December 4, 2020

মাই পেটারসন. লাইফ

ভয়েস অফ দ্যা কমিউনিটি

আরএসএসকে প্রতিহত করতে কেরালায় আত্মপ্রকাশ মুসলিম সংগঠনের

দক্ষিণ ভারতের কেরালায় আত্মপ্রকাশ করেছে পপুলার ফ্রন্ট অব ইন্ডিয়া (পিএফআই) নামের এক মুসলিম সংগঠন। তারা এখন আলোচনার কেন্দ্রে। উত্তর প্রদেশের হাথরাসে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ নিয়ে উত্তেজনা হোক, কিংবা কয়েক মাস আগে নাগরিকত্ব আইনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ–সব ব্যাপারেই মোদি সরকার এই সংগঠনটিকে দুষছে। বলা হচ্ছে, এরাই নাকি মধ্যপ্রাচ্য থেকে কোটি কোটি টাকা নিয়ে এসে ভারতবিরোধী ষড়যন্ত্র করছে–এমনকি এদের নিষিদ্ধ করার কথাও ভাবা হচ্ছে।

পিএফআই অবশ্য তাদের বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগই জোরালোভাবে অস্বীকার করছে। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, বিজেপির ভাবাদর্শিক মিত্র হিন্দুত্ববাদী আরএসএস-কে প্রতিহত করতেই এই সংগঠনের আত্মপ্রকাশ।

কারা এই পিএফআই? সুদূর কেরালার একটি ছোট্ট সংগঠন কীভাবেই বা সারা দেশময় পরিচিতি পেলো? আর কেনই তারা বারবার সরকারের আক্রমণের মুখে পড়ছে? আসলে কেরালায় পিএফআই আত্মপ্রকাশ করেছিল ১৪ বছর আগে, ২০০৬ সালে। ১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর বাবরি মসজিদ ভেঙে ফেলার ঘটনার পর দক্ষিণ ভারতের মুসলিমরা তার প্রতিবাদে অজস্র ছোট ছোট সংগঠন গড়ে তুলেছিলেন–সেরকমই তিনটি সংগঠন একসঙ্গে হাত মিলিয়ে তৈরি করেছিল পপুলার ফ্রন্ট অব ইন্ডিয়া।

পরবর্তী কয়েক বছরের মধ্যে তারা যেভাবে সারা দেশে সংগঠন ছড়িয়ে দিয়েছে এবং হাজার হাজার সদস্য সংগ্রহ করেছে, তা ভারতের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকেও রীতিমতো হতবাক করে দিয়েছে।

পিএফআই’র জন্ম কেরালার কোঝিকোড়ে, রাজ্যের একজন অবসরপ্রাপ্ত প্রবীণ অধ্যাপক, পি কোয়া সংগঠনের শীর্ষ তাত্ত্বিক নেতা হিসেবে পরিচিত। সংগঠনটি দাবি করে থাকে, ভারতের অন্তত ২২টি রাজ্যে এখন তাদের নেটওয়ার্ক আছে। কিছু দিন আগে তারা কেরালা থেকে সদর দফতর সরিয়ে এনেছে দেশের রাজধানী দিল্লিতে, তাদের জাতীয় প্রেসিডেন্ট ই আবুবকর আজকাল দিল্লিতেই বেশি সময় কাটান। তিনি নিজে যেমন কেরালার মানুষ, পিএফআইর বেশিরভাগ নেতাও তাই। সে কারণেই পিএফআই সারা দেশে মূলত কেরালার সংগঠন বলেই পরিচিতি পেয়েছে। কেরালায় পিএফআইর বহু নেতাই আগে ভারতের ইসলামী ছাত্র সংগঠন ‘সিমি’-র সদস্য ছিলেন, যে সিমি এখন নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়েছে।

পিএফআই অবশ্য এ ধরনের সব অভিযোগই জোরালোভাবে অস্বীকার করছে। তাদের বক্তব্য, তারা শুধু একটি নব্য-সামাজিক সংগঠন, যারা ভারতের পিছিয়ে থাকা বা প্রান্তিক মানুষদের জন্য কাজ করে থাকে। নিজস্ব ওয়েবসাইটে বা টুইটার হ্যান্ডলেও তারা শুধু এটুকু পরিচয়ই দিয়ে থাকে, এমনকি নিজেদের মুসলিম সংগঠন বলেও বর্ণনা করে না।

তবে ভারতের পর্যবেক্ষকরা অনেকেই মনে করছেন, ক্ষমতাসীন বিজেপির আদর্শিক অভিভাবক হিসেবে যারা পরিচিত–সেই হিন্দু কট্টরপন্থী আরএসএসের প্রতিপক্ষ শক্তি হিসেবেই পিএফআই আত্মপ্রকাশ করেছে এবং সে কারণেই খুব দ্রুত দেশের মুসলিম সমাজের মধ্যে জনপ্রিয়তা ও গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে। পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, পিএফআই সংগঠনটিকে যেভাবে গড়ে তোলা হয়েছে তাতে হিন্দু জাতীয়তাবাদী সংগঠন আরএসএসের (রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ) জবাব দেওয়ার একটা ভাবনা কাজ করেছে।

