December 4, 2020

মাই পেটারসন. লাইফ

ভয়েস অফ দ্যা কমিউনিটি

খাল নেই; সেতুও নেই অথচ মেরামতে ৪৬ কোটি টাকার দরপত্র, তদন্ত শুরু

শুধুই রয়েছে বাঁশের সাঁকো, সেখানে কোন খাল নেই, সেতুও নেই। এসব সাঁকোর স্থলে গায়েবি লোহার সেতু দেখিয়ে সেগুলো মেরামতের জন্য দরপত্র আহ্বান করেছেন বরগুনার স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী ফোরকান আহমেদ খান। গত ২৮ জুলাই বরগুনার আমতলী ও তালতলী উপজেলায় প্রায় ৪৬ কোটি টাকা ব্যয়ে ৮টি প্যাকেজে ৩৩টি লোহার সেতু মেরামতের জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়। বিষয়টি ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়লে বিতর্কিত দরপত্র বাতিল করা হয়েছে। বর্তমানে এ ঘটনায় তদন্ত চলছে।

বরগুনা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর ২০২০-২১ অর্থবছরে দেশের আয়রন ব্রিজ পুননির্মাণ প্রকল্পের (আইবিআরপি) আওতায় এ দরপত্র আহ্বান করে। গায়েবি সেতুর মধ্যে ২৫টি আমতলী উপজেলার হলদিয়া, গুলিশাখালী ও আমতলী ইউনিয়নে এবং বাকি ৮টি তালতলী উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে দেখানো হয়েছে। ১৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দরপত্রে অংশগ্রহণের দিন নির্ধারণ করা হয়। ওই দরপত্রের নোটিশ প্রকাশিত হওয়ার পর বেড়িয়ে আসে অনিয়মের আসল চিত্র।

এ নিয়ে বরগুনা এবং আমতলীর ঠিকাদাররা সংবাদ সম্মেলন ও মানববন্ধন করে ওই দরপত্র বাতিলের দাবি জানানোর পর বরগুনার নির্বাহী প্রকৌশলী ২৭ আগস্ট এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলীকে দরপত্র বাতিলের জন্য চিঠি দেন এবং ১ সেপ্টেম্বর ওই দরপত্র বাতিল করে এলজিইডি।
দরপত্রের নোটিশে আমতলী উপজেলার হলদিয়া ইউনিয়নের বাঁশবুনিয়া খালের ওপর দক্ষিণ তক্তাবুনিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সামনে লোহার সেতু মেরামতের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, আবার একই স্কুলের সামনে একই সেতু নাশবুনিয়া খালেও দেখানো হয়েছে। দৃশ্যত নাশবুনিয়া নামে ওই এলাকায় কোনো খাল নেই।
দক্ষিণ তক্তাবুনিয়া গ্রামের সেলিম খান বলেন, নাশবুনিয়া নামে হলদিয়া ইউনিয়নে কোনো খাল নেই।

একই ইউনিয়নের তুজির বাজার ও রামজির বাজার নামক স্থানে দুটি সেতু মেরামতের কথা উল্লেখ রয়েছে নোটিশে। কিন্তু তুজির বাজার ও রামজির বাজারের সামনের হলদিয়া খালে কোনো সেতু নেই। ওই দুই বাজারের খালে রয়েছে বাঁশের সাঁকো। এলাহিয়া দাখিল মাদ্রাসার সামনে এবং দক্ষিণ রাওঘা কেরাতুল কোরান মাদ্রাসার সামনে সেতু মেরামত দেখানো হয়েছে, কিন্তু ওই দুই মাদ্রাসার সামনের খালে কোনো সেতু নেই। ওখানেও রয়েছে বাঁশের সাঁকো, যা দিয়ে বর্তমানে মানুষ পারাপার হচ্ছে।

হলদিয়া ইউনিয়নের তুজির বাজার সংলগ্ন ৮৫ মিটার দৈর্ঘ্যের সেতু সংস্কারের জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে, সেখানে থাকা বাঁশের সাঁকোর দৈর্ঘ্য ৬০ মিটার। সেতু না থাকার পরও ২৫ মিটার দৈর্ঘ্য বেশি দেখানো হয়েছে। এ ছাড়াও, এখানে মাটির কাজের জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৯ লাখ টাকা। একই ইউনিয়নের রামজী বাজার সংলগ্ন খালেও সেতু নেই। আছে ৫১ মিটার দৈর্ঘ্যের একটি বাঁশের সাঁকো। অথচ এখানেও সেতুর দৈর্ঘ্য দেখানো হয়েছে ৭০ মিটার।

উপজেলার গুলিশাখালী ইউনিয়নের ডালাচরা এলাকার বাসিন্দা হারুন মোল্লা বলেন, মাত্র দেড় কিলোমিটারের মধ্যে চারটি সেতু সংস্কারের জন্য দেখানো হয়েছে। এর মধ্যে দুটি চলাচল উপযোগী, বাকি দুটি বাঁশের সাঁকো, যা দিয়ে লোকজন চলাচল করে। এভাবে সরকারের অর্থ অপচয় করার পেছনে নিশ্চয়ই দুরভিসন্ধি আছে।

হলদিয়া ইউনিয়নের দক্ষিণ রাওগা কেরাতুল কোরআন মাদরাসা সংলগ্ন এলাকার বাসিন্দা সুলতান গাজী বলেন, ‘মাদরাসার এখানে কোনো সেতু নেই। এখানে একটি বাঁশের সাঁকো আছে। এই সাঁকো থেকে পড়ে কয়েক মাস আগে এক নারীর মৃত্যু হলেও এখানে কোনো সেতু নির্মাণ করা হয়নি।

