গণধর্ষণের রোমহর্ষক জবানবন্দি তরুণীর: হাতে-পায়ে ধরলেও ধর্ষকদের মন গলেনি

সিলেট এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে গণধর্ষণের রোমহর্ষক ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন ধর্ষিতা গৃহবধূ। রোববার (২৮ সেপ্টেম্বর) বেলা দেড়টার দিকে সিলেট মহানগর হাকিম তৃতীয় আদালতের বিচারক শারমিন খানম নীলা তার জবানবন্দি রেকর্ড করেন। জবানবন্দিতে ধর্ষিতা ক্যাম্পাস থেকে স্বামীসহ তাকে তুলে নেওয়া, ছাত্রাবাসে তার স্বামীকে আটকে রাখা এবং গাড়ির ভিতর একের পর এক ধর্ষণের ঘটনার বর্ণনা দেন তিনি। বর্বর এই ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে ওই গৃহবধূ বারবার কান্নায় ভেঙে পড়ছিলেন বলে জানা গেছে।

এ সময় ওই বধূ সম্ভ্রম রক্ষায় তাদের হাতে-পায়ে ধরে আকুতি জানিয়েছিলেন। কিন্তু মন গলেনি ধর্ষকদের। জোরপূর্বক ছিনিয়ে নিয়ে একের পর এক ধর্ষণ করে। আলোচিত এ মামলার তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো কাছে এই তথ্য জানিয়েছেন। ধর্ষিতা বধূ জানান, তাদের বিয়ে বেশিদিন হয়নি। কয়েক মাস হবে।

এরই মধ্যে স্বামীকে নিয়ে তিনি শুক্রবার বেড়াতে যান এমসি কলেজে। বিকালেই তারা এমসির ক্যাম্পাসে গিয়ে ঢুকেন। সেখানে স্বামীকে নিয়ে ক্যাম্পাসের নানা জায়গায় ঘুরেন। তারা ক্যাম্পাস ঘুরে সন্ধ্যার পর পেছন দিক দিয়ে এমসি কলেজ থেকে বের হন। এমন সময় ক্যাম্পাসের পেছনের এলাকায় ধর্ষকরা অবস্থান নিয়েছিলো। তারা তাদের দেখতে পেয়ে ঘিরে ধরে। এক পর্যায়ে তারা অস্ত্রের মুখে স্বর্ণের চেইন, টাকা পয়সা ছিনিয়ে নেয়। যাওয়ার সময় এক ধর্ষক বলে উঠে- ‘দেখ মেয়েটি তো সুন্দর’। এ কথা বলার পর অন্যরাও তার দিকে ফিরে তাকায়। এরপর তারা ঘুরে এসে জাপটে ধরে বধূটিকে। এতে প্রতিবাদ করেন সঙ্গে থাকা স্বামী। ধর্ষকরা এ সময় তার স্বামীকে মারধর শুরু করে বধূকে ছিনিয়ে নিয়ে যায়। এ সময়ও চিৎকার করছিলেন তিনি। ধর্ষকরা তাকে যখন ধরে নিয়ে যাচ্ছিলো তখন পিছু পিছু যান স্বামী। তিনি গিয়ে এমসি কলেজের হোস্টেলে ঢুকেন। ধর্ষকরা তাকে ধরে নিয়ে যাওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যে স্বামী গিয়ে তাদের বাধা দেন। ছাত্রাবাসের ভেতরেই তার স্বামীকে মারধর করে। এক পর্যায়ে তাকে বেঁধে ফেলে। ওই বধূ জানান, স্বামীকে বেঁধে তারা তার ওপর নির্যাতন করে। এ সময় তিনি সম্ভ্রম রক্ষার্থে তাদের হাতে-পায়ে ধরেন। কিন্তু এতে মন গলেনি ধর্ষকদের। এ সময় চিৎকার করলেও কেউ এগিয়ে আসেনি। দু’তলা থেকে কয়েকজন যুবক নিচে নামতে চাইছিলো। এ সময় তাদের ধমক দিয়ে আটকে দেয়া হয়। পরে পুলিশ গেলে ধর্ষকরা পালিয়ে যায়।

