করোনার ওষুধ তৈরির দৌড়ে বাংলাদেশও

নিজস্ব প্রতিবেদক- ঢাক

ঔষধ তৈরির দৌড়ে বাংলাদেশের ইতিমধ্যেই সুনাম আছে

মহামারি করোনাভাইরাসে প্রতিনিয়তই হাজারে হাজারে বাড়ছে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা। কার্যত অচল হয়ে পড়েছে গোটা বিশ্ব। করোনা মোকাবেলায় দেশে দেশে চলছে গবেষণা। বেশকয়েকটি দেশে পরীক্ষামূলকভাবে ওষুধের প্রয়োগও শুরু হয়েছে। তবে এখনো পর্যন্ত এটির কোনো প্রতিষেধক আবিষ্কার হয়নি। প্রাণঘাতী এ ভাইরাসের প্রতিষেধক আবিষ্কারের জন্য বিজ্ঞানীরা নিরলস পরিশ্রম করে যাচ্ছেন

বেশ কয়েকটি দেশ করোনার ভ্যাকসিনের ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল চলমান। তবে এর মধ্যে আশার আলো দেখাচ্ছে— ম্যালেরিয়া প্রতিরোধী হাইড্রোক্সাইক্লোরোকুইন (এইচসিকিউ) ও ক্লোরোকুইন (সিকিউ) ওষুধ। যুক্তরাষ্ট্র, চীন, যুক্তরাজ্য, কানাডা, জাপান, স্পেন, জর্ডানসহ বেশ কয়েকটি দেশে করোনা চিকিৎসায় ম্যালেরিয়া প্রতিরোধী হাইড্রোক্সাইক্লোরোকুইন ও ক্লোরোকুইন ব্যবহার করছে।

এরই ধারাবাহিকতায় জাতীয় ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর দেশীয় কোম্পানিগুলোকে হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইন উৎপাদন এবং সংরক্ষণ করতে নির্দেশ দিয়েছে। দেশের সেরা ফার্মাসিউটিক্যালস কোম্পানিগুলো এসব ওষুধ তৈরি করবে।

গত ৫ এপ্রিল বাংলাদেশের করোনা (কোভিড-১৯) পরিস্থিতি নিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রেস ব্রিফিংয়ে ম্যালেরিয়ার ক্লোরোকুইন ওষুধ দিয়ে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের সেবা দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক।

তিনি বলেন, অনেক উন্নত দেশে এ ওষুধ ব্যবহার করা হচ্ছে। আমরাও করবো। আমরা পর্যাপ্ত ওষুধ মজুদ রেখেছি। ম্যালেরিয়ার ক্লোরোকুইন ওষুধ দিয়ে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর সেবা দেওয়া হবে।

ইতোমধ্যে দেশের সব ওষুধের দোকানে পর্যাপ্ত পরিমাণে রেকোনিলের সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়েছে, যেন দেশের যেকোনো প্রান্তে যেকোনো আক্রান্ত রোগীকে চিকিৎসা দেওয়া যায়। দেশের মানুষের কথা বিবেচনা করে চিকিৎসকের নাগালের মধ্যে রাখার জন্য ইনসেপ্টা ইতোমধ্যে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কেন্দ্রীয় ঔষধাগারকে (সেন্ট্রাল মেডিকেল স্টোরস ডিপো—সিএমএসডি) ৩০ লাখ রেকোনিল ট্যাবলেট সরবরাহ করেছে। এমনকি ডিরেক্টর জেনারেল অব ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশনকে (ডিজিডিএ) ৩ লাখ রেকোনিল ট্যাবলেট বিনা মূল্যে হস্তান্তর করেছে।

