চা বিক্রি করে যেভাবে লাখপতি নিপা

মনে মনে চাকরির পাশাপাশি স্বপ্ন ছিল উদ্যোক্তা হওয়ার। আর নিজের পরিচয়টা যেন হাজারও মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। ইচ্ছে থাকলে যে ছোট কিছু দিয়ে শুরু করে বড় হওয়া যায়, সবার মুখ উজ্জ্বল করা যায়, তার জ্বলজ্বলে উদাহরণ জান্নাতুল ফেরদৌস নিপা। কঠোর পরিশ্রম, পণ্য নিয়ে পড়াশোনা আর একাগ্রতায় সফল হয়েছেন তিনি।

নিপা শুধু চা বিক্রি করেই আজ লাখপতি। গর্ব করে বলেন, চ্যালেঞ্জ নিয়ে এগিয়ে যেতে পারলে বড় হওয়া কোনো বিষয় নয়। শুধু চা বিক্রি করে যে সফল হওয়া যায়, অনেকেই তা বিশ্বাস করতে পারেননি; তিনি পেরেছিলেন।

জান্নাতুল ফেরদৌস নিপা এখন ব্যস্ত তাঁর জান্নাত টি ভ্যালির কার্যক্রম নিয়ে। পাশাপাশি জব এবং অনলাইনে বিভিন্ন ধরনের প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন। চা পাতা নিয়েই মূলত তাঁর উদ্যোগ। ২০১৮ সাল থেকে অফলাইনে কাজ করছিলেন আর অনলাইনে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শুরু করেন ২০১৯ সাল থেকে। ব্যতিক্রমী দেশীয় অনেক ফ্লেবারের চা পাতা নিয়ে জানতে পেরে সবাই খুব আগ্রহী হয়। তিনি জানান, হোল লিফ অর্থোডক্স গ্রিন টি নিয়ে খুব কম মানুষ কাজ করত। তিনি কনটেন্টগুলোতে চায়ের প্রক্রিয়া ও উপকারিতার বিশদ বর্ণনা করেন। মানুষ এতে আরো আগ্রহী হয়ে ওঠে।

অবশ্য জান্নাতুল ফেরদৌস নিপা নারী উদ্যোক্তাদের প্ল্যাটফর্ম উই-এর (উইমেন অ্যান্ড ই-কমার্স ফোরাম—উই) প্রতিষ্ঠাতা নাসিমা আক্তার নিশাকে ধন্যবাদ দিতে চান। উই-এর কারণেই তিনি উদ্যোক্তা হওয়ার যাত্রা শুরু করতে পেরেছিলেন। নিপা জানান, করোনাকালে নারী উদ্যোক্তাদের মানসিক শক্তি জুগিয়েছে উই। যখন অনেকেই তাদের সংসার নিয়ে দিশেহারা ছিল, তখন উই গ্রুপে সক্রিয় থেকে তারা লাখ টাকা বিক্রি করেছে এবং সংসারের হাল ধরেছে। নিপার ভাষ্যে, ‘আমি নিজে তিন মাস বাসায় ছিলাম লকডাউনের কারণে। তখন আমিও উই-এর মাধ্যমে নেটওয়ার্ক তৈরি করে আমার উদ্যোগকে কাজে লাগাই। উই আমাদের মতো ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাকে সারা বিশ্বের কাছে তুলে ধরেছে।’

তো, উদ্যোক্তা হয়ে কেমন লাগছে? জান্নাতুল ফেরদৌস নিপা বলেন, ‘একজন নারীর জন্য উদ্যোক্তা হয়ে ওঠা অনেক গর্বের। আমি দীর্ঘ নয় বছর বেসরকারি চাকরি করেছি। সব সময়ই চাইতাম নিজের আলাদা একটা পরিচয় হোক। সবাই নামে আমাকে চিনবে, জানবে। আজ আমার উদ্যোগের নামে অনেকেই আমাকে চেনে, এটা অনেক গর্বের। মূলত উই গ্রুপের গ্রামাঞ্চলের নারী উদ্যোক্তারাই আমার প্রধান অনুপ্রেরণা। শত বাধা অতিক্রম করে তারা কাজ করত, সেটা দেখেই আমি নতুন করে কিছু করার অনুপ্রেরণা পাই।’