শুক্রবার রাত ৯টার দিকে ছাত্রলীগের সাবেক নেতা বাবলাকে নিয়ে শাহপরান থানার ওসি ধর্ষিতা বধূ ও তার স্বামীকে এমসির ছাত্রাবাস থেকে উদ্ধার করে। খবর পেয়ে সেখানে আরো কয়েকজন ছাত্রনেতা যান। উদ্ধারের পর ওই বধূকে সিলেটের ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওসিসিতে ভর্তি করা হয়। হাসপাতালে ডাক্তারদের বিশেষ টিমের তত্ত্বাবধানে তার চিকিৎসা করা হয়। চিকিৎসা শেষে গতকাল রোববার দুপুর সাড়ে ১২টায় মামলার তদন্ত কর্মকর্তা, শাহপরান থানার ওসি ইন্দ্রনীল ভট্টাচার্য তাকে সিলেটের আদালতে নিয়ে আসেন। মহানগর তৃতীয় আদালতের বিচারক শারমিন খানম নীলার আদালতে নির্যাতিত ওই বধূ জবানবন্দি দেন। প্রায় ২ ঘণ্টা ২০ মিনিট আদালত তার জবানবন্দি গ্রহণ করেন। জবানবন্দি থেকে নির্যাতিত ওই মহিলাকে পরিবারের জিম্মায় দেয়া হয়েছে। তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, আদালতে নির্যাতিতা নারী তার ওপর চলা নির্যাতনের মর্মান্তিক ঘটনা জানিয়েছেন। এদিকে শুক্রবার ঘটনার খবর পেয়ে এমসির ছাত্রাবাসে ছুটে গিয়েছিলেন সাবেক এক ছাত্রনেতা। তিনি গতকাল মানবজমিনকে জানিয়েছেন, তারা গিয়ে নির্যাতিত ওই বধূ ও তার স্বামীকে ছাত্রাবাসে পেয়েছেন। এ সময় সেখানে পুলিশও ছিল। তাদের মুখে বর্ণনা শুনে কারা এসব ঘটনা ঘটিয়েছে এ তথ্য উদ্‌ঘাটনে সবাই সোচ্চার হন। তাৎক্ষণিক ধর্ষিতা ও স্বামীর মুখে বর্ণনা শুনে তারা ধর্ষকদের পরিচয় বের করেন। এ সময় ফেসবুক আইডি থেকে তাদের ছবি বের করা হয়। পরে ধর্ষিতা ও তার স্বামী ওই ধর্ষকদের শনাক্ত করেন। তিনি জানান, ঘটনার পর পুলিশ ওই বধূকে উদ্ধার করে সিএনজি অটোরিকশাতে বসিয়ে রাখে। তাৎক্ষণিক শাহপরান থানার ওসিসহ সাবেক ছাত্রনেতারা হোস্টেলে যান। গিয়ে অভিযান চালান। ওই সময় কাউকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। সবাই ছাত্রাবাস ছেড়ে পালিয়ে যায়। ওই সময় নির্যাতিত বধূর স্বামী পুলিশকে জানিয়েছিলেন- তারা সদ্য বিবাহিত। তারা বিয়ে করলেও পারিবারিক ভাবে এখনো তাদের বিয়ে মেনে নেয়া হয়নি। এ কারণে তারা আলাদা বসবাস করছেন। স্বামী সৌদি আরবে বসবাস করতেন। ওখানে থাকা অবস্থায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাদের পরিচয় হয়েছিলো। এরপর দেশে আসার পর তাদের বিয়ে হয়। নির্যাতিতার স্বামীর বাড়ি সিলেট শহরতলীর শিববাড়ি এলাকায় ও স্ত্রীর বাড়ি সিলেটের বালাগঞ্জ উপজেলায় বলে পুলিশ জানায়।

অবৈধভাবে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে দেশ ছেড়ে পালাচ্ছিলেন দুই ধর্ষক এম সাইফুর রহমান ও অর্জুন লস্কর। একজন সুনামগঞ্জ ছাতকের সুরমা নদী পাড়ি দিয়ে সীমান্তের বেশ কাছাকাছি পৌঁছেছিলেন। অপরজন হবিগঞ্জ মাধবপুরের সীমান্তবর্তী গ্রাম মনতলায় ঘাপটি মেরে বসেছিলেন নির্ধারিত সময়ের অপেক্ষায়। কিন্তু তাদের সেই সীমান্ত পাড়ি দেওয়া হয়নি। পুলিশের দল সময়মতো ঠিকই পৌঁছে যায় তাদের ডেরায়। সিলেটের এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে স্বামীকে বেঁধে স্ত্রীকে গণধর্ষণের ঘটনার অন্যতম দুই নায়ক ছাত্রলীগের এই দুই ক্যাডার সাইফুর এবং অর্জুনকে গতকাল এভাবেই গ্রেফতার করে পুলিশ। পুলিশ জানিয়েছে, তারা দুজনই অবৈধভাবে সীমান্ত অতিক্রম করে ভারত যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন। এ ছাড়া এদিন সন্ধ্যায় হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জ থেকে আরও দুই আসামিকে গ্রেফতার করেছে র‌্যাব ও পুলিশ। তারা হলেন- শাহ মাহবুবুর রহমান রনি ও রবিউল ইসলাম। মামলার এজাহারনামীয় বাকি দুই আসামি এখনো পলাতক রয়েছেন। এদিকে গতকাল আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন ধর্ষিতা। ধর্ষণের ঘটনার প্রতিবাদে সিলেটজুড়ে এদিনও বিক্ষোভ হয়েছে। ধর্ষকসহ সব ধরনের বখাটের বিরুদ্ধে ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন সিটি মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী।

