কানাডিয়ান বাঙালি তরুণদের আত্মহত্যা ও সমাধান বিষয়ক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ

কানাডা প্রতিনিধি:

বৃহত্তর টরোন্টোয় বাঙালি তরুণদের আত্মহত্যা বিষয়ক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছে। ‘বাংলাদেশি-কানাডিয়ান তরুণদের আত্মহত্যা: চ্যালেঞ্জ ও সমাধান’-এর কৌশল বিষয়ক এক গবেষণা চালায় বেসরকারি সংস্থা, বেঙ্গলি ইনফরমেশন এন্ড এমপ্লয়মেন্ট সার্ভিসেস (বায়েস)। 

গত শনিবার (২৭ জুন) অনলাইনে জুমের মাধ্যমে গবেষণা প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়।

বায়েসের নির্বাহী পরিচালক ইমাম উদ্দিনের সঞ্চালনায় গবেষণা প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করেন সোশ্যাল ওয়ার্কার ও গবেষক নেসার আহমেদ। গবেষণা পদ্ধতি ব্যাখ্যা করেন মাহতাব উদ্দিন আর গবেষণার উদ্যেশ্য ও এর বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন বায়েসের পরিচালক গোলাম মোস্তফা।

গবেষণায় প্রাপ্ত তথ্যে বলা হয়, টরন্টোয় বাঙালি তরুণদের সাথে পিতামাতার যোগাযোগের বেশ ব্যবধান বিদ্যমান। তরুণদের মতে তারা পিতা-মাতার কাছ থেকে বিশেষত তাদের ক্যারিয়ার এবং জীবনসঙ্গী নির্বাচন করতে চাপ অনুভব করে। অভিভাবকরা হাই স্কুলের বিশেষায়িত প্রোগ্রামগুলোতে পড়ার জন্য চাপে রাখেন। 

সন্তানদের স্কুলে সর্বোচ্চ নাম্বার অর্জনকারী হিসাবে দেখতে চান। বাবা-মা তাদের সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় বিশ্বাস এবং অনুশীলনের কারণে কানাডার অনেক কিছুই গ্রহণ করেন না। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদকৃত পরিবারের সন্তানদের মধ্যে সমস্যাগুলো আরও বেশি প্রকট। এসব পরিবারের সদস্যরা একে অপরের সাথে যোগাযোগ করে না, যদিও তারা একই ছাদের নীচে বাস করে। 

বাঙালি-কানাডিয়ান তরুণদের কাছে পরিচয় সংকট আরেকটি অন্যতম বিষয়। অনেক তরুণের কাছে তাদের বাংলাদেশি বা কানাডিয়ান হিসাবে স্বচ্ছ পরিচয় সনাক্ত করতে অসুবিধা হয়। যুবকদের মতে তাদের উপর কানাডীয় মূল্যবোধ এবং বাংলাদেশী মূল্যবোধ একই সাথে বহন করার জন্য সামাজিক চাপ রয়েছে। তরুণরা বাংলাদেশের চাইতে কানাডিয়ান হিসাবে পরিচয় দিতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন বলেও জানানো হয় এই গবেষণা প্রতিবেদনে। 

গবেষণায় আরও বলা হয়, টরন্টোয় বাংলাদেশি সম্প্রদায়ের মধ্যে মানসিক স্বাস্থ্যকে ব্যাপকভাবে উপেক্ষা করা হয়।  পিতামাতারা সাধারণত সন্তানদের উদ্ভাবনী শক্তিগুলির দিকে মনোনিবেশ করার চেয়ে তাদের দুর্বলতার দিকে মনোনিবেশ করেন বেশি। 

অভিভাবকরা মনে করেন বর্ণবাদ, অভিবাসন ও বেকারত্বের পরিস্থিতির কারণে তাদের মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। কার কত বড় বাড়ি, দামি গাড়ি আছে বা কোন অঞ্চলে তারা বাস করে তার উপর ভিত্তি করে যখন তাদের সাথে আচরণ করা হয়, তখন পরিবারের সদস্যরা মারাত্মক মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার সন্মুক্ষীণ হন। সমাজ ও স্কুলে ভিন্ন বর্ণ ও সংস্কৃতিও তাদের সন্তানদের প্রভাবিত করে। পরিবারে বাবা-মা উভয়েরই কাজ করতে হয় এবং সন্তানদের সময় দিতে না পারাটাও সমস্যার কারণ বলে উল্লেখ করেন।

গবেষণায় তরুণদের আত্মহত্যার প্রবণতা রোধে বেশ কিছু সুপারিশ করা হয়। যেমন- প্যারেন্টিং সেশনের মাধ্যমে পিতামাতা ও সন্তানদের মধ্যে যোগাযোগের ব্যবধান হ্রাস করা, নিরাপদ সচেতনতা সেশনের ব্যবস্থা করা, কমিউনিটি সংগঠনগুলি দ্বারা প্রতিযোগিতামূলক অনুষ্ঠান বর্জন করা, পৃথক আলোচনার ব্যবস্থা, পিয়ার শিক্ষা, সেমিনার, ওয়ার্কশপ ইত্যাদির মাধ্যমে সচেতনতা সৃষ্টি করা, মানসিক স্বাস্থ্য সেবা সংস্থাগুলির সাথে সংযোগ স্থাপন, কমিউনিটি সংস্থা থেকে মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা প্রদান, শিশু-তরুণ ও যুবকদের খেলাধুলায় সম্পৃক্ততা বাড়ানো, বিভিন্ন শিক্ষাগত পদ্ধতির মাধ্যমে তাদের সন্তানের শক্তি এবং দুর্বলতা সম্পর্কে পিতামাতাকে সচেতন করা প্রভৃতি। 

আলোচনায় অংশ নেন বিশিষ্ট সাংবাদিক, নতুন দেশের প্রধান সম্পাদক শওগাত আলী সাগর, বিসিএসের নির্বাহী পরিচালক নাসিমা আকতার, বায়েসের প্রেসিডেন্ট আলমগীর কবির, পরিচালক জাকিয়া সুলতানা, আজীবন সদস্য ব্যারিস্টার রিজুয়ান রহমান, রিয়েল এস্টেট এজেন্ট তানভির কোহিনুর, মেন্টাল হেলথ বিশেষজ্ঞ বদিউজ্জমান মুকুল, উন্নয়নকর্মী সাকিবুর রহমান, ফাহমিদা রহমান, ওয়াহিদা ইফাত, হোসনে আরা জামিসহ কমিউনিটির বিশিষ্টজনরা উপস্থিত ছিলেন। 


গবেষণার মূল প্রতিবেদনটি ওয়েবসাইট-এ www.bies-canada.org পাওয়া যাবে।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

error: Content is protected !!