December 4, 2020

মাই পেটারসন. লাইফ

ভয়েস অফ দ্যা কমিউনিটি

জলবায়ু পরিবর্তন: ১০০ বিলিয়ন ডলার নিশ্চিত করার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, পৃথিবীকে বাঁচানোর পদক্ষেপ আজই নিতে হবে, কাল নয়। কারণ মানবজাতি ‘প্রকৃতির বিরুদ্ধে যুদ্ধে’ হারতে চলেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব থেকে উন্নয়নশীল দেশগুলোকে বাঁচাতে বছরে ১০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার নিশ্চিত করার ডাক দিয়ে জলবায়ুর ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় চার দফা প্রস্তাব উত্থাপন করেন তিনি।

বুধবার (৭ অক্টোবর) সন্ধ্যায় প্রধানমন্ত্রী তার সরকারি বাসভবন গণভবন থেকে ভার্চুয়ালি ‘মিডনাইট সারভাইভাল ডেডলাইন ফর দ্য ক্লাইমেট’ শীর্ষক জলবায়ু ক্ষতিগ্রস্ত ফোরামের (সিভিএফ) লিডার্স ইভেন্টে এসব কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। সিভিএফ-এর বর্তমান চেয়ারম্যান হিসেবে বৈশ্বিক নেতাদের এ ভার্চুয়াল বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

শেখ হাসিনা বলেন, ‘‘তার সরকার জনগণের ভবিষ্যৎকে সুরক্ষিত করার এবং সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করার জন্য জাতীয় ‘মুজিব জলবায়ু সমৃদ্ধি পরিকল্পনা’ নামে একটি নতুন কর্মসূচি চালু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এখন নিশ্চিত করা উচিত যে, উন্নয়নশীল দেশগুলো প্রশমন, অভিযোজন এবং দুর্যোগ প্রতিক্রিয়া ও পুনরুদ্ধারের জন্য বছরে অন্তত ১০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার যেন পেতে পারে।’’

পৃথিবীকে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব থেকে রক্ষায় শক্তিশালী আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্বের জন্য চার দফা প্রস্তাবও উত্থাপন করেন প্রধানমন্ত্রী। প্রথম প্রস্তাবে তিনি বলেন, ‘প্যারিস চুক্তির কঠোর বাস্তবায়নই জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ক্ষতির বর্তমান হারকে হ্রাস করার একমাত্র উপায়।’

দ্বিতীয় প্রস্তাবে তিনি বলেন, ‘প্যারিস চুক্তির আওতায় সরকারগুলোকে তাদের জাতীয় অবদানকেই কেবল সম্মান জানানো উচিত নয়, তাদের আকাঙ্ক্ষাও যথেষ্ট পরিমাণে বাড়ানো দরকার। জলবায়ু ন্যায়বিচারের ধারণাটি জলবায়ু এবং পৃথিবীর স্বার্থে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে।’

প্রধানমন্ত্রী তার তৃতীয় প্রস্তাবে বলেন, ‘প্রযুক্তিতে প্রবেশাধিকারের পাশাপাশি এমডিবি এবং আইএফআইসহ প্রধান অর্থনীতির দেশগুলোকে (উন্নত দেশগুলো) অর্থের আরও জোরদার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।’ চতুর্থ প্রস্তাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘লোকসান ও ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টিকে চিহ্নিত করতে এবং মূলধারায় আনতে সাহসী পদক্ষেপ গ্রহণ করুন।’

পৃথিবীকে রক্ষায় এখনই পদক্ষেপ নেওয়ার তাগিদ দিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, ‘প্রকৃতির বিরুদ্ধে যুদ্ধে আমরা কেবলই হারবো। আমাদের সব কর্মকাণ্ড দেখে মনে হচ্ছে, আমরা সচেতনভাবে আমাদের বাঁচিয়ে রাখার অতি প্রয়োজনীয় সিস্টেমগুলো ধ্বংস করে দিচ্ছি। সুতরাং পৃথিবীকে রক্ষায় পদক্ষেপ নেওয়ার এখনই সময়, আগামীকাল নয়, আজই।’ জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বর্তমান ক্ষতি কমিয়ে আনতে প্যারিস চুক্তির কঠোর বাস্তবায়নের ওপর জোর দেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘বিভিন্ন দেশের সরকারের শুধু প্যারিস চুক্তির আওতায় জাতীয় অবদানে সন্তুষ্ট থাকা উচিত হবে না। তাদের লক্ষ্য ও অবদান আরও বাড়ানো দরকার। জলবায়ু এবং পৃথিবীর জন্য ‘ক্লাইমেট জাস্টিস’ ধারণাটি অবশ্যই প্রতিষ্ঠিত হতে হবে। কেননা, আজ আমরা সময়ের সব থেকে গুরুতর বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়ে মানব ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে অবস্থান করছি। জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব আমাদের সভ্যতার ক্ষতি করছে, আমাদের গ্রহকে ধ্বংস করছে এবং আমাদের অস্তিত্বকেও হুমকির মুখে ফেলেছে।’