মুম্বাইতে টাটা ইনস্টিটিউট অব সোশ্যাল সায়েন্সেসের অধ্যাপক ও সমাজতাত্ত্বিক পি শাজাহান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আরএসএসের মতোই পিএফআই ক্যাডারদের নির্দিষ্ট ইউনিফর্ম আছে। আরএসএস যেমন বিভিন্ন জায়গায় রোজ সকালে ‘শাখা’র আয়োজনের মাধ্যমে নিয়মিত শারীরিক অনুশীলন করে, ঠিক সেভাবেই পিএফআই-ও কেরালার বিভিন্ন শহরে-গ্রামে মাঝে মাঝেই প্যারেড ও ড্রিল করে থাকে।’

কেরালায় পিএফআই ও আরএসএসের মধ্যে রাজনৈতিক ও আদর্শগত সংঘাতের ইতিহাসও খুব তিক্ত। এই দুই সংগঠনের বিরুদ্ধে পরস্পরের সদস্যদের খুন করারও অভিযোগ উঠেছে বহুবার। ভারতে মুসলিম পুরুষ বা হিন্দু নারীদের মধ্যে প্রেমজ বিবাহ বা তথাকথিত ‘লাভ জিহাদে’র বিরুদ্ধে আরএসএস যেভাবে সক্রিয় , তার বিরুদ্ধেও পাল্টা আন্দোলন চালিয়ে আসছে পিএফআই।

২০১৫ সালে কেরালার একজন খ্রিষ্টান অধ্যাপক টি জে জোসেফ তার কলেজে একটি প্রশ্নপত্র তৈরি করেছিলেন, যা ইসলামের নবীর প্রতি অসম্মানজনক ছিল বলে পিএফআই মনে করেছিল। ওই অধ্যাপকের হাতের তালু কেটে ফেলা হয়। পরে সে অভিযোগে পিএফআই’র ১৩ জন কর্মী যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন। ঠিক তার আগের বছরই কেরালা সরকারই হাইকোর্টে হলফনামা দিয়ে জানিয়েছিল, পিএফআই কর্মীদের বিরুদ্ধে অন্তত ২৭টি রাজনৈতিক হত্যা, ৮৬টি হত্যা প্রচেষ্টা ও সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা উসকানি দেওয়ার প্রায় শ’ দেড়েক মামলা ঝুলছে।

এই পটভূমিতেই অধ্যাপক পি কে শাজাহান মনে করছেন, ‘পিএফআইর কর্মকাণ্ড দেখলে এটা মনে করার যথেষ্ট কারণ আছে যে আরএসএসের আদর্শিক সহিংসতার জবাব দিতেই আর একটি আগ্রাসী ও আক্রমণাত্মক মুসলিম প্ল্যাটফর্ম হিসেবে নিজেদের তারা গড়ে তুলেছে।’

পিএফআইর বহু পৃষ্ঠপোষক হলেন কেরালার প্রবাসী মুসলিম, যারা মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে কর্মরত। গত দেড় দশকে তারা এই সংগঠনকে বিপুল পরিমাণ আর্থিক সাহায্যও করেছেন, যাতে পিএফআইর তহবিল ফুলেফেঁপে উঠেছে।

কেরালা থেকে ২০১৪ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে ইসলামিক স্টেটে যোগ দিতে যারা সিরিয়া বা আফগানিস্তান পাড়ি দিয়েছিলেন, সেই তরুণ-তরুণীদের মধ্যেও অনেকেই একটা সময় পিএফআই’র সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। অন্তত ভারতের ন্যাশনাল ইনভেস্টিগেশন এজেন্সি (এনআইএ) আদালতে তেমনটাই দাবি করেছে।

তবে সম্প্রতি পিএফআই যেভাবে জাতীয় খবরের কাগজের শিরোনামে চলে এসেছে তা আগে কখনও হয়নি। আর এর সূচনা হয় গত ডিসেম্বর-জানুয়ারিতে, যখন উত্তর প্রদেশে নাগরিকত্ব আইনবিরোধী বিক্ষোভে মদত দেওয়ার জন্য ওই রাজ্যের সরকার সরাসরি পিএফআইর ‘ষড়যন্ত্র’কে দায়ী করে। মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ পর্যন্ত বলেন, পিএফআই নাকি কোটি কোটি টাকা ছড়িয়ে মুসলিমদের উসকানি দিচ্ছে এবং সরকারি সম্পত্তি ভাঙতে প্ররোচনা দিয়ে যাচ্ছে তারা।

error: Content is protected !!