November 24, 2020

মাই পেটারসন. লাইফ

ভয়েস অফ দ্যা কমিউনিটি

এমসি ক্যাম্পাসে ব্ল্যাকমেইল, ধর্ষণের ফাঁদ: সেই ঘটনার বর্ণনা দিলেন ধর্ষিতার স্বামী

সিলেটের মুরারি চাঁদ (এমসি) কলেজের ক্যাম্পাস ছিল ছিনতাইকারী ও মাদকসেবীদের নিরাপদ আস্তানা।ছাত্রলীগ নেতা সাইফুর-রনি সিন্ডিকেটের হয়ে কাজ করতো মাইকেল। কেউ ক্যাম্পাসে গেলেই মাইকেল খবর দিতো ওই সিন্ডিকেটকে। মন্দিরের টিলার ঢালু জায়গাতে আড্ডাস্থল সাইফুর, রনি, রবিউলদের।

স্থানীয়রা জানায়- বিকাল হলেই ধান্ধায় বের হতো তারা। চলে আসতো ওখানে। প্রতিদিনই মন্দিরের টিলায় ঘুরতে যায় তরুণ-তরুণীরা। আর তাদেরই টার্গেট করে ওরা। তাদের হাতে সম্ভ্রম হারানো অনেক নারী বিচার না দিয়েই চলে যান। কখনো কখনো কেউ বিচার প্রার্থী হলেও তাদের খোঁজ মিলে না। নাম-পরিচয় পাওয়া যায় না। ফলে ধর্ষণ ও শ্লীলতাহানির শিকার হলেও নীরবে সহ্য করতেন সবাই।তাদের কাছে অসহায় ছিল কলেজ প্রশাসনও। গত ৫ বছরে ক্যাম্পাসের পেছনের টিলায় অন্তত ১০টির মতো ধর্ষণ ও শ্লীলতাহানির ঘটনা ঘটেছে। অনেক ঘটনাই প্রশাসন জানতেন। কিন্তু তারা কার্যকর কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারতেন না। ওদের কাছে জিম্মিই ছিল কলেজ প্রশাসন।ধর্ষণের বিভীষিকাময় ঘটনা যদি ঘটে কারও বাস্তব জীবনে, তবে থমকে যায় সময়-অন্ধকার নেমে আসে জীবন অধ্যায়ের প্রতিটি পাতাজুড়ে। এমন অবস্থাই এখন সিলেট এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে গণধর্ষণের শিকার নববধূ ও তার স্বামীর। আজ বুধবার নির্যাতিতার স্বামী খুলে বললেন সেই ভয়াল সন্ধ্যার নির্মম গল্প।

নববধূর স্বামী জানান, গত শুক্রবার (২৫ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যার আগে স্ত্রীসহ প্রাইভেটকারযোগে হযরত শাহপরাণ (র.) এর মাজার জিয়ারতে যান তিনি। জিয়ারত শেষে সন্ধ্যার দিকে বাড়ি ফেরার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেন মাজার থেকে। এসময় স্বামীকে স্ত্রী বলেন, ‘আমার একজন ছেলেবন্ধু দেখা করার জন্য কল করেছে। তার সঙ্গে এমসি কলেজের গেটে দেখা করবো।’ এতে সম্মতি জানান স্বামী। তবে সেই বন্ধুর দেখা করার সময় স্বামী সামনে ছিলেন না বলে তিনি জানান।

নববধূর স্বামী জানান, স্ত্রীর সেই বন্ধুর নাম আইনুল। পরবর্তীতে পুলিশ তাকে সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেফতার করে এবং রিমান্ডে নেয়।