বাংলাদেশ দ্বিতীয়বারের মতো জলবায়ু ক্ষতিগ্রস্ত ফোরামের নেতৃত্বের জন্য নির্বাচিত হয়ে সম্মানিত হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘সিভিএফ বিশ্বের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশের এক বিলিয়নেরও বেশি লোকের প্রতিনিধিত্ব করে।’ বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণে অনুল্লেখযোগ্য অবদানের পরেও সিভিএফ দেশগুলোই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে মন্তব্য করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সভাপতি হিসেবে, বিশ্বব্যাপী তাপমাত্রা বৃদ্ধিকে ১ দশমিক ৫ ডিগ্রির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার লক্ষ্যে আমাদের সমর্থন অব্যাহত থাকবে। অর্থায়ন ব্যবস্থাকে ত্বরান্বিত করা এবং জলবায়ু স্থিতিস্থাপকতার আখ্যানগুলো এবং ক্ষতি এবং ক্ষয়ক্ষতি ইস্যু তুলে ধরাই আমাদের লক্ষ্য হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কিত বিষয়ে জাতিসংঘে বিশেষ ‘র‌্যাপোর্টিয়ার’ নিয়োগ এবং একটি সিভিএফ এবং ভি ২০ যৌথ মাল্টি-ডোনার তহবিল গঠনের ওপরও গুরুত্ব দেবো।’ প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বাংলাদেশ গত ৮ সেপ্টেম্বর ঢাকায় গ্লোবাল সেন্টার ফর অ্যাডাপটেশনের দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক কার্যালয় খুলেছে। যেটি বাংলাদেশের সভাপতির সচিবালয় হিসেবে কাজ করবে এবং এই অঞ্চলে জলবায়ু স্থিতিস্থাপকতা বাড়াতে দক্ষিণ এশিয়ায় যথাযথ পদক্ষেপে সহায়তা, সাহায্য এবং বিকাশ ঘটাবে।’

জার্মান ওয়াচের জলবায়ু পরিবর্তন ঝুঁকি সূচক ২০১৯ অনুযায়ী তিনি বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবে অত্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ সপ্তম স্থানে রয়েছে। বর্ষায় বাংলাদেশ বারবার বন্যার মুখোমুখি হচ্ছে, যা ফসলের ব্যাপক ক্ষতি এবং বিশাল জনগোষ্ঠীকে বাস্তুচ্যুত করেছে। গত মে মাসে সুপার সাইক্লোন আম্পানের প্রভাব এবং বর্তমান কোভিড-১৯ মহামারির কারণে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। ১১ লাখ রোহিঙ্গাকে কক্সবাজারে আশ্রয় দেওয়ায় তারাও মারাত্মক সামাজিক এবং পরিবেশগত ক্ষয়ক্ষতির কারণ হচ্ছে।’

এসব মোকাবিলায় বিভিন্ন পদক্ষেপ তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘‘বাংলাদেশ সরকার ২০০৯ সাল থেকে ‘বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট তহবিলের’ অধীনে নিজস্ব সম্পদ থেকে ৪৩০ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দ করেছে।’’ তিনি বলেন, ‘‘সারা বছর দেশজুড়ে লাখ লাখ গাছের চারা রোপণ করা হচ্ছে। ‘আমাদের বিজ্ঞানীরা লবণাক্ততা, বন্যা এবং খরা প্রতিরোধী ফসল এবং ভাসমান কৃষি প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছেন। আমার সরকার অভিযোজনমূলক কাজের জন্য ২০১০ সাল থেকে প্রতিবছর গড়ে ২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, জিডিপির এক শতাংশ ব্যয় করছে।’

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘‘সমুদ্রের উচ্চতা বৃদ্ধির বর্তমান ধরন অব্যাহত থাকলে অধিকাংশ দ্বীপ এবং সমুদ্র তীরবর্তী রাষ্ট্র পানির নিচে চলে যাবে। ফলে লাখ লাখ মানুষ জলবায়ু শরণার্থী হয়ে পড়বে এবং এদের আশ্রয় দেওয়ার সামর্থ্য বিশ্বের নেই। এটা উপলব্ধি করে বাংলাদেশ সংসদ একটি ‘প্ল্যানেটারি জরুরি অবস্থা’ ঘোষণা করে এবং বিশ্বকে জলবায়ু পরিবর্তন বন্ধে যুদ্ধের সময়ের মতো করে কাজ করার আহ্বান জানায়।’’

অনুষ্ঠানে আরও অংশ নেন জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস, গ্লোবাল সেন্টার অন অ্যাডাপ্টেশন (জিসিএ) চেয়ার, জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব বান কি মুন, সিভিএফ দেশগুলোর রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানসহ বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিরা।

error: Content is protected !!