টন টারান্টকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের শাস্তি দিয়েছেন। হামলাকারী টারান্টকে  আমৃত্যু কারাগারে থাকতে হবে।নিউ জিল্যান্ডের ইতিহাসে এমন সাজা এটিই প্রথম।

এদিকে,মসজিদে বন্দুক হামলা চালানো ব্রেন্টন টারান্টকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়ায় মিশ্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন ঐ হামলার ভুক্তভোগী বাংলাদেশি নাগরিক ও তাদের পরিবারের সদস্যরা।

গত বছরের ১৫ই মার্চ জুমার নামাজের সময় ক্রাইস্টচার্চের দু’টি মসজিদে বন্দুক হামলা চালান ২৯ বছর বয়সী ব্রেন্টন টারান্ট, যেই হামলায় নিউজিল্যান্ড প্রবাসী ৫ জন বাংলাদেশি নাগরিক সহ ৫১ জন মারা যান, আহত হন আরো অনেকে।

 সেই দিন ছিল জুমার নামাজের দিন। নামাজ পড়ে বহু মানুষ বাইরে বেরুচ্ছিলেন। ঠিক সে সময়েই অতর্কিত গুলি চালাতে শুরু করে খুনি ব্রেন্টন। একের পর এক মানুষ মাটিতে লুটিয়ে পড়তে শুরু করে। মসজিদের ভেতরে ঢুকেও গুলি চালাতে থাকে ব্রেন্টন। গুলি চালিয়ে ৫১ জনকে হত্যা করে সে। গুরুতর আহত হয় আরও ৪০ জন।


ঐ ঘটনায় ব্রেন্টন টারান্টকে নিউজিল্যান্ডের আইন অনুযায়ী সর্বোচ্চ শাস্তি দেয়া হয়েছে। তবে আইন অনুযায়ী সর্বোচ্চ শাস্তি দেয়া হলেও সেদেশের আইনে মৃত্যুদণ্ডের বিধান না থাকায় কেউ কেউ কিছুটা অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন।

 যেরকম বলছিলেন বাংলাদেশের নাগরিক বাবুল। তার স্ত্রী আফসানা আক্তার রিতু হামলার দিন একটি মসজিদের ভেতর ছিলেন। তবে তিনি বেঁচে যান।

মি. বাবুল বলেন, একটা মানুষ ৫১ জনকে ঠান্ডা মাথায় হত্যা করার পরও কীভাবে বেঁচে থাকার সুযোগ পায়? আমরা এই রায়ে কিছুটা মনক্ষুন্ন।

তিনি জানান ঐ ঘটনার পর এক মাসেরও বেশি সময় তার স্ত্রী ঘর থেকে বের হননি। সবসময় দরজা জানালা বন্ধ করে রাখতেন।
আমার স্ত্রী এখনও পুরোপুরি ঐ আতঙ্ক থেকে বের হতে পারেননি। মনে হয় না কখনো পারবেন। তবে মি. বাবুলের মত রায়ে অসন্তোষ নেই সব ভুক্তভোগীর।

আল নূর মসজিদে বন্দুক হামলায় গুলিবিদ্ধ হয়েছিলেন ওমর জাহিদ। এখনও শারীরিকভাবে শতভাগ সুস্থ হতে পারেননি তিনি।

তার কয়েকজন সহপাঠী এবং পরিচিত ব্যক্তিও সেসময় হামলায় মারা গিয়েছিলেন।

নিউজিল্যান্ডের আইন অনুযায়ী ব্রেন্টন টারান্টের হওয়া শাস্তির সিদ্ধান্তে সন্তুষ্টি প্রকাশ করে তিনি বলেন,  দোষীকে যদি মৃত্যুদণ্ড দেয়াও হতো, তাহলেও তো আমার মারা যাওয়া বন্ধুরা, পরিচিতরা ফিরে আসতো না। আমার মত যারা আহত হয়েছেন, তারা তো আর সুস্থ, স্বাভাবিক জীবন ফিরে পাবে না।

 যেহেতু নিউজিল্যান্ডের আইনের সর্বোচ্চ সাজাটাই তাকে দেয়া হয়েছে, তাই আমি সন্তুষ্ট। আমার মনে হয় যে সুবিচারই হয়েছে।

রায়ে স্বস্তি প্রকাশ করেছেন ঐ হামলায় প্রাণ হারানো হোসনে আরা ফরিদের স্বামী ফরিদ উদ্দীন আহমেদ। ঐ ঘটনার কয়েকদিন পরই ফরীদ উদ্দীন আহমেদ গণমাধ্যমের কাছে বলেছিলেন যে হামলাকারী ব্রেন্টন টারান্টকে তিনি এবং তার পরিবার মন থেকে ক্ষমা করে দিয়েছেন, যেই মন্তব্যের পুনরাবৃত্তি তিনি করেছেন হামলাকারী টারান্টের যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের সিদ্ধান্ত হওয়ার পরও।

