December 3, 2020

মাই পেটারসন. লাইফ

ভয়েস অফ দ্যা কমিউনিটি

গণধর্ষণের প্রতিবাদে উত্তাল এমসি কলেজ: ফেসবুকে সক্রিয় ধর্ষকরা, খুঁজে পাচ্ছে না পুলিশ!

স্বামীকে আটকে রেখে সিলেট এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে এক গৃহবধূকে গণধর্ষণের ঘটনায় আন্দোলনে নেমেছেন ছাত্রলীগের নেতাকর্মী ও সাধারণ শিক্ষার্থীরা। শনিবার (২৬ সেপ্টেম্বর) দুপুর ১২টার দিকে ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত গ্রেফতারের দাবিতে ছাত্রলীগের দুই শতাধিক নেতাকর্মী ও শিক্ষার্থীরা কলেজের সামনে টায়ারে আগুন জ্বালিয়ে সিলেট-তামাবিল মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন।

সিলেটের এমসি কলেজ থেকে তুলে নিয়ে ছাত্রাবাসের একটি কক্ষে তরুণীকে গণধর্ষণের ঘটনায় ছাত্রলীগের ছয় কর্মীর নাম উঠে এসেছে। এ ঘটনায় অভিযুক্তদের ছবি ইতিমধ্যেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। এখন পর্যন্ত ধর্ষণের ঘটনায় অভিযুক্ত কাউকে আটক করা যায়নি।

তবে ফেসবুকে সরব এমসি কলেজে গণধর্ষণের আসামিরা। তারা ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে নিজেদের নির্দোষ বলে দাবি করেছেন। আজ শনিবার সকালেও ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিতে দেখা গেছে এই মামলার দুই আসামিকে। গণধর্ষণের মামলার ৫ নম্বর আসামি রবিউল ইসলাম শনিবার সকাল ১১টার দিকে ফেসবুকে লেখেন, ‘আমিএই নির্মম গণধর্ষণের সাথে জড়িত নই, আমাদের পরিবার আছে। যদি আমি এই জঘন্য কাজের সাথে জড়িত থাকি তাহলে প্রকাশ্যে আমাকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া হোক। আমাকে এবং আমার প্রাণের সংগঠন ছাত্রলীগের নামে কোনো অপপ্রচার করবেন না।’

অন্যদিকে, মামলার ৬ নম্বর আসামি মাহফুজুর রহমান মাসুম ফেসবুকে লেখেন, ‘এরকম জঘন্য কাজের সাথে আমি জড়িত না। যদি জড়িত প্রমাণ পান প্রকাশ্যে আমাকে মেরে ফেলবেন।’

ফেসবুকে সরব থাকার পরও আসামিদের গ্রেপ্তার করতে না পারা প্রসঙ্গে শাহপরাণ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কাইয়ুম চৌধুরী বলেন, ‘আমরা তাদের গ্রেপ্তারে সব ধরনের চেষ্টা চালাচ্ছি।’

জড়িতদের দ্রুত গ্রেফতারের দাবিতে কলেজের শিক্ষার্থীরা এ সময় তারা ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’, ‘শেখ হাসিনার বাংলায় ধর্ষকের স্থান নেই,’ ‘ঘাতক-ধর্ষকের ফাঁসি চাই’ বলে স্লোগান দেন। দুপুর ২টা পর্যন্ত তারা সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন। এতে নেতৃত্ব দেন এমসি কলেজ ছাত্রলীগের নেতা দেলওয়ার হোসেন, হোসাইন আহমদ, রাসেল আহমদ, শামীম আলী ও আলতাফ হোসেন মোরাদ।

শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করেন, করোনা পরিস্থিতিতে কলেজ বন্ধ থাকার পরও ছাত্রাবাস কীভাবে খোলা রাখে কলেজ কর্তৃপক্ষ। এসব অপরাধ কর্মকাণ্ডের বিষয়ে কলেজ কর্তৃপক্ষ অবগত থাকার পরও কেন ছাত্রাবাস বন্ধ করে দেয়া হলো না। আজ ঐতিহ্যবাহী বিদ্যাপীঠে কলঙ্কের দাগ লেগেছে। শিক্ষার্থীরা গণধর্ষণের ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত গ্রেফতারের দাবি জানান।

এদিকে অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে এমসি কলেজ ও ছাত্রাবাসে বিপুল সংখ্যক পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।

শুক্রবার সিলেটের এমসি কলেজে স্বামীর সঙ্গে বেড়াতে গিয়ে গণধর্ষণের শিকার হন ওই গৃহবধূ। রাত ১০টার দিকে টিলাগড় এলাকার কলেজটির ছাত্রাবাসে এ ঘটনা ঘটে। ওই গৃহবধূকে ক্যাম্পাস থেকে তুলে ছাত্রাবাসে নিয়ে ধর্ষণ করা হয় বলে পুলিশ জানিয়েছে। এ ঘটনায় ভিকটিমের স্বামী বাদী হয়ে নগরীর শাহপরাণ থানায় মামলা করেন। মামলায় ছাত্রলীগের ছয় কর্মী ও অজ্ঞাত তিনজনকে আসামি করা হয়েছে।

