আমেরিকায় পরিবর্তন কি আসন্ন?

বিমল সরকার

কেউ পছন্দ করুক আর না করুক কিংবা দেশটির ব্যাপারে কারও একান্ত আগ্রহ আর বিদ্বেষ যাই থাক, বর্তমানে সচেতন বিশ্ববাসীর দৃষ্টি আমেরিকার প্রতি; সেদেশের নির্বাচন ও প্রেসিডেন্টপ্রার্থী রিপাবলিকান ডোনাল্ড ট্রাম্প (ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্ট) এবং ডেমোক্রাট জো বাইডেনের প্রতি।

প্রার্থী দু’জন কোথায় যাচ্ছেন, নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি দিয়ে কী বলছেন আর কী-ই বা করে চলেছেন- সব কিছুতেই এখন সবার নজর। কেন? আমেরিকা শক্তিধর ও বড় একটি দেশ। তার রয়েছে ‘বিশ্ব মোড়ল’ অভিধা। এছাড়া বর্তমান জমানায় ‘গ্লোবাল ভিলেজ’ একটি বহুল উচ্চারিত ও আলোচিত শব্দবন্ধ। অতএব আমেরিকার নেতৃত্ব, অবস্থা-পরিস্থিতি, ব্যবস্থা-বন্দোবস্ত ও নীতি-আদর্শের ওপর বিশ্ববাসীর অনেক কিছুই নির্ভর করে। তার ভুলভ্রান্তি যেমন সমূহ ক্ষতি-দুর্ভোগ-বিড়ম্বনার কারণ হয়ে উঠতে পারে, তেমনি সঠিক সিদ্ধান্ত ও সুস্থ কর্মপ্রয়াস আমেরিকাবাসীর সঙ্গে সঙ্গে বিশ্ববাসীর জন্যও সুখ-শান্তি ও স্বস্তির বাতাবরণ সৃষ্টি করতে এবং বজায় রাখতে পারে। আর এ কারণেই আমেরিকা ও সেখানকার নির্বাচন নিয়ে অন্যদের মতো আমাদেরও এত কৌতূহল ও আগ্রহ।

প্রেসিডেন্ট হিসেবে জর্জ ওয়াশিংটন থেকে শুরু করে ডোনাল্ড ট্রাম্প পর্যন্ত মোট ৪৫ জন ব্যক্তি আমেরিকা শাসন করেছেন বা করছেন। তাদের মধ্যে এক-তৃতীয়াংশ অর্থাৎ ১৫ জনের হোয়াইট হাউসে দু’বার করে দায়িত্ব পালন করার সৌভাগ্য হয়েছে। এ ১৫ জনের মধ্যে আবার ব্যতিক্রম ৩২তম প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন ডিল্যানো রুজভেল্ট। ২৪০ বছরের ইতিহাসে রুজভেল্টই আমেরিকার একমাত্র প্রেসিডেন্ট, যিনি তিনবার, তাও একাদিক্রমে রাষ্ট্রীয় এ গুরুদায়িত্ব পালন করেন (১৯৩৩-১৯৪৫)।

সংবিধান অনুসারে আমেরিকার প্রেসিডেন্টের মেয়াদকাল চার বছর। দু’বারের বেশি কেউ প্রেসিডেন্ট হতে পারেন না। এরও শুরু একেবারে প্রথম প্রেসিডেন্ট ওদের জাতির জনক জর্জ ওয়াশিংটনের আমল থেকে। পরীক্ষিত দেশপ্রেমিক ও অত্যন্ত জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব ছিলেন জর্জ ওয়াশিংটন। স্বাধীনতার অব্যবহিত পর ১৭৮৯ সালে বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় তিনি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছিলেন। একাদিক্রমে দু’বার (১৭৮৯-১৭৯৩ ও ১৭৯৩-১৭৯৭) অত্যন্ত সফলভাবে তিনি এ গুরুদায়িত্ব পালন করেন। অনুসারী-অনুরাগীরা তৃতীয়বারের জন্য আবারও রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকার অনুরোধ জানালে তিনি বিনয়ের সঙ্গে অসম্মতি জানান। আর তখনই সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়, দু’বারের বেশি কেউ আমেরিকার প্রেসিডেন্ট থাকবেন না। রুজভেল্টের বিষয়টি ছিল সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ বেঁধে গেলে বিরাজমান পরিস্থিতি অনুযায়ী এর চেয়ে ভালো ও সহজ কোনো পথ আমেরিকানদের সামনে আর খোলা ছিল না। রুজভেল্টকে বলা হয় ‘ওয়ার-টাইম প্রেসিডেন্ট’- যুদ্ধকালীন প্রেসিডেন্ট।

