গালওয়ানসহ পূর্ব লাদাখে কি কার্গিলেরই ছায়া ?

ডেস্ক রিপোর্ট:

লাদাখ সীমান্তে চীনা সৈন্যদের সাথে সংঘাতের জেরে ভারতীয় সেনাবাহিনীর ২০ জন সদস্য মারা যাওয়ার পর প্রয়োজনে সামরিক শক্তি প্রয়োগ করেও নিজেদের সীমান্ত রক্ষা করার অঙ্গীকার করেছে ভারত। 

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেছেন ভারতের সীমান্তের ভেতরে কোনো বিদেশি সৈন্য নেই এবং ভারতের সীমানার ভেতরের কোন অংশের দখলও তারা হারায়নি।

তবে হিমালয়ে বিরোধপূর্ণ সীমান্তে সংঘর্ষের পর কতজন সৈন্য হতাহত হয়েছে, সে বিষয়ে এখনো কোনো বিবৃতি দেয়নি চীন। দুই দেশের মধ্যে সীমান্তের এই এলাকা ভালভাবে চিহ্ণিত নয়। এই গালওয়ান উপত্যকার আবহাওয়া অত্যন্ত বৈরি, সেই সাথে এর অবস্থান সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে অনেক ওপরে।

শুধু গালওয়ানই নয়, পূর্ব লাদাখের বিস্তীর্ণ অংশে সক্রিয়তা ও আনাগোনা বাড়িয়েছে চীনা সেনা, চাঞ্চল্যকর এই তথ্য জানা যাচ্ছে বিভিন্ন সূত্রে৷ 

এই এলাকাগুলির মধ্যে আছে প্যাংগং লেক, হট স্প্রিং, গোগরা এবং ‘ফিঙ্গার ফোর’ থেকে ‘ফিঙ্গার এইট’ পাঁচটি উঁচু পাহাড়ি শিখর৷ শেষবার এই ঘটনা ঘটেছিল ১৯৬২ সালে৷ এ বারের চীনা সেনা আনাগোনার সঙ্গে ১৯৯৯ সালে কার্গিল যুদ্ধের আগে বিস্তীর্ণ এলাকায় পাক সেনার অনুপ্রবেশের মিল খুঁজে পাচ্ছেন অনেকেই৷

২১ বছর আগে পাক সেনা যখন নিয়ন্ত্রণ রেখা পেরিয়ে ভারতে প্রবেশ করেছিল, সেই সময়ে ভারতীয় সেনার ‘উইন্টার ডিসপোজ়িশন্স’ পর্ব চলছিল৷ অর্থাৎ প্রচণ্ড বরফ পড়ে এমন পাহাড়ি শৃঙ্গগুলি ছেড়ে অপেক্ষাকৃত নিচু জায়গায় নেমে এসেছিল ভারতীয় সেনা৷ অপেক্ষাকৃত দুর্বল নজরদারির সুযোগে সেই প্রচণ্ড শীতেই নিয়ন্ত্রণ রেখা পেরিয়ে ভারতে প্রবেশ করে পাক সেনা৷ স্থানীয় মেষপালকরা৷ ভারতীয় সেনাবাহিনীকে জানায় টোলোলিং, টাইগার হিল, দ্রাস ও বাটালিকের মতো জায়গায় পাহাড়ের মাথায় বসে আছে পাকিস্তানি সেনা৷ এর পরের ঘটনা সবার জানা৷ এখানেই প্রশ্ন, গালওয়ান-সহ পূর্ব লাদাখে কি কার্গিলেরই ছায়া দেখা যাচ্ছে?