মামলার বাদি বলেন, এমসি কলেজের মূল ফটকের সামনে পাকা রাস্তার উপর গাড়ি রেখে স্ত্রীকে তিনি বন্ধুর সঙ্গে দেখা করার সুযোগ দিয়ে পার্শ্ববর্তী দোকান থেকে সিগারেট কিনেন। পরে গাড়িতে এসে উঠার সময় ছাত্রলীগ কর্মী সাইফুর রহমান ও অর্জুন লস্কর তাকে ডাক দিয়ে বলেন, ‘এই দাঁড়া, তোর সঙ্গে এই মেয়ে কে?’ এ সময় তিনি বলেন- আমার স্ত্রী। এসময় এগিয়ে আসে সাইফুর-অর্জুনের সহযোগী তারেকুল ইসলাম তারেক, শাহ মো. মাহবুবুর রহমান রনি। তখন তারা নববধূর স্বামীকে চড়-থাপ্পড় মারে। তখন তার স্ত্রী গাড়ি থেকে নেমে এর প্রতিবাদ করলে আসামিরা স্বামী-স্ত্রীকে ধমক দিয়ে জোরপূর্বক গাড়িতে ওঠিয়ে নেয়। এসময় তারেকুল ইসলাম তারেক ড্রাইভিং সিটে বসে ও স্ত্রীকে সামনের সিটে এবং স্বামীকে পিছনের সিটে ওঠিয়ে সাইফুর রহমান ও অর্জুন লস্কর তার সাথে পিছনের সিটে ওঠে বসে। পরে তরিকুল ইসলাম গাড়ি চালিয়ে এমসি কলেজ হোস্টেলের ফটকের সমুখস্থ ছোট্ট ব্রিজে এসে গাড়ি দাঁড় করায় এবং নববধূর স্বামীর কাছে ৫০ হাজার টাকা দাবি করে। তখন তিনি ২ হাজার টাকা দিয়ে তার কাছে আর টাকা নাই বলে জানান। কিন্তু ধর্ষকরা স্বামী-স্ত্রীকে ছেড়ে না দিয়ে গাড়িটি ছাত্রাবাস প্রাঙ্গণের ৭ নং ব্লকের ৫ তলা নতুন বিল্ডিং এর দক্ষিণপূর্ব কোণে খালি জায়গায় নিয়ে যায়। অন্যরা তখন মোটরসাইকেলযোগে পিছনে পিছনে ঘটনাস্থলে পৌঁছে।

এসময় তরিকুল, মাহবুবুর রহমান রনি ও অর্জুন লস্কর নববধূর কানের দুল এবং সোনার চেইন কেড়ে নেয়। এসময় চিৎকার করলে আসামিরা নববধূর মুখ চেপে ধরে।

পরে স্ত্রীকে গাড়িতে রেখে সাইফুর, তারেক রনি ও অর্জুন স্বামীকে ৭ নং ব্লকের পশ্চিমপাশে নিয়ে যায়। এসময় নববধূর স্বামীকে কথা বলায় ব্যস্ত রেখে প্রথমে সাইফুর রহমান এবং পরবর্তীতে একে একে তারেকুল ইসলাম, মাহমুবু রহমান রনি ও অর্জুন লস্কর প্রাইভেটকারের ভিতরেই নববধূকে পালাক্রমে ধর্ষণ করে। তখন স্ত্রীর চিৎকার শুনে স্ত্রীকে বাঁচাতে চেষ্টা করতে গেলে আসামিরা তাকে মারধর করে এবং আটকে রাখে।

নববধূকে ধর্ষকরা নির্যাতন করার সময় ৫ তলা বিল্ডিং-এর দ্বিতীয় তলার বারান্দায় একজন ছেলে আসলে তাকে ধমক দেয় এবং চলে যেতে বলে ধর্ষকরা।

নববধূর স্বামী বলেন, প্রায় আধা ঘণ্টা পর তার স্ত্রী কাঁদতে কাঁদতে গাড়ি থেকে নেমে স্বামীর নিকট আসলে আসামিরা তাদের প্রাইভেটকার আটকে রেখে স্ত্রীকে নিয়ে চলে যেতে বলে এবং ৫০ হাজার টাকা দিয়ে গাড়ি নিয়ে যেতে বললে তিনি স্ত্রীকে নিয়ে পায়ে হেঁটে কলেজে হোস্টেলের গেটে যান এবং একটি সিএনজি অটোরিকশা ডেকে প্রথমে শিবগঞ্জ পয়েন্টে আসেন এবং পরে পুলিশকে ঘটনা জানাতে টিলাগড় পয়েন্টের দিকে রওয়ানা দেন। এসময় নিজের কাছে কোনো টাকা না থাকায় নবধূর স্বামী অটোরিকশা চালকের কাছে একশ টাকা ধার চান। তবে তাদের অবস্থা দেখে অটোরিকশা চালক তাদের সহযোগিতা করার আশ্বাস প্রদান করে। ওই সময় সিএনজি অটোরিকশাতে বসেই তিনি সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনারের অফিসিয়াল ফোন নাম্বারে কল দেন এবং ঘটনার বিবরণ বলেন। এ কিছুক্ষণ পরেই পুলিশ কমিশনারের নির্দেশক্রমে শাহপরাণ থানার সহকারী কমিশনার ধর্ষিতার স্বামীকে ফোন দেন এবং ঘটনাস্থল ও ঘটনার বিবরণ শুনে পুলিশ প্রেরণ করেন।