লক্ষ করলে দেখা যায়, ৪০তম প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগান থেকে শুরু করে (১৯৮১-১৯৮৫-৮৯) ৪৫তম বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পর্যন্ত বলতে গেলে সবাই (একমাত্র ব্যতিক্রম বহুল আলোচিত ইরাক-ইরান যুদ্ধকালীন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিও বুশ : ১৯৮৯-১৯৯৩) দু’বার করে আমেরিকা শাসন করেছেন। এক্ষেত্রে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এখন কঠিন এক অগ্নিপরীক্ষার সম্মুখীন। ২০১৬ সালে দুনিয়ার সবচেয়ে শক্তিধর বলে পরিচিত রাষ্ট্রটির প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার আগেই তিনি নিজ দেশে ও বহির্বিশ্বে নানাভাবে আলোচনা-সমালোচনার পাত্রে পরিণত হন। নির্বাচিত হওয়ার পর দেশে ও বহির্বিশ্বে বিভিন্ন ইস্যুতে আর কোনো আমেরিকান প্রেসিডেন্টকে নিয়ে এত আলোচনা-সমালোচনা ও ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ হয়নি, যা গত প্রায় চার বছরে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে নিয়ে হয়েছে, এখনও হচ্ছে।

মহাজনদের কথা- সংকটকালে মানুষের আসল পরিচয় পাওয়া যায়। ২০১৯ সালে দেখা দেয়া মারাত্মক করোনাভাইরাস এতদিনে সারা দুনিয়াকেই গ্রাস করতে বসেছে। করোনার ভয়াল থাবায় দেশে দেশে ভয়াবহ পরিস্থিতি! চারদিকে হতভাগাদের হাহাকার! মানবেতিহাসে এত বড় পরিসরে এমন ভয়াবহ বিপর্যয় আর কখনও এসেছিল বলে জানা যায় না। কেবল মৃত্যু আর মৃত্যু। আক্রান্তদের বাঁচানোর জন্য সর্বত্র সে কী প্রাণান্তকর চেষ্টা ও আর্তি! এমন পরিস্থিতিতে বিশ্বের দেশে দেশে রাজনীতিক ও রাষ্ট্রনায়কদের অবদান, ভূমিকা ও মনমানসিকতার বিষয়টিও সর্বত্র আলোচনার বিষয়। বড় ও শক্তিশালী রাষ্ট্রের কাণ্ডারি হিসেবে করোনাকালে সময় সময় করা নানা মন্তব্য ও কর্মকাণ্ডের জন্য ডোনাল্ড ট্রাম্পকেও কেবল আমেরিকাবাসী নয়, গোটা দুনিয়াবাসী নতুনভাবে চেনার সুযোগ পাচ্ছে।

শুরুতে জর্জ ওয়াশিংটন, জন অ্যাডামস, টমাস জেফারসন প্রমুখ হোয়াইট হাউসে অবস্থান করে আমেরিকার মতো একটি দেশের নেতৃত্ব দিয়েছেন। এরই ধারাবাহিকতায় রাষ্ট্রক্ষমতায় আসেন আব্রাহাম লিঙ্কন, উইড্রো উইলসন, ফ্রাঙ্কলিন ডি রুজভেল্ট, রোনাল্ড রিগানের মতো নেতারা। হাল জমানায় আসেন জর্জ ডব্লিও বুশ, বিল ক্লিনটন ও বারাক ওবামা। সর্বশেষ ২০১৬ সালে ক্ষমতায় আসেন বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

রাজা আসে, রাজা যায়। নির্বাচনে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন আমেরিকার জনগণ, ভোটার-সাধারণ। তারা পুরনোকেই (বর্তমান) আঁকড়ে ধরে রাখবেন, নাকি নতুন নেতৃত্ব বেছে নেবেন তা একান্তই তাদের ব্যাপার। আমেরিকার ঐতিহ্য, বর্তমান বিশ্বের সমস্যা-সম্ভাবনা নিয়ে নিশ্চয়ই আমেরিকাবাসীর স্টাডি রয়েছে। কে গ্রহণ ও বহন করবেন আমেরিকাবাসীর পক্ষে সেদেশের নেতৃত্ব ও শাসনভার, তা দেখার জন্য আরও এক-দেড় মাস সবাইকে অপেক্ষা করতে হবে। সূত্র:যুগান্তর।

বিমল সরকার : অবসরপ্রাপ্ত কলেজ শিক্ষক

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

error: Content is protected !!