গালওয়ানের সেনা সংঘর্ষের ঘটনার পরে বিভিন্ন সূত্রে দাবি করা হচ্ছে, চীনা সেনাও এ ভাবেই নাকি ভারতীয় ভূখণ্ডের কাছাকাছি চলে এসেছে। এখানেও ‘উইন্টার ডিসপোজ়িশন্স’-এর সুযোগ নিয়েছে চীনা সেনা৷ প্রবল ঠান্ডায় বরফ ঢাকা শৃঙ্গের ফরোয়ার্ড বেস ছেড়ে ভারতীয় সেনা যখন নীচে নেমে এসেছে, তখনই নিয়ন্ত্রণ রেখা পেরিয়ে ‘ফিঙ্গার ফোর’ থেকে ‘ফিঙ্গার এইট’ পর্যন্ত বিস্তৃত পাঁচটি ‘রিজ লাইন’-এ উঠে পড়েছে চীনা সেনা, দাবি করা হচ্ছে বিভিন্ন সূত্রে৷ 

এই ‘রিজ লাইন’ বা পাহাড়ি শিখরগুলি এতটাই গুরুত্বপূর্ণ স্ট্র্যাটেজিক লোকেশনে অবস্থিত যে, একবার এর উপরে উঠে পড়তে পারলে নীচে উপত্যকায় নজরদারি চালাতে কোনও অসুবিধেই হবে না৷

একটি সূত্রে দাবি, চীন প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ রেখার ওপারে অবস্থিত ‘সারজিপ’ থেকে নিজেদের বেস ক্যাম্প তুলে নিয়ে এসেছে ফিঙ্গার ফোরের খুব কাছে তাঁবুও ফেলেছে সেখানে৷ এই তাঁবু পোড়ানো নিয়েই ১৫ জুন অশান্ত হয়ে ওঠে গালওয়ান৷ ফিঙ্গার ফোর থেকে ফিঙ্গার ফাইভের মধ্যে ৬২টি চীনা ‘পজিশন’ দেখা গেছে বলেও একটি সূত্রে দাবি করা হচ্ছে৷ 

এর মধ্যে আছে রাস্তা ও অস্থায়ী ক্যাম্পও৷ প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ রেখার কাছাকাছি ভারতীয় ভূখণ্ডের খুব কাছে বেশ কিছু নির্মাণকাজও করেছে চীনা সেনা, অভিযোগ করেছেন প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞরা৷ 

সেনা সূত্রে জানা গেছে, ফিঙ্গার ফোর থেকে ফিঙ্গার এইট পর্যন্ত এলাকায় বিগত কয়েক মাস ধরেই প্রাত্যহিক প্যাট্রোলিং করার সময় ভারতীয় সেনাকে বাধা দিয়েছে চীনা সেনা৷

তারপরেও কেন চুপ করে ছিল ভারতীয় সেনা বা কেন্দ্রীয় সরকার? প্রশ্ন তুলেছেন কংগ্রেস সাংসদ রাহুল গান্ধী৷ 

তাঁর অভিযোগ, গালওয়ানের চীনা হামলা পরিকল্পিত৷ ভারত সরকার প্রথমে ঘুমিয়ে ছিল এবং সমস্যাটা অস্বীকার করেছে৷ এর মূল্য চুকিয়েছেন আমাদের শহিদ জওয়ানরা৷

এই পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠছে ‘ফিঙ্গার ফোর’ থেকে ফিঙ্গার এইট পর্যন্ত এলাকার ভবিষ্যত নিয়ে৷ প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞ ও ভারতীয় সেনার অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল উৎপল ভট্টাচার্য দীর্ঘদিন গালওয়ান সংলগ্ন এই এলাকায় কর্তব্যরত ছিলেন৷ 

তাঁর মতে, আমি আশাবাদী, যে ১৯৬২ সালের যুদ্ধের মতো ঘটনা ঘটবে না, যেখানে আকসাই চীন আমাদের হাতছাড়া হয়েছিল। এবার পরস্পরের মুখোমুখি দাঁড়ানো শক্তিধর দু’দেশের সেনার মধ্যে যুদ্ধ হওয়ার সম্ভাবনা কম৷ এই পরিস্থিতিতে কূটনৈতিক ও সামরিক দুটি স্তরের আলোচনাতেই বরফ গলবে। এই সময়।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

error: Content is protected !!