কে এই ডা. কাফিল খান? যাকে নিয়ে গোটা ভারত তোলপাড়

ডা. কাফিল খান। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ: তিনি ‘ভারতের শত্রু’, ‘জাতীয় নিরাপত্তার প্রতি হুমকি’ – যিনি ‘উস্কে দিচ্ছেন ঘৃণা ও সহিংসতা’। ভারতের উত্তর প্রদেশ রাজ্যের এই ডাক্তারকে এ জন্য ২০০ দিনেরও বেশি কারাভোগও করতে হয়েছে।

তার বিরুদ্ধে আনা সেই মামলা অবশ্য এলাহাবাদ হাইকোর্ট খারিজ করে দিয়েছে গত মঙ্গলবার, তবে একে কেন্দ্র করে ডাক্তার কাফিল খান পরিণত হয়েছেন অনেকের চোখে নরেন্দ্র মোদির শাসনকালে ভারতে যে ‘রাষ্ট্রীয় ও ধর্মীয় নিপীড়ন চলছে’ – তার এক জীবন্ত প্রতীক।

কীভাবে এই প্রতীক হয়ে উঠলেন তিনি?
৩৮ বছর বয়স্ক ডাক্তার কাফিল খানকে গত তিন বছরে কারাভোগ করতে হয়েছে দু দু’বার।

প্রথমবার ২০১৭ সালে । গোরখপুরের একটি হাসপাতালে অক্সিজেন না থাকায় ৭০টি শিশুর মৃত্যু ঘটনার জন্য ভুলভাবে দায়ী করে যাদের গ্রেফতার করা হয়েছিল – তাদের একজন ছিলেন ওই হাসপাতালের জুনিয়র ডাক্তার কাফিল খান।
সরকারি তদন্তকারীরা ওই ঘটনার জন্য হাসপাতাল কর্মীরা দায়ী নন বলে জানানোর পর সাত মাস জেলে থাকার পর মুক্তি পান কাফিল খান।

আর সবশেষ ঘটনায় কাফিল খানের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, তিনি গত ডিসেম্বর মাসে এক বক্তৃতা দিয়েছিলেন আলিগড় বিশ্ববিদ্যালয়ে – যাতে তিনি ভারতের বিতর্কিত নাগরিকত্ব আইনের সমালোচনা করেছিলেন, যে আইনটিকে মুসলিমদের বিরুদ্ধে বৈষম্যমূলক বলে মনে করা হয়।

ভারতের উত্তর প্রদেশ রাজ্যের শাসক এখন বিতর্কিত হিন্দু ধর্মীয় নেতা যোগী আদিত্যনাথ – যিনি তার মুসলিম-বিরোধী কথাবার্তার জন্য সুপরিচিত। এই রাজ্যের পুলিশের মতে ডাক্তার কাফিল খানের বক্তৃতা ছিল উস্কানিমূলক।

ওই বক্তৃতা দেবার ৪৫ দিন পর কাফিল খানকে গ্রেফতার করে পুলিশ, তাকে পাঠিয়ে দেয়া হয় জেলে।

কথা হয় কাফিল খানের ভাই আদিলের সাথে – যিনি একজন ব্যবসায়ী। আদিল খান খেদোক্তি করে বলেছিলেন, ‘প্রথমে তাকে বানানো হয়েছিল বলির পাঁঠা, আর এখন তাকে পরিণত করা হয়েছে রাষ্ট্রের শত্রুতে’।

ভারতে বর্তমানে যে জাতীয় নিরাপত্তা আইন রয়েছে তাতে কর্তৃপক্ষ কাউকে জাতীয় নিরাপত্তার প্রতি হুমকি মনে করলে তাকে আটক করতে পারে।

কিন্তু ডাক্তার কাফিল খান বলেন, দু’বার কারাবাসের অভিজ্ঞতার পর এখন তিনি আর কোন কিছুকেই ভয় করেন না। তিনি ঠিক করেছেন তিনি এখন কথা বলবেন – মানুষের জন্য, তার রোগীদের জন্য।

কে এই ডা. কাফিল খান?
৩৮ বছর বয়স্ক ডাক্তার কাফিল খান একজন শিশু রোগ বিশেষজ্ঞ।

তার বাবা ছিলেন একজন সরকারি ইঞ্জিনিয়ার। তার পাঁচ ভাইবোনের সবাই নিজ নিজ পেশায় সুপ্রতিষ্ঠিত। কাফিল খানের স্ত্রী শাবিস্তাও একজন ডাক্তার, তাদের দুটি ছেলেমেয়ে।