বিবিসিকে ফরিদ উদ্দীন আহমেদ বলেন, হামলাকারীকে আমি এবং আমার মেয়ে ক্ষমা করতে পেরেছি বলেই এখন আমরা মানসিকভাবে শান্তিতে রয়েছি বলে আমার বিশ্বাস। এখন হামলাকারীকে শাস্তি দেয়া হলেও আমার মানসিক পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন হয়নি।

ভাগ্যক্রমে বেঁচে যাওয়া মি. আহমেদ হামলার কিছুদিন পর বিবিসিকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন, তার এবং অন্যদের জীবন বাঁচাতে সেদিন তার স্ত্রী হোসনে আরা নিজের জীবনকে উৎসর্গ করেছিলেন।

নিউজিল্যান্ডের বিচার ব্যবস্থায় মৃত্যুদণ্ডের শাস্তি দেয়ার কোনো সুযোগ নেই।

এই প্রথমবারের মত নিউজিল্যান্ডে প্যারোল ছাড়া যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের শাস্তি দেয়া হলো। হামলাকারী ব্রেন্টন টারান্টকে আমৃত্যু কারাগারে থাকতে হবে।তিন দিন ধরে বহু প্রত্যক্ষদর্শী এবং নিহতদের পরিবারের জবানবন্দি শুনেছেন আদালত। অনেকেই আবেদন জানিয়েছিলেন, নৃশংস এই খুনিকে যেন কঠোরতম শাস্তি দেওয়া হয়। মৃত্যুদণ্ডের আবেদনও এসেছিল। তবে নিউ জিল্যান্ডে মৃত্যুদণ্ডের প্রচলন নেই। তবে বর্বরোচিত এ হত্যাযজ্ঞের কঠোরতম সাজা ঘোষণা হবে বলে আগেই জানিয়েছিলেন আদালত।

রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী বার্নাবি হাওয়েজ আদালতকে বলেছেন, ওই হামলার জন্য বন্দুকধারী বহু বছর ধরে পরিকল্পনা করছিল। তার উদ্দেশ্যে ছিল যত বেশি সম্ভব মানুষকে হতাহত করা।রায় ঘোষণার সময় বিচারক বলেন, ১৭, ২৫, ৩৫ বছরের জন্য সাজা দেওয়া যেত এই সন্ত্রাসীকে। কিন্তু আদালত স্থির করেছে, তাকে সারা জীবনের জন্য জেলে পাঠাবে। কখনও প্যারোলে বাইরে বেরুতে পারবে না সে।

রায় ঘোষণার সময় বিচারক বলেন, আপনি যে ক্ষতি করেছেন তার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা বা জনসম্মুখে স্বীকারোক্তি দেননি। যদিও আমি আপনার (আদালতের) এই প্রক্রিয়াগুলো প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ব্যবহার করার সুযোগ ত্যাগ করার প্রশংসা করছি, কিন্তু আপনাকে মোটেও অনুতপ্ত বা লজ্জিত দেখাচ্ছে না।
শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদে বিশ্বাসী টারান্টের উদ্দেশে বিচারক বলেন, আপনি একটি গণহত্যা চালিয়েছেন। আপনি নিরস্ত্র ও প্রতিরোধবিহীন মানুষদের হত্যা করেছেন।

দণ্ডের রায় ঘোষণার আগে উচ্চৈস্বরে দীর্ঘসময় ধরে টারান্টের হামলার শিকার ব্যক্তিদের বর্ণনা এবং তাদের স্বজনদের মন্তব্য পড়ে শোনান বিচারক ম্যান্ডার। এসময় আবেগাপ্লুত হয়ে পড়ায় দু’বার থেমে যেতে হয় তাকে।
 

ব্রেন্টন পরে পুলিশকে জানায়, দুটি নয়, তিনটি মসজিদে হামলা চালানোর ইচ্ছে ছিল তার। শুধু তাই নয়, প্রতিটি মসজিদ পুড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল। নিজের কাজের জন্য কখনও অনুশোচনা প্রকাশ করেনি ব্রেন্টন। বরং কৃতকর্মের পক্ষে সওয়াল করেছে। আদালতে প্রপাগান্ডা চালানোর চেষ্টা চালিয়েছে। তবে নিউ জিল্যান্ডের প্রশাসন প্রথম থেকেই বিষয়টি কঠোরভাবে মোকাবিলা করেছে। রায় ঘোষণার পরেই নিহতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন নিউ জিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জাসিন্ডা আরডার্ন ।  

error: Content is protected !!