জনগণের দেয়া ভর্তুকি তুলে দেয়া হয়েছে কুইক রেন্টালের মালিকদের হাতে

আলী রীয়াজ

বাংলাদেশ সরকার আগামী ১৮ মাসের মধ্যে তিন হাজার মেগাওয়াট ক্ষমতার বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ করে দেবার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যার বেশির ভাগই রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল কেন্দ্র। এর সঙ্গে সরকারি পুরোনো বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ করা হবে। বিদ্যুৎ বিভাগের উচ্চ পর্যায়ের দুই কর্মকর্তাকে উদ্ধৃত করে প্রথম আলো জানাচ্ছে যে গত ছয় বছরে প্রায় ৬২ হাজার কোটি টাকা বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের কেন্দ্র ভাড়া দিয়েছে সরকার। এসব কেন্দ্র পূর্ণ সক্ষমতা তো দূরে থাক, ৩০ শতাংশও চালানো সম্ভব হয়নি।

অলস বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে বসিয়ে বসিয়ে অর্থ দিয়েছে সরকার। এ সব হিসেব হচ্ছে মাস্টার প্ল্যান রিভিউ করার কারনে। এই রিভিউ প্ল্যান তৈরি হয়েছিলো ২০১০ সালে – আওয়ামী লীগ ক্ষমতার আসার পরপর। সেই সময়ে অবিলম্বে বিদ্যুৎ খাতে বৈপ্লবিক পরিবর্তনের কথা বলে কুইক রেন্টালের ব্যবসার সূচনা হয়। যেহেতু ২০০১-২০০৬ সালে বিএনপি’র শাসনামলে বিদ্যুত খাতে অগ্রগতি হয়নি বরঞ্চ ‘খাম্বা’ বানিজ্য হয়েছে সেই কারনে আওয়ামী লীগ নাটকীয় ব্যবস্থার পথে অগ্রসর হয়। জ্বালানী খাত বিষয়ে যারা জানেন-বোঝেন তাঁদের এক বড় অংশই এই কুইক রেন্টালের পথ পরিহার করে দীর্ঘমেয়াদী বিবেচনায় সরকারের সক্ষমতা বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছিলেন। সরকার তাতে কান না দিয়ে ব্যক্তিখাতে চটজলদি সমাধানের নামে জনগণের অর্থ লুটপাটের ব্যবস্থা করে দেয়। কোনও রকম প্রতিযোগিতা ছাড়া নিজেদের পছন্দের লোকদের হাতে বিদ্যুত খাত তুলে দেয়া হয়। শুধু তাই নয়, এমন ব্যবস্থা করা হয় যাতে ক্যাপাসিটি চার্জের নামে এই সব প্রতিষ্ঠান বসে বসেই জনগণের অর্থ পেতে পারে, বিদ্যুৎ উৎপাদন হল কিনা – জনগণ তা থেকে লাভ পেলো কিনা সেগুলো বিবেচ্য বিষয় ছিলো না।

এই ব্যবস্থার সরকারী কাগুজে নাম যাই হোক, আসলে এ হচ্ছে লুটপাটের ব্যবস্থা। হ্যাঁ, লুটপাট কথাটা ইচ্ছে করেই ব্যবহার করলাম। এখন সরকার কার্যত তাই স্বীকার করেছেন। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) তথ্যমতে, ২০১৩-১৪ অর্থবছর থেকে গত অর্থবছর পর্যন্ত বেসরকারি বিদ্যুৎ ব্যবসায়ীদের ইনডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্ল্যান্ট (আইপিপি) ও রেন্টাল কেন্দ্রগুলোকে ৬১ হাজার ৪৬২ কোটি টাকা কেন্দ্র ভাড়া বা ক্যাপাসিটি পেমেন্ট দিয়েছে। এই হিসেব কেন গত ছয় বছরের, দশ বছরের নয় সেটা নিশ্চয় প্রশ্ন করা যায়। এর মধ্যে এই মাস্টার প্ল্যান একবার ২০১৬ সালে যখন রিভিউ করা হয়; সেই সময়েও এই বিষয়ে মনোযোগ দেয়া হয়েছে এমন মনে হয়না। কেননা তার পরেও একই ব্যবস্থা চলেছে – এখন ভাবা হচ্ছে যে এটা আবার রিভিউ করা হবে।