এদিকে, নববধূর স্বামী স্ত্রীকে নিয়ে এমসি কলেজের পেছনের গেটের (গোপাল টিলাস্থ) একটি রেস্টুরেন্ট বসে পুলিশের অপেক্ষা করতে থাকেন। এসময় এদিক দিয়ে যাচ্ছিলেন সাবেক ছাত্রলীগ নেতা বিহিত গুহ চৌধুরী বাবলা। তখন ওই নির্যাতিতা নববধূ কাঁদছেন দেখে তিনি সেখানে দাঁড়ান এবং ঘটনার বিস্তারিত শুনেন। তখন বাবলা নববধূর স্বামীকে নিয়ে ছাত্রাবাসের গেইটে যান। এসময় পুলিশও চলে আসে। এসময় উপস্থিত ছিলেন শাহপরাণ থানার সহকারী কমিশনার (এসি) মাইনুল আফসার ও ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল কাইয়ুম।

তখন পুলিশ টিম ভেতরে ঢোকার জন্য কলেজ কর্তৃপক্ষের অনুমতির অপেক্ষা করে। তবে শাহপরাণ থানাপুলিশের এস.আই সুহেলকে নিয়ে সাবেক ছাত্রলীগ নেতা বাবলা ভেতরে ঢুকেন এবং কিছুক্ষণ পর বেরিয়ে এসে বলেন, অভিযুক্তরা ভেতরেই আছে।

পরে কলেজ কর্তৃপক্ষের অনুমতিসাপেক্ষে পুলিশ ছাত্রাবাসের ভেতরে ঢুকে এবং বাদি এসময় ৭ নং ব্লকে তার গাড়িটি পুলিশকে দেখান এবং দ্বিতীয় তলার ছেলেটি ঘটনার সময় বেরিয়ে এসেছিলো তাকে শনাক্ত করেন। ছেলেটি তার নাম হৃদয় পারভেজ বলে জানায়।

তখন হৃদয় পারভেজ জানায়, সে যখন বারান্দায় এসেছিলো তখন তার রুমেমেট (৩ নং আসামি) শাহ মো. মাহবুবুর রহমান রণি তাকে চলে যেতে বলে।

এসময় পারভেজসহ হোস্টেলের অন্য ছাত্ররা মোবাইলে রনি এবং অন্য আসামিদের ছবি দেখায়। এসময় ছাত্রলীগের ৬ জনকে শনাক্ত করা হয় এবং তাদের নাম ঠিকানা জানতে পারে পুলিশ। অন্য আরও ২/৩ জন আসামির পরিচয় জানতে পারেননি। পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে বাদি গড়ি ও ওদের ব্যবহৃত ১টি মোটরসাইকেল উদ্ধার করে।

পরে রাত ১২টার দিকে পুলিশের সহায়তায় তার স্ত্রীকে সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা শেষে এজাহার দায়ের করেন।

চাঞ্চল্যকর এই ধর্ষণ মামলায় এজাহারনামীয় ছয় আসামিসহ সিলেট রেঞ্জ পুলিশ ও র‌্যাব-৯ এর হাতে গ্রেফতার আটজনের মধ্যে সাতজনকে পাঁচদিন করে রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ।

গ্রেফতারকৃত ও রিমান্ডে নেয়া আসামিরা হচ্ছে- সাইফুর রহমান, অর্জুন লস্কর, রবিউল ইসলাম, মাহবুবুর রহমান রনি, রাজন, আইনুল ও মাহফুজুর রহমান মাছুম।