চীনের চিকিৎসকরা বলছেন, দেশটিতে গত ফেব্রুয়ারিতে ১৩৪ জন রোগীর পরীক্ষার জন্য ক্লোরোকুইন ব্যবহার করা হয়েছিল। এটি রোগীদের অসুস্থতার তীব্রতা কমাতে কার্যকর ছিল। তবে এই ফলাফল এখনো প্রাতিষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি। সরকারি টাস্কফোর্সের নেতৃত্বদানকারী চীনা শ্বাস-প্রশ্বাস বিশেষজ্ঞ ঝং নানশান সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলেন, এ সংক্রান্ত ইতিবাচক প্রতিবেদনগুলো দ্রুত সর্বত্র প্রচার করা হবে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, করোনার প্রতিষেধক হিসেবে চারটি ওষুধ নিয়ে কাজ করা হচ্ছে। এর মধ্যে দুটি হলো— ড্রাগ ককটেল। ইবোলার ওষুধ রেমডেসিভির, দুটি এইচআইভি ড্রাগ— লোপিনাভির ও রিটোনাভির সংমিশ্রণ; লোপিনাভির ও রিটোনাভির প্লাস ইন্টারফেরন বিটা’র আরেকটি ককটেল; এবং অ্যান্টিম্যালেরিয়া ড্রাগ ক্লোরোকুইন।

আশার কথা হল, ফ্রান্সে সম্প্রতি ৩৩ জন কোভিড-১৯ রোগীর ওপর গবেষণা চালিয়ে ক্লোরোকুইন গ্রহণকারী রোগীদের মধ্যে ইতিবাচক পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে। অর্থাৎ এসব রোগীরা ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠছেন। এটি অ্যাজিথ্রোমাইসিনের সঙ্গে ব্যবহৃত হয়েছিল। যা সাধারণ অ্যান্টিবায়োটিক যা গৌণ ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণ দমনে ব্যবহৃত হয়।

ক্লোরোকুইন (এইচসিকিউ ও সিকিউ) ওষুধ ল্যাবের পরীক্ষাগারে করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে কাজ করতে সক্ষম প্রমাণিত হয়েছে। সেল ডিসকভারি নামে এক সংবাদমাধ্যম জানায়, গত সপ্তাহে একটি চীনা গবেষণা দলের প্রকাশিত গবেষণায় এর ইতিবাচক কার্যকারিতার কথা জানানো হয়েছে।

চীনে করোনাভাইরাস মহামারি আকারে বিস্তার করার পর রোগীদেরকে এ ওষুধ দেওয়া হয়। পরবর্তীতে ফ্রান্সেও এর ব্যবহার হয়। এমনকি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও করোনা আক্রান্ত রোগীদের ওপর এ ওষুধ প্রয়োগ করার কথা বলেছেন।

ফরাসি স্বাস্থ্যমন্ত্রী অলিভিয়ার ভেরান বলেছেন, কেবল করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে যাদের অবস্থা গুরুতর, তাদের চিকিৎসার জন্য ক্লোরোকুইন ব্যবহার করা যেতে পারে।

ক্লোরোকুইন মূলত ম্যালেরিয়া প্রতিরোধ ও চিকিৎসার জন্য ব্যবহৃত হয়। এ ওষুধ মূলত সিনচোনা নামক গাছ থেকে তৈরি হয়। ক্লোরোকুইন অন্ত্রের বাইরে ঘটছে এমন অ্যামোনিয়ার সংক্রমণের জন্য ব্যবহার করা হয়। চিকিৎসাশাস্ত্রে এ ওষুধ রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস ও লুপাসের মতো রোগে প্রদাহবিরোধক হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

প্রসঙ্গত, বাংলাদেশে গত ৮ মার্চ প্রথম করোনা আক্রান্ত রোগী শনাক্ত করে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর)। এই রিপোর্টটি লেখা পর্যন্ত বাংলাদেশে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত ১২৩ জনকে শনাক্ত করা হয়েছে। মারা গেছেন ১২ জন। বিশ্বে সর্বাধিক আক্রান্ত রোগী যুক্তরাষ্ট্রে। আক্রান্তের সংখ্যা৩ লাখ ৫২ হাজার ১৬০ জন। মৃতের সংখ্যা ১০ হাজার ৩০৯ জন। ২৪ ঘণ্টায় আক্রান্ত হয়েছে ১৫ হাজার ৪৮৭ জন. মারা গেছে ৭৫৩ জন।

error: Content is protected !!