কিন্ত এই যে বসিয়ে বসিয়ে অর্থ দেয়া তা যে জনগণের অর্থ তা নিয়ে কোনও সংশয়ের কারণ নেই। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ গত ১৮ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদে জানিয়েছিলেন, ‘গত ১০ বছরে সরকার বিদ্যুৎখাতে ভর্তুকি দিয়েছে ৫২ হাজার ২৬০ কোটি টাকা।‘ প্রথম আলো’র প্রতিবেদনে সেই কথা উল্লেখ করা বলা হয়েছে “ভর্তুকির টাকা গেছে ব্যবসায়ীদের অলস বিদ্যুৎকেন্দ্রের পেছনে। আর বিদ্যুতের দাম বাড়িয়ে সরকার বাকি অর্থের সমন্বয় করেছে। গত ১০ বছরে সরকার সাতবার বিদ্যুতের দাম বাড়িয়েছে”। কিছু দিন আগে যে বাজেট পাশ করা হয়েছে সেখানে দেশের বিদ্যুত ও জ্বালানি খাত ২৬ হাজার ৭৫৮ কোটি টাকা বরাদ্দ পেয়েছে, এর একটা বড় অংশই যাবে ব্যক্তিখাতের ভর্তুকিতে।

জনগণ ১০ বছর ধরে তাঁদের কষ্টের আয় থেকে এই খাতে ভর্তুকি হিসেবে যা দিয়েছেন – তা তুলে দেয়া হয়েছে এই সব কুইক রেন্টালের মালিকদের হাতে। শুধু কি তাই – তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিদ্যুতের বিল। তার মানে প্রত্যেকটি নাগরিক দুই দফায় এই সব কুইক রেন্টালের মালিকদের পকেটে টাকা দিতে বাধ্য হয়েছেন। সেই টাকা কোথায় গেছে তার হদিশ কে করবেন? এরই মধ্যে ২৩ জুন সংসদে উত্থাপিত হয়েছে এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (সংশোধন) বিল-২০২০। এতে ব্যবস্থা রাখা হয়েছে বছরে একাধিকবার বিদ্যুৎ-জ্বালানির দাম পরিবর্তনের সুযোগ।

এই যে গত দশ বছরের হিসেব, কিংবা সরকারের দেয়া ছয় বছরের হিসেব, তা ঘটেছে যখন দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্যে সুন্দরবন ধ্বংস করে রামপালে বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মানের কাজ চলছে। মাস্টার প্ল্যান রিভিউ হবে বলা হচ্ছে। সেখানে যেসব প্রাক্কলন করা হয়েছিলো তাঁর মধ্যে যে গুলো ভুল প্রমানিত হয়েছে সেগুলোর দিকে তাকিয়ে কি এই প্রকল্পের কথা পুনর্বিবেচনা করা হবে?

এতো গেলো ভবিষ্যতের কথা। ইতিমধ্যেই সরকারের এই সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ দিচ্ছেন অনেকে। একে মন্দের ভালো বলেই তাঁদের এই সাধুবাদ। আগে শুনলে আরো ভাল হত — তাঁদের এই কথার সঙ্গে একমত। কিন্ত আমার প্রশ্ন এই যে, গত এক দশক ধরে জনগণের অর্থের অপচয় হল, জনগণের অর্থের যে অবারিত লুণ্ঠন হল তার কী হবে – এর দায়িত্ব কেউ নেবেন না? এর কোনও জবাবদিহি হবেনা? জনগণের কাছে জবাবদিহির ব্যবস্থাহীন শাসনের এটা হচ্ছে একটা রূপ। এতো মাত্র একটি খাতের কথা, অন্যগুলোর কথা না হয় এখন বাদ থাকুক। সরকারের বোধোদয় হয়েছে এতে আনন্দিত না হয়ে জবাবদিহির দাবি তোলাই জরুরি কাজ।

লেখক: ডিসটিংগুইশড অধ্যাপক, সরকার ও রাাজনীতি বিভাগ, ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটি, যুক্তরাষ্ট্র।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

error: Content is protected !!