এমসি কলেজের ফটকের বাইরে রাজপাড়া গলির মুখে রয়েছে মাদক সিন্ডিকেটের আস্তানা। ওই আস্তানার নিয়ন্ত্রক গ্রেপ্তার হওয়া আইনুদ্দিন আইনুল। তার সঙ্গে রাজপাড়ার শাহ জুনেদ, হাসানসহ কয়েকজন ওই মাদক আস্তানার নিয়ন্ত্রণ করে। রাজপাড়া এলাকার বাসিন্দারা জানিয়েছেন- বিকাল হলেই সাইফুর-রনির অপরাধের সঙ্গ দিতে তারা ছুটে যেতো এমসির ক্যাম্পাসে। শিশু স্কুলের পাশ দিয়ে তারা ওই এলাকায় প্রবেশ করতো। এমসির কলেজের হোস্টেল এলাকায় আগে নারী ধর্ষণের ঘটনা কখনো ঘটেনি। কিন্তু গত এক বছর ধরে এ ধরনের ঘটনা ঘটছে বলে জানিয়েছে হোস্টেলের বসবাসকারী শিক্ষার্থীরা। তারা জানায়- সন্ধ্যা নামলেই হোস্টেলের সাধারণ শিক্ষার্থীরা খুব প্রয়োজন ছাড়া হলের রুম থেকে বের হতো না। তবে- প্রায় সময়ই সাইফুর-রনি প্রাইভেটকার, সিএনজি অটোরিকশায় মহিলাদের নিয়ে এসে ঢুকতো। এবং তারা শিক্ষক বাংলোতে চলে যেতো। এসব ঘটনা দেখলেও কেউ কোনো প্রতিবাদ করতে সাহস পেতো না। হোস্টেলে সুপার থাকতেন না। ফলে হোস্টেলের নিয়ন্ত্রণ করতো তারাই। এমসি কলেজের পাশেই রয়েছে আলুর তল এলাকা। একই এলাকায় কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও ইঞ্জিনিয়ার কলেজ অবস্থিত। বিকাল হলেই অনেক পর্যটক স্ত্রী ও বান্ধবীকে নিয়ে সেখানে ঘুরতে যান। তারা নির্জন, নিরিবিলি টিলায় গেলেই ওই এলাকায় একটি চক্র তাদের একইভাবে ব্ল্যাকমেইল ও ধর্ষণ করতো। এ ধরনের অনেক ঘটনা এখন স্থানীয়দের মুখে মুখে রটছে। তারা জানান- বেশির ভাগ সময় প্রেমিক-প্রেমিকা টিলায় বেড়াতে আসেন। তাদের ব্ল্যাকমেইল করে ছাত্রলীগের বালুচরের একদল কর্মী। এসব কর্মীদের পুলিশে নানা সময় অভিযোগ দিলেও কোনো কাজ হয়নি। সিলেট সিটি করপোরেশনের ২০ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর আজাদুর রহমান আজাদ জানিয়েছেন- এমসি কলেজ কিংবা আশপাশের এলাকাকে নিরাপদ করতে একটি থানার প্রস্তাব রয়েছে। হযরত শাহ বোরহান উদ্দিনের নামে ওই থানা করার কথা ছিল। কিন্তু পুলিশের পক্ষ থেকে তেমন সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না। থানা হলে, পুলিশি টহল বাড়বে ধর্ষণ, ছিনতাইয়ের মতো ঘটনা কমে যাবে। তিনি জানান- এমসি কলেজ ও আশেপাশে এলাকায় জোরপূর্বক ধর্ষণ, শ্লীলতাহানির অনেক ঘটনা তার কাছে আগেও এসেছে। কিন্তু পরিচয় না পাওয়ায় কোনো প্রতিকার করা সম্ভব হয়নি। সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের এডিসি (মিডিয়া) জ্যোতির্ময় সরকার জানিয়েছেন- এমসি কলেজ ও আশেপাশের এলাকায় সব সময় পুলিশ টহল ছিল। এখনো আছে। অভিযোগ পেলেই ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

error: Content is protected !!