এলজিইডির স্থানীয় ঠিকাদার মো. বশির উদ্দিন বলেন, দরপত্র আহ্বানের পর দরপত্রে উল্লেখিত আমতলী উপজেলার অন্তত ২৫টি সেতু এলাকা আমি সরেজমিনে পরিদর্শন করেছি। এর মধ্যে ১৩টি সেতুর স্থানে আমরা বাঁশের সাঁকো পেয়েছি। আর এমন কয়েকটি সেতু দেখেছি, বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয়ে ওইসব সেতু সংস্কারের কোনো প্রয়োজন নেই।

প্রতিটি সেতুর দৈর্ঘ্যই বেশি দেখানো হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
এ বিষয়ে আমতলী ঠিকাদার সমিতির সভাপতি জিএম ওসমানী হাসান বলেন, ‘বরগুনা স্থানীয় সরকার নির্বাহী প্রকৌশলী ফোরকান আহমেদ খান মোটা অংকের অর্থের বিনিময়ে প্রভাবশালী ঠিকাদারদের যোগসাজশে ৩৩টি সেতু সংস্কারের প্রাক্কলন তৈরি করে দরপত্র আহ্বান করেছেন।’

নিয়মানুসারে প্রাক্কলন তৈরির ক্ষেত্রে এলজিইডির সংশ্লিষ্ট উপজেলা প্রকৌশলী কার্যালয়ের সার্ভেয়ার (পরিমাপক) সেতু পরিমাপ করবেন। এ ছাড়াও, উপ-সহকারী প্রকৌশলী সরেজমিনে পরিদর্শনের পর প্রাক্কলন তৈরির কথা রয়েছে।

আমতলী উপজেলা প্রকৌশলীর কার্যালয়ের সার্ভেয়ার আবদুল কুদ্দুস বলেন, ‘সেতুর দৈর্ঘ্য ও মাটি পরিমাপের কথা থাকলেও, আমি কিছুই করিনি। প্রাক্কলন তৈরির পর আমাকে স্বাক্ষরের জন্য বলা হলেও, আমি সরেজমিনে পরিদর্শন না করে স্বাক্ষর করব না বলে জানিয়ে দেই। পরবর্তীতে কীভাবে প্রাক্কলন অনুমোদন করা হয়েছে, তা আমার জানা নেই।’

একই বক্তব্য উপ-সহকারী প্রকৌশলী নিজাম উদ্দীনেরও। তিনি বলেন, ‘সরেজমিন পরিদর্শন করে প্রতিবেদন দেওয়ার পর প্রাক্কলন তৈরির নিয়ম থাকলেও, আমি এসবের কিছুই করিনি। ঢাকা থেকেই প্রাক্কলন তৈরি ও অনুমোদন করা হয়েছে। এর বাইরে আমি কিছুই জানি না।’

আমতলী উপজেলা প্রকৌশলী আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘প্রধান প্রকৌশলী মহোদয়ের অনুমোদনক্রমে প্রকল্প পরিচালক প্রকল্প তৈরি করেছেন। আমাকে যেভাবে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, সেভাবেই বাস্তবায়ন করেছি। প্রাক্কলনে আমার স্বাক্ষর নেই।’

বরগুনা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) প্রধান নির্বাহী প্রকৌশলী ফোরকান আহমেদ খান বলেন, ‘এই প্রকল্পের প্রাক্কলন তৈরি থেকে শুরু করে কোনো কাজেই জেলা পর্যায়ের কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংশ্লিষ্ট নেই। এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলীর অনুমোদনক্রমে সব কিছুই প্রকল্প পরিচালক নির্ধারণ করেছেন। বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আমরা শুধুমাত্র নির্দেশনা অনুসরণকারী মাত্র।’

আইবিআরপি প্রকল্পের পরিচালক মো. আবদুল হাই বলেন, ‘এ বিষয়ে আমি নিজেও জানি না। বরগুনা থেকে প্রাক্কলন পাঠানো হয়েছে এবং তা অনুমোদন করা হয়েছে। আমার মনে হয় এতো বড় ভুল হওয়ার কথা নয়।’

ব্যাপক সমালোচনার মুখে এলজিইডি’র এ বিতর্কিত দরপত্র গত ১ সেপ্টেম্বর বাতিল করা হয়।

বরগুনার এলজিইডি’র নির্বাহী প্রকৌশলী ফোরকান আহমেদ খান সেতুগুলো সংস্কার এবং পুননির্মাণের দরপত্রে ত্রুটি-বিচ্যুতির কথা উল্লেখ করে তা বাতিলের অনুরোধ জানিয়ে এলজিইডি’র প্রধান প্রকৌশলী আবদুর রশীদ খানকে চিঠি দেন। এরপর ৩০ আগস্ট প্রধান প্রকৌশলীর নির্দেশে দরপত্রটি বাতিল করা হয়।

পরে এলজিইডি বিষয়টি তদন্তের জন্য তিন সদস্যবিশিষ্ট একটি কমিটি গঠন করে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক তদন্ত কমিটির প্রধান বলেন, ‘কমিটি ইতোমধ্যে তদন্ত শুরু করেছে এবং খুব শিগগির প্রতিবেদন দাখিল করা হবে।সূত্র: দ্য ডেইলি স্টার।

error: Content is protected !!