করোনায় মৃতদের যে ৫ অভিন্ন লক্ষণ

বিশ্বজুড়ে চলছে মৃত্যুর মিছিল। মহামারি করোনায় সময় যত গড়াচ্ছে লাশের সংখ্যা ততোই বাড়ছে। এরই মধ্যে ঘাতক ভাইরাসের ছোবলে বিশ্বজুড়ে প্রাণ হারিয়েছেন ১ লাখ ৩০ হাজারেরও বেশি মানুষ। আক্রান্ত হয়েছেন ২০ লক্ষাধিক।

ভাইরাসটির ছোবলে প্রাণ হারানো মানুষের দিকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে কিছু অভিন্ন লক্ষণ দেখতে পেয়েছেন চিকিৎসক ও গবেষকরা। মৃত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে প্রধানত পাঁচটি মূল কারণ খুঁজে পেয়েছেন তারা।

বয়স
গবেষণায় দেখা গেছে ৭০ বছরের বেশি বয়সের লোকদের জন্য কোভিড-১৯ সংক্রমণে মারা যাওয়ার ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। চীনের উহানের গবেষকেরাও একই তথ্য দিয়েছিলেন। সেখানে দুটি হাসপাতালে ১৯১ জন করোনা ভাইরাসে মৃত ব্যক্তির পর্যবেক্ষণে তারা এই সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছিলেন। বিশ্লেষণটি এই ইঙ্গিত দেয় যে পূর্ব-বিদ্যমান শর্ত নির্বিশেষে বয়স এবং মৃত্যুর ঝুঁকির মধ্যে একটি সম্পর্ক রয়েছে।

গবেষণার সহ-লেখক জিবো লিউ বলেছেন, ‘বয়স্ক ব্যক্তিদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অল্পবয়সীদের চেয়ে অনেক কম থাকে। দুর্বল প্রতিরোধ ব্যবস্থা করোনার প্রদাহকে আরও বাড়িয়ে তোলে ফলে হার্ট, মস্তিষ্ক এবং অন্যান্য অঙ্গগুলির স্থায়ী ক্ষতি করে। যেটা বয়স্ক রোগীদের মৃত্যুর অন্যতম কারণ’।

লিঙ্গ
করোনা ভাইরাসের ফলে সৃষ্ট রোগ কোভিড–১৯ এ নারীর চেয়ে পুরুষের মৃত্যুর হার বেশি। দেশ ভেদে এ হার দ্বিগুণ–আড়াইগুণ বেশি। তবে নারীর চেয়ে পুরুষের মৃত্যুর হার বেশি কেন— এর জবাব দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

তাদের মতে, নারীদের সুস্থ, সুশৃঙ্খল জীবনযাপন এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার কারণে তারা পুরুষের চেয়ে ভাইরাসের বিরুদ্ধে শক্ত লড়াই করতে পারছেন। যদিও এসব মতামত নিয়ে যথেষ্ট বিতর্ক রয়েছে। জিনগত আচরণ ও হরমোন পার্থক্যও এক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করা হয়। এছাড়া শক্তিশালী রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার ব্যাপারে পরিবেশগত বিষয়ও থাকতে পারে।

তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, যদিও নারীদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা শক্তিশালী, এরপরও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে দুর্বল করে ফেলে এমন অটোইমিউন রোগের ৮০ শতাংশের বেশি নারীদেরই হয়ে থাকে। এটার কারণ যখন একটি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা শক্তিশালী হয়, তখন অন্যান্য রোগ দেহের অন্য অঙ্গকে লক্ষ্যবস্তু করে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

অন্তর্নিহিত স্বাস্থ্য সমস্যা
অন্তর্নিহিত স্বাস্থ্য সমস্যায় যারা ভুগছেন তাদের করোনা ভাইরাসে মারা যাওয়ার ঝুঁকি বেশি। এর মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী ফুসফুসের রোগ, মাঝারি থেকে গুরুতর হাঁপানি, হার্টের পরিস্থিতি, ডায়াবেটিস, যকৃতের রোগ এবং কিডনিজনিত রোগ রয়েছে।

ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের শ্বাস প্রশ্বাসের চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ফ্যান চুং বলছিলেন, ‘এটি একটি নতুন সংক্রমণ, তবে ফ্লু মহামারি নিয়ে আমাদের অভিজ্ঞতা থেকে আমরা জানি যে যারা আগে থেকেই বিভিন্ন শারীরিক সমস্যায় ভুগছেন তাদের জন্য এটা আরও খারাপ হবে।

নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অফ মেডিসিনে একটি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছে, যা উহানের প্রথম এক হাজার করোনা রোগীর তথ্য দিয়েছে। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে , ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, সিওপিডি, ক্যান্সার এবং রেনাল ডিজিজ আক্রান্তদের অবস্থা খুব খারাপ হয়ে গিয়েছিল।

ফ্যান বলেন, আমি ধারণা করি যে খুব দুর্ভাগ্যক্রমে যুক্তরাজ্যে যারা মারা গেছেন এমন লোকদের মধ্যে এই শর্তগুলির এক বা একাধিক বিদ্যমান ছিল।

স্থূলতা
অতিরিক্ত ওজনযুক্ত লোকেরাও করোনা ভাইরাসে মারা যাওয়ার অধিক ঝুঁকিতে থাকেন। গত মাসে, এনএইচএসের একটি অডিট থেকে জানা গেছে, করোনা ভাইরাস থেকে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েছেন এমন প্রায় দুই তৃতীয়াংশ রোগী স্থূল। অডিট অনুসারে, ঘাতক এই ভাইরাসের কারণে যুক্তরাজ্যের হাসপাতালগুলোতে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে থাকা রোগীদের ৬৩ শতাংশই অতিরিক্ত ওজন, স্থূলকায় বা গুরুতর স্থূল।

এদিকে, ফ্রান্সের প্রধান মহামারী বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক জাঁ-ফ্রানসোয়া ডেলফ্রেসিও সতর্ক করে বলেছেন, অতিরিক্ত ওজনযুক্ত লোকেরা বেশি ঝুঁকিতে পড়েছেন।
তিনি বলেন, ‘এই ভাইরাসটি যুবকদের জন্যও ভয়ংকর, বিশেষত স্থূল যুবকদের ওপর আঘাত করতে পারে। যাদের ওজন বেশি তাদের সত্যই যত্নবান হওয়া দরকার।’

রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম
যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম তাদের জন্য এই ভাইরাসের সংক্রমণে মৃত্যুর ঝুঁকি অনেক বেশি। ইমিউন সিস্টেমটি যতটা শক্তিশালী এবং সুষম রাখা যায় সেই প্রচেষ্টা চালানো উচিত। একজন ব্যক্তির রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা নানা কারণে কমে যেতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে ক্যান্সারের চিকিৎসা, ধূমপান, অস্থি মজ্জা বা অঙ্গ প্রতিস্থাপনের মধ্য দিয়ে যাওয়া, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ঘাটতি, নিয়ন্ত্রিত এইচআইভি বা এইডস এবং কর্টিকোস্টেরয়েডগুলির দীর্ঘায়িত ব্যবহার এবং অন্যান্য অনাক্রম্যতা।

মোনাশ ইউনিভার্সিটির গবেষক সারা জোন্স এবং ফ্যাবিয়েন ভিনসেন্ট ব্যাখ্যা করেছেন, ‘যেহেতু ইমিউনোকম্পর্সিড লোকদের প্রতিরোধ ব্যবস্থা ত্রুটিযুক্ত বা অকার্যকর, তাই তারা সার্স-কোভি -২ ভাইরাসসহ অন্যান্য অপরিচিত ভাইরাসের দ্বারা সহজেই আক্রান্ত হতে পারে। তাদের প্রতিরোধ ক্ষমতা এসব ভাইরাসকে ঠেকাতে অক্ষম। কোভিড -১৯ এ মৃত্যুর অন্যতম প্রধান একটি কারণও এটি।সূত্র: দ্য মিরর।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.