‘আম্মু, তুমি ভাত খেয়ে ঘুমাও আমি নামাজে যাই’

নারায়ণগঞ্জের বায়তুস সালাত জামে মসজিদে পড়ে আছে জায়নামাজ, টুপি, তছবি, চশমা। তবে নেই মানুষগুলো। গ্যাস লাইনে লিকেজ ও সংশ্লিষ্টদের গাফিলতির কারণে নিভে গেলো অনেক তাজা প্রাণ। সেইসঙ্গে ধ্বংস হয়েছে পরিবার-স্বজনদের স্বপ্ন।
‘আম্মু, তুমি ভাত খেয়ে ঘুমাও। আমি মসজিদে নামাজ পড়তে যাই।’ শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর) রাতে নয়ন (২৬) লালমনিরহাটে থাকা মা বুলবুলি বেগমকে মোবাইল ফোনে একথা বলে এশার নামাজ আদায় করতে নারায়ণগঞ্জের তল্লার মসজিদে যান। এর কয়েক ঘণ্টা পর নয়নের বন্ধু ফোন দিয়ে জানায় মসজিদে বিস্ফোরণে নয়ন দগ্ধ হয়েছেন। মা রাতেই লালমনিরহাট থেকে রওনা দিয়ে সন্তানের খোঁজে ঢাকায় আসেন। তবে সন্তানের দেখা পাননি। সন্তান শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটের আইসিইউতে ভর্তি। আর মা হাসপাতালের অভ্যর্থনা কক্ষে আহাজারি করছেন, ‘আমার নয়নকে একটু দেখাও।’

শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) সকালে হাসপাতালের অভ্যর্থনা কক্ষে বসে মা বুলবুলি বেগম বলেন, ‘আমাকে এশার নামাজের আগে নয়ন ফোন দেয়। বলে, মা আপনি ভাত খেয়ে ঘুমান। আমি মসজিদে গেলাম। এরপর আর কথা হয়নি।’

নয়নের গ্রামের বাড়ি লালমনিরহাটের আদিতমারী থানার তালুক পলাশী গ্রামে। তার বাবা মেহের আলী। তিন ভাই ও এক বোনের মধ্যে নয়ন সবার বড়। পরিবারসহ নয়ন নারায়ণগঞ্জ ছিলেন। জানুয়ারিতে তার বাবা-মা ও ভাই-বোন গ্রামে চলে যায়। এরপর থেকে নয়ন একাই নারায়ণগঞ্জ ছিলেন। একটি পোশাক কারখানায় কাজ নেন।
মা বুলবুলি বলেন, ‘আমার ছেলের আয়েই সংসার চলতো। আর কিছু নাই, অন্য সন্তানরা সব ছোট ছোট।’

আরেক পোশাক শ্রমিক মো. কেনান। গ্রামের বাড়ি পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী উপজেলায়। কেনানও বার্ন ইউনিটের আইসিইউতে। তার ছোট ভাই মো. ইমরান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমার ভাই গার্মেন্টসে চাকরি করে। মসজিদে নামাজে পড়তে গিয়েছিল। বিস্ফোরণের খবর পেয়ে আমি বাসা থেকে দৌড়ে যাই। গিয়ে দেখি রাস্তার ওপরে সবাই ছটফট করতেছে। কেউ কেউ রাস্তায় জমে থাকা পানিতে গড়াগড়ি করছিল। সবাই দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছিল। এরপর আত্মীয়স্বজন সবাই মিলে সবাইকে একে একে হাসপাতালে নেওয়া হয়।’

ইমরান বলেন, ‘শুক্রবার রাত থেকে হাসপাতালের নিচেই আছি। কিন্তু ভাইকে এখনও দেখতে পারিনি।’

নারায়ণগঞ্জের যে মসজিদে বিস্ফোরণ হয়েছে তার মেসে থাকতেন মোস্তফা কামাল (৩৪)। তিনি দগ্ধ হয়ে মারা গেছেন। নারায়ণগঞ্জে টিউশনি করতেন তিনি। সদ্য বিবাহিত কামালের গ্রামের বাড়ি চাঁদপুরের জজকোর্ট এলাকায়।
শুক্রবার রাতে মসজিদে বিস্ফোরণের কথা শুনে তার বৃদ্ধ বাবা আব্দুল করীম মিয়াজী মেজো ছেলে ইউসুফ মিয়াজীকে সঙ্গে নিয়ে ঢাকায় আসেন। ছেলের মৃত্যুর খবরে ভেঙে পড়েছেন বৃদ্ধ এই বাবা।

তিনি বলেন, তার তিন ছেলের মধ্যে মোস্তফা কামাল সবার বড়। লকডাউনের পুরো সময়টা মোস্তফা বাড়িতেই ছিলেন। ১৫ দিন আগে তিনি ঢাকায় আসছেন।
তিনি বলেন, শুনছি ছেলে মারা গেছে। ছেলের লাশটা একটু আমাকে দেখান, তাও দেখায় না।আগুনের গোলার সঙ্গে বাবা মসজিদ থেকে ছিটকে আসে

নারায়ণগঞ্জে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী মো. ইব্রাহীম (৫০)। এশার নামাজ পড়তে তিনিও শুক্রবার রাতে মসজিদে যান। তার বড় ছেলে ফয়সালও মসজিদে ছিলেন। ছেলে নামাজ শেষ করে মসজিদ থেকে বের হয়ে একশ গজ দূরে যান। এর মধ্যে বিকট শব্দে বিস্ফোরণ হয়। হঠাৎ তার বাবার কথা মনে পড়ে। দৌড়ে মসজিদের সামনে যান।

ফয়সাল বলেন, ‘মসজিদের সামনে গিয়ে দেখলাম থাইগ্লাস ভেঙে আগুনের গোলা বের হচ্ছে। আগুনের গোলার সঙ্গে মানুষও বের হয়ে আসছে। দু’বার আগুনের গোলা বের হয়েছে। এরপর দেখি বাবাও রাস্তায় পড়ে আছে।, দাড়ি, চুল, কাপড় সব পুড়ে গেছে, কিছু নেই। দ্রুত তাকে নারায়ণগঞ্জের ভিক্টোরিয়া হাসপাতালে নিয়ে যাই। সেখান থেকে ঢাকায় নিয়ে আসি।’

তিনি বলেন, ‘মসজিদের প্রধান ফটকের টাইলসের নিচেই গ্যাসের লিকেজ ছিল। আমরা সেজদা দিলেও ঘ্রাণ পেতাম। কয়েকবার অভিযোগ করা হয়েছে, তবে তিতাস কর্তৃপক্ষ পাত্তা দেয়নি।’

প্রসঙ্গত, নারায়ণগঞ্জের তল্লায় মসজিদে বিস্ফোরণের ঘটনায় ৩৭ জন গুরুতর দগ্ধ হয়েছেন। শনিবার দুপুর পর্যন্ত ১৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, চিকিৎসাধীন সবার অবস্থা আশঙ্কাজনক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

error: Content is protected !!