নিপা জানান, তাঁর পরিবার শতভাগ সহায়তা করেছে সব সময়। স্বামীর উৎসাহে উদ্যোগ গ্রহণ করেন। তাঁর মা তাঁকে সব কাজেই উৎসাহ দিয়ে এসেছেন প্রথম থেকে। আর তিন বছরের যমজ মেয়ে তাঁর সাহস। শ্বশুরবাড়ির মানুষও আন্তরিকতা দেখিয়েছে সব সময়।

নিপার উদ্যোক্তা হওয়ার জার্নিটা শুরু হয়েছে উই গ্রুপের মাধ্যমে। উই-এর উপদেষ্টা রাজিব আহমেদের অনুপ্রেরণামূলক পোস্ট থেকে। পণ্য সম্পর্কে জানার প্রয়োজনীয়তা তাঁকে নতুন করে মনোবল বাড়ায়। নিপার মতে, ‘কোনো পণ্য নিয়ে কাজ শুরু করলেই সফল হওয়া যায় না, যদি সঠিক নির্দেশনা না থাকে। আমি গাইডলাইন পেয়েছি উই থেকে। উই গ্রুপ থেকে পাওয়া বিভিন্ন ফ্রি ট্রেনিং আমাকে দক্ষ করেছে প্রতিদিন। উই গ্রুপের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার কারণে আজ একটা বিশাল নেটওয়ার্ক। আমাকে চেনে, আমার উদ্যোগের নাম জানে। এমনকি আমার ৮০ ভাগ ক্রেতাই উই থেকে পাওয়া। তাই এটা কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্বীকার করছি, উই গ্রুপের কারণে আমার জার্নিটা অনেক সহজ হয়েছে।’

নিপা মূলত চা নিয়ে কাজ করতে ভালোবাসেন। ব্ল্যাক টি গোল্ড, র গ্রিন টি, উলং গ্রিন টি, রোজ টি, হোয়াইট টি, উইন্ডি গ্রিন টি, গাবা গ্রিন টি, তুলসি গ্রিন টি, মাসালা টিসহ অনেক ধরনের চা পাতা নিয়ে তাঁর উদ্যোগ।

নিপার অনলাইনে চা বিক্রি শুরু হয়েছে ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে। এ পর্যন্ত উই গ্রুপের মাধ্যমে আড়াই লাখ টাকার চা বিক্রি করেছেন। এ ছাড়া তাঁর বিজনেস পেজেও (https://www.facebook.com/Jannatteavalley/) বিক্রি রয়েছে। নিপা অল্প পরিমাণে চা পাতা সংগ্রহ করেন। যেন মান ভালো থাকতে থাকতে ক্রেতার হাতে তুলে দিতে পারেন। এ ছাড়া অ্যালুমিনিয়ামের প্যাকেট এবং জারগুলোতে চা পাতা সংরক্ষণ করা হয়। এর ফলে চা পাতা মিনিমাম এক বছর পর্যন্ত খুবই ভালো থাকে এবং গুণগত মান অক্ষুণ্ণ রাখে।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী নিপার? বললেন, ‘চা একটি রয়েল প্রোডাক্ট। তাই এই পণ্যের প্রতি ভালোবাসা থেকে কাজ শুরু করি। আমি সবাইকে গ্রিন টি সম্পর্কে জানাতে চাই, যেন হেলদি পানীয় পানে আগ্রহ তৈরি হয়। আমাদের দেশেও এত রকমের চা পাতা উৎপাদন করা হয়, সেটা অনেকে জানেনই না। আমি তাঁদের কাছে তুলে ধরতে চাই এর গুণাগুণ। এ ছাড়া স্বপ্ন দেখি, একদিন জান্নাত টি ভ্যালি একটি গুণগত মানসম্পন্ন চা পাতার ব্র্যান্ড হবে। দেশের বাইরেও রপ্তানি হবে। আমার উদ্যোগে অনেক মানুষের কর্মসংস্থান হবে, সে লক্ষ্যে পরিকল্পনা করে এগোচ্ছি।’