নদী পারাপারের সময় ধরা পড়েন সাইফুর : দাড়ি কেটে নিজের চেহারায় পরিবর্তন আনেন গণধর্ষণের মূলহোতা সাইফুর রহমান। গতকাল সকালে সুনামগঞ্জের ছাতক বাজার দিয়ে সুরমা নদী পার হয়ে নোয়ারাই পৌঁছান তিনি। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি তার। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে সেখানে ওতপেতে ছিল ছাতক থানার এসআই হাবিবুর রহমানের নেতৃত্বে পুলিশের একটি দল। নোয়ারাই পৌঁছার পর পুলিশ সাইফুরকে গ্রেফতার করে। কিন্তু দাড়ি কেটে চেহারায় পরিবর্তন আনায় সাইফুরের পরিচয় নিয়ে বিপাকে পড়ে পুলিশ। শুরুতে সাইফুরও পুলিশকে বিভ্রান্ত করে। পরে থানায় এনে জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে সাইফুর তার নিজের পরিচয় দিয়ে বলেন, তিনি ধর্ষক সাইফুর। পরে তাকে সিলেটের শাহপরান থানা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়। সাইফুর রহমান সিলেটের বালাগঞ্জ উপজেলার চান্দাইপাড়ার তাহিদ মিয়ার ছেলে। এমসি কলেজে পড়ালেখা শেষ হলেও তিনি ছাত্রাবাসের নতুন ভবনের ২০৫ নম্বর কক্ষ ও হোস্টেল সুপারের বাংলো দখল করে থাকতেন। পুলিশের জেরায় সাইফুর জানিয়েছেন, ছাতকে সুরমা নদী পাড়ি দিয়ে নোয়ারাই হয়ে প্রথমে বাংলাবাজার ও পরে সেখান থেকে দোয়ারাবাজার সীমান্ত দিয়ে ভারতে পালানোর পরিকল্পনা ছিল তার। কিন্তু পরিকল্পনা বাস্তবায়নের আগেই পুলিশের হাতে ধরা পড়তে হয় তাকে।
ভারত সীমান্তের কাছাকাছি অবস্থান করছিলেন অর্জুন : গতকাল ভোর সাড়ে ৫টার দিকে সীমান্ত পাড়ি দেওয়ার প্রস্তুতি নেওয়ার সময় সিলেট জেলা গোয়েন্দা পুলিশের একটি দল তাকে গ্রেফতার করে। অর্জুন লস্কর সিলেটের জকিগঞ্জ উপজেলার আটগ্রামের কানু লস্করের ছেলে। তিনি এমসি কলেজ ক্যাম্পাসের পাশর্^বর্তী রাজপাড়ায় একটি ভাড়া বাসায় থাকতেন। পুলিশ জানায়, গণধর্ষণের ঘটনার পরই সিলেট থেকে পালিয়ে যান মামলার ৪ নম্বর আসামি অর্জুন লস্কর। আশ্রয় নেন হবিগঞ্জ জেলার মাধবপুর উপজেলার মনতলা দুর্লভপুর সীমান্ত এলাকায় এক আত্মীয়ের বাড়িতে। সেখানে তিনি অপেক্ষায় ছিলেন সিগন্যালের। সিগন্যাল পেলেই তার সীমান্ত পাড়ি দেওয়ার কথা ছিল।

শায়েস্তাগঞ্জ থেকে দুই আসামি গ্রেফতার : রোববার সন্ধ্যায় হবিগঞ্জে পৃথক অভিযান চালিয়ে র‌্যাব ও পুলিশ শাহ মাহবুবুর রহমান রনি ও রবিউল ইসলামকে গ্রেফতার করেছে। তাদের মধ্যে শায়েস্তাগঞ্জ থেকে র‌্যাব-৯ এর একটি দল অভিযান চালিয়ে মামলার ৩ নম্বর আসামি শাহ মাহবুবুর রহমান রনিকে গ্রেফতার করে। আর নবীগঞ্জে পুলিশ অভিযান চালিয়ে অন্যতম আসামি রবিউল ইসলামকে গ্রেফতার করে।

এখনো অধরা দুই আসামি : এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত গণধর্ষণ মামলার এজাহারনামীয় দুই আসামি পলাতক রয়েছেন। তথ্য প্রযুক্তি ব্যবহার করেও তাদের অবস্থান শনাক্ত করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তবে তাদের গ্রেফতারে সিলেট বিভাগের সম্ভাব্য কয়েকটি স্থানে অভিযান চালিয়েছে র‌্যাব ও পুলিশ। পলাতক থাকা আসামিরা হলেন- সুনামগঞ্জ সদরের নিসর্গ-৫৭ নম্বর বাসার মৃত রফিকুল ইসলামের ছেলে তারেকুল ইসলাম তারেক, সিলেটের কানাইঘাট উপজেলার গাছবাড়ির মাহফুজুর রহমান মাসুম।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

error: Content is protected !!