তার সহকর্মীদের ভাষায়, তিনি ছিলেন লাজুক প্রকৃতির মানুষ, বইয়ের পোকা, ক্রিকেট আর ফটোগ্রাফির ভক্ত। কিন্তু এখন কাফিল খান সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরণের একজন মানুষ।

তিনি হয়ে উঠেছেন একজন কমিউনিটি ডাক্তার, অধিকারকর্মী – ভারতের নানা জায়গায় ছুটে বেড়াচ্ছেন তিনি। ভারতের বন্যাদুর্গত এলাকাগুলোয় শতাধিক মেডিক্যাল ক্যাম্প স্থান করেছেন তিনি।

আলিগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের ৬০০ ছাত্রের সেই সমাবেশে তিনি ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ এনেছিলেন, তারা সাম্প্রদায়িক রাজনীতি করছে এবং দেশের শিশুদের স্বাস্থ্য, বেকারত্ব আর বিপর্যস্ত অর্থনীতির মতো প্রকৃত সমস্যাগুলোকে উপেক্ষা করছে।

“আপনারা যতই ভয় দেখান না কেন, আমরা ভীত হবো না। আমাদের যতই দমনের চেষ্টা করবেন ততবারই আমরা আবার উঠে দাঁড়াবো” – বলেন কাফিল খান।

তার এই বক্তৃতা নিয়ে আদালতে উত্তর প্রদেশের পুলিশ বলেছিল, “তিনি মুসলিম ছাত্রদের ধর্মীয় অনুভূতি উস্কে দেবার চেষ্টা করেছিলেন, এবং (হিন্দু) সম্প্রদায়ের প্রতি ঘৃণা, শত্রুতা এবং বৈরিতা বাড়াতে চেয়েছিলেন।”

তবে গত মঙ্গলবার হাইকোর্ট পুলিশের এই ভাষ্যের সাথে দ্বিমত প্রকাশ করে মামলাটি খারিজ করে দেয়।

হাইকোর্ট বলে, কাফিল খান কোন ঘৃণা বা সহিংসতার উস্কানি দেননি। বরং দুজন বিচারক বলেন, কাফিল খান আসলে নাগরিকদের মধ্যে ঐক্যের আহ্বান জানিয়েছিলেন, এবং পুলিশ তার বক্তৃতাকে খন্ডিতভাবে উপস্থাপন করেছে।

আসলে গত তিন বছর ধরেই ডাক্তার খানকে অনেকটা সময়ই বিচারের অপেক্ষায় এক কারাগার থেকে আরেক কারাগারে ঘুরতে হয়েছে।

২০১৭ সালে গোরখপুরের সরকারি হাসপাতালে শিশুমৃত্যুর ঘটনায় তিনি এবং আরো আটজনের বিরুদ্ধে অবহেলাজনিত মৃত্যু সংঘটনের মামলা করা হয়েছিল।

ওই হাসপাতালটি বিল পরিশোধ না করায় তাদের অক্সিজেন সরবরাহ কেটে দেয়া হয়েছিল – যে কারণে ৭০টিরও বেশি চিকিৎসাধীন শিশুর মৃত্যু হয়। কিন্তু সরকার বরাবরই সংযোগ কেটে দেয়ার কথা অস্বীকার করে আসছে। সরকারি তদন্তে ডা. কাফিল খানকে তার বিরুদ্ধে আনা অবহেলার অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়। কিন্তু সরকার এজন্য আজও দুঃখ প্রকাশ করেনি।

ডা. খানের সমর্থকরা বলেন, আসলে তিনি সরকারি অবহেলার কথা তুলে ধরেছিলেন বলেই তাকে টার্গেট করা হয়েছিল। আসলে তিনি সেসময় পাগলের মতো ছুটোছুটি করে বিকল্প অক্সিজেন সিলিন্ডারের ব্যবস্থা করছিলেন।

তিনি এটিএম থেকে নিজের টাকা তুলে অন্য হাসপাতাল, দোকান থেকে শুরু করে আধাসামরিক বাহিনীর ব্যারাকে পর্যন্ত গিয়েছিলেন কিছু জরুরি অক্সিজেন সিলিন্ডার যোগাড় করতে। তার সেই তৎপরতার ভিডিও-ও আছে যা সেসময় ভাইরাল হয়েছিল।

“আমি ২৪ ঘন্টায় ২৫০টি সিলিন্ডার যোগাড় করেছিলাম। আমি জানিনা কত শিশু বেঁচেছে, কিন্তু আমি সর্বতোভাবে চেষ্টা করেছি” – বলেন ডা. কাফিল খান।

গোরখপুরের অন্য ডাক্তাররাও সেই সংকটের সময় অক্সিজেন যোগাড় করেছিলেন, তবে কাফিল খানের চেষ্টাই সবচেয়ে বেশি প্রচার পায় তার নেতৃত্ব এবং সেই ভিডিওটির জন্য।