উদ্যোক্তা-জীবনে অনেক মধুর স্মৃতি জান্নাতুল ফেরদৌস নিপার। ২০২০ সালের ২৬ জুন তিনি উই গ্রুপে এক লাখ টাকা বিক্রির যাত্রায় শামিল হন। রাত ১১টা থেকে ৩টা পর্যন্ত টানটান উত্তেজনা কাজ করছিল। অনেক সদস্য তাঁকে সাপোর্ট দিয়েছিলেন, উৎসাহ দিয়েছিলেন এবং তাঁর পণ্য কিনে লাখপতি বানিয়েছিলেন। এটা মধুর স্মৃতি হয়ে থাকবে তাঁর সারা জীবন। এত মানুষের ভালোবাসা পেয়ে তিনি কান্না করে দিয়েছিলেন। নিপার ভাষ্যে, ‘আমি এখনো নিজেকে সফল মনে করি না। কারণ, এখনো আমি নিজেকে তৈরি করছি উদ্যোক্তা হিসেবে। তবে এ পর্যন্ত যতটুকু এসেছি, প্রথমত আমার পরিবার, উই গ্রুপ, ডিএসবির (ডিজিটাল স্কিলস ফর বাংলাদেশ) প্রতিষ্ঠাতা রাজিব আহমেদ স্যারের ভূমিকা স্বীকার করি।’

ক্রেতারা কেন নিপার পণ্য কিনবেন? এ উদ্যোক্তার উত্তর, ‘একজন ক্রেতা তার কাছ থেকেই কিনতে স্বস্তিবোধ করে, যে বিক্রেতার প্রোডাক্ট নলেজ ভালো। আমি আমার ক্রেতাকে যেকোনো ধরনের চা পাতা নিয়েই ডিটেইলস ধারণা দিয়ে থাকি। এমনকি চা কীভাবে বানাবে, কতবার খাবে, কখন খেলে বেশি উপকার পাবে, সেটাও জানিয়ে দিই। অর্থোডক্স গ্রিন টি সম্পর্কে দীর্ঘদিন পড়াশোনা করার কারণে আমি ভালো মানের চা পাতাও কালেক্ট করে থাকি এবং সংরক্ষণ করি। তাই আমি এখন পর্যন্ত ক্রেতাদের ভালো সাপোর্ট পেয়েছি। এ জন্য বিশ্বাস করি, ক্রেতারা আমার পণ্যের ওপর আস্থা রাখতে পারবে নিশ্চিন্তে।’

দেশের বেকার সমস্যা নিরসনে নিপার পরামর্শ, ‘প্রত্যেক তরুণ-তরুণীকে নিজের ব্যক্তিগত ভালোলাগার জিনিসটি খুঁজে বের করে সেটা সম্পর্কে পড়াশোনা করতে হবে। নিজেকে ওই বিষয়ে দক্ষ করে গড়ে তুলতে হবে। বিভিন্ন উৎপাদনমুখী কাজে নিজেকে সম্পৃক্ত করতে হবে। এতে করে কোনো একটি পণ্য নিয়ে উদ্যোগ গ্রহণ করতে সুবিধা হবে। মিনিমাম কোনো পণ্য নিয়ে এক বছর আইডিয়া নিতে হবে। সরকার এখন বিভিন্ন খাতে সাহায্য করছে। উই-এর মতো প্ল্যাটফর্মগুলো এগিয়ে এসেছে। এখন শুধু নিজেকে দক্ষ করে তুলতে ফোকাস করতে হবে। তাহলে নিজ উদ্যোগে সবাই হবে স্বাবলম্বী। চীনের মতো প্রতি ঘরে উদ্যোক্তা তৈরি হবে এবং বেকার সমস্যাও শেষ হবে।’

নিপার শেষ পরামর্শ, প্রত্যেককে কাজের প্রতি শতভাগ মনোযোগী হতে হবে। তাহলে সাফল্য আপনিই এসে ধরা দেবে।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

error: Content is protected !!