মামলার আসামিরা হলেন- এমসি কলেজের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী ছাত্রলীগ কর্মী সাইফুর রহমান, শাহ মাহবুবুর রহমান রনি, মাহফুজুর রহমান মাছুম, রবিউল হাসান, তারেক আহমদ ও অর্জুন। এরা সবাই আওয়ামী লীগের সাবেক যুব ও ক্রীড়া বিষয়ক সম্পাদক রঞ্জিত সরকারের অনুসারী বলে জানা গেছে।

এর আগে শুক্রবার দিবাগত রাত ২টার দিকে ছাত্রাবাসে অভিযান চালিয়ে গণধর্ণণে অভিযুক্ত ছাত্রলীগ কর্মী সাইফুর রহমানের রুম থেকে দেশি-বিদেশি অস্ত্র উদ্ধার করে পুলিশ। অভিযানে একটি বিদেশি পিস্তল, চারটি রামদা, দুটি লোহার পাইপ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় ছাত্রলীগ কর্মী সাইফুর রহমানের বিরুদ্ধে অস্ত্র আইনে আরেকটি মামলা করা হয়েছে।

গণধর্ষণের ঘটনার পর সব ছাত্রকে ছাত্রাবাস ছাড়ার নির্দেশ দিয়েছে কলেজ কর্তৃপক্ষ। শনিবার (২৭ সেপ্টেম্বর) দুপুর ১২টার মধ্যে ছাত্রাবাস ছাড়ার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

দুপুর ২টায় এমসি কলেজের হোস্টেল সুপার মো. জামাল উদ্দিন জানান, এমসি কলেজের অধ্যক্ষের আহ্বানে জরুরি বৈঠক চলছে। বৈঠকে পরবর্তী করণীয় নির্ধারণ করা হবে।

সিলেটে গণধর্ষণের ঘটনায় তদন্ত কমিটি: সিলেটের এমসি কলেজের ছাত্রাবাসে স্বামীকে আটকে রেখে নববধূকে গণধর্ষণের ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন করেছে কলেজ কর্তৃপক্ষ। কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক সালেহ আহমদ তদন্ত কমিটি গঠনের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

শনিবার (২৬ সেপ্টেম্বর) বিকেলে অধ্যক্ষ জানান, তদন্ত কমিটির প্রধান করা হয়েছে গণিত বিভাগের প্রধান অধ্যাপক আনোয়ার হোসেন চৌধুরীকে। তিন সদস্যের এ কমিটির অপর দুই সদস্য হলেন- রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক জীবন কৃষ্ণ (হোস্টেল সুপার শ্রীকান্ত ব্লক) ও অপর হোস্টেল সুপার জামাল উদ্দিন। কমিটিকে এক সপ্তাহের মধ্যে রিপোর্ট জমা দিতে বলা হয়েছে।

কলেজ অধ্যক্ষ সালেহ আহমদ আরও জানান, ধর্ষকদের ছাত্রত্ব বাতিলসহ প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে সুপারিশ পাঠানো হবে।

অপরদিকে দায়িত্ব অবহেলার অভিযোগে কলেজের প্রধান ফটকের দারোয়ান রাসেল মিয়া ও চৌকিদার সবুজ আহমদ রুহানকে সাসপেন্ড করা হয়েছে।

এমসি কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর সালেহ আহমদ এ তথ্য নিশ্চিত করে বলেন, কলেজের একাডেমিক কাউন্সিলের সভায় এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।

ধর্ষকদের ছাত্রত্ব বাতিলের ব্যাপার পদক্ষেপ নেয়ার কথা জানান কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক সালেহ আহমদ।

এর আগে শুক্রবার (২৫ সেপ্টেম্বর) রাত সাড়ে ৯টার দিকে কলেজ ছাত্রাবাসে এ ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। অভিযুক্ত ধর্ষকরা ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। স্বামীকে নিয়ে সন্ধ্যায় এমসি কলেজে গিয়েছিলেন ওই গৃহবধূ। এ সময় কলেজ ক্যাম্পাস থেকে ৫-৬ জন ছাত্রলীগ নেতাকর্মী তাদের জোর করে ছাত্রাবাসে নিয়ে যায়। এরপর স্বামীকে আটকে রেখে গৃহবধূকে দলবেঁধে ধর্ষণ করে। পরে উদ্ধার করে ওই তরুণীকে সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করে পুলিশ। এ ঘটনায় থানায় মামলা হয়েছে।

২০০৯ সালে ছাত্রলীগের এমসি কলেজ কমিটি ঘোষণার পর আর কোনো কমিটি হয়নি। কিন্তু ক্যাম্পাস নিয়ন্ত্রণ করছে ছাত্রলীগের দুটি গ্রুপ। পদপদবী ছাড়াও একেক জন ক্যাডারে পরিণত হয়ে চাঁদাবাজি, খুন, গুম, রাহাজানি এবং সর্বশেষ শুক্রবার ক্যাম্পাসে বেড়াতে আসা এক তরুণীকে তুলে নিয়ে ছাত্রবাসে গণধর্ষণ করে। ২০১২ সালে এমসি কলেজের ছাত্রবাসের একটি ব্লক আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দিয়েছিলো ছাত্রলীগ।

error: Content is protected !!