কয়েকদিন পর উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ সেই হাসপাতাল সফর করেন। ডা. খান বলছিলেন, তার সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রীর যেটুকু কথা হয় তাতে তার জীবনের গতিপথ পাল্টে গেছে।

আদিত্যনাথ তাকে জিজ্ঞেস করেন তিনি সিলিন্ডারের ব্যবস্থা করেছিলেন কিনা। কাফিল খান হ্যাঁ-সূচক জবাব দিলে আদিত্যনাথ “রেগে যান” এবং বলে ওঠেন, “তো, আপনি কি মনে করেন সিলিন্ডার যোগাড় করে আপনি হিরো হয়ে গেছেন?”

আদিত্যনাথ এ ঘটনা নিয়ে মন্তব্য করেন নি। ডা. কাফিল খানের পরিবার পরে তার মুক্তির অনুরোধ জানাতে মুখ্যমন্ত্রীর সাথে দেখা করতেও গিয়েছিলেন।

কারাগার থেকে লেখা এক চিঠিতে কাফিল খান বলেছিলেন, এ ঘটনা মিডিয়ায় আসার কারণেরই মুখ্যমন্ত্রী ক্ষিপ্ত হয়েছিলেন।

কাফিল খান এখন মুক্ত, তবে গোরখপুর হাসপাতালের ঘটনার পর সাসপেন্ড হওয়া অন্য ডাক্তাররা সবাই নিজ নিজ পদে ফিরে গিে য়ছেন – কিন্তু কাফিল খান এখনো তার পদে স্থলাভিষিক্ত হননি।

তাকে এখনো অর্ধেক বেতন দেয়া হচ্ছে। তার পরিবার নানা হয়রানি -নির্যাতনের শিকার হয়েছে।

জামিনে মুক্ত থাকার সময় ডা. কাফিল খানকে আবার গ্রেফতার করা হয়েছিল ৪৫ দিনের জন্য। অভিযোগ ছিল, তিনি বাহরাইচ জেলার একটি হাসপাতালে এনসেফালাইটিস আক্রান্ত হয়ে শিশু মৃত্যুর ঘটনার ব্যাপারে তথ্য সংগ্রহ করতে তিনি অননুমোদিতভাবে সেখানে ঢুকেছিলেন।

তার ওপর সব সময়ই পুলিশি নজরদারি চলছে বলে মন্তব্য করেছে একটি সংবাদপত্র।

দিল্লির একজন ডাক্তার হরজিৎ সিং ভাট্টি বলছিলেন, গত বছর এক অনুষ্ঠানে কাফিল খানের সাথে তার দেখা হলে তিনি জিজ্ঞেস করেছিলেন, কিভাবে তার এত পরিবর্তন হলো।

জবাবে ডা. কাফিল খান তাকে বলেন, জেলে থাকার অভিজ্ঞতা তাকে পাল্টে দিয়েছে, তার মন থেকে সব ভয় কেটে গেছে। তিনি এখন মানুষের জন্য তার রোগীদের জন্য কথা বলতে চান।

ডা. কাফিল খান কারাবন্দী থাকার সময় জেলখানায় করোনাভাইরাস সংক্রমণ ছড়ালে তিনি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে উদ্দেশ্য করে দুটি চিঠি লিখেছিলেন।

তাতে তিনি বলেন, কোভিড-১৯ ঠেকাতে আরো ডাক্তার দরকার। আমি একজন ডাক্তার, আমাকে মুক্তি দিন, যাতে আমি এই রোগ মোকাবিলায় ভূমিকা রাখতে পারি।

কাফিল খানকে নিয়ে এখন দ্বিমুখী জনমত তৈরি হয়েছে।

তার সমর্থকরা বলছেন, কাফিল খান এখন ‘নরেন্দ্র মোদির ভারতে রাষ্ট্রীয় ও ধর্মীয় নিপীড়নের’ প্রতীকে পরিণত হয়েছেন।

অন্যদিকে তার সমালোচকরা বলছেন, বিজেপি-বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর নানা প্ল্যাটফর্মে ডাক্তার কাফিল খানকে দেখা ডাচ্ছে, এবং তার ‘রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ’ আছে।কাফিল খানের একজন সাবেক সহযোগী বলেন, তিনি একজন যোদ্ধা এবং উচ্চাভিলাষী লোক।

কাফিল খান বলছেন, কারামুক্তির পর এখন তিনি আরো কিছু বন্যা দুর্গত এলাকায় গিয়ে সেখানে চিকিৎসা শিবির খোলার পরিকল্পনা করছেন। সূত্র: বিবিসি বাংলা ।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

error: Content is protected !!