আমেরিকায় আতশবাজি আতঙ্ক, জরুরি কলেও সাড়া মিলছে না পুলিশের

ডেস্ক রিপোর্ট:

আজ ৪ঠা জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা দিবস। ১৭৭৬ সালে আজ থেকে ২৪৪ বছর পূর্বে আমেরিকা স্বাধীনতা লাভ করে যুক্তরাষ্ট্র। সেসময় স্বাধীনতার মূলমন্ত্র ছিল সকলের সমান অধিকার বিশেষ করে সুবিধা বঞ্চিত মানুষের মুখে হাসি ফুটানো ৷

১৭৮৯ সালে বিল অব রাইটে বাক স্বাধীনতা, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা, ধর্মীয় স্বাধীনতা সহ সবার অধিকার প্রতিষ্ঠার কথা ছিল। 

আর এই দিবসকে কেন্দ্র করে প্রতি বছরই বিভিন্ন স্টেট বা রাজ্যে বিভিন্ন এলাকায় সারা জুন মাস ধরে চলে আতশবাজি, কিন্তু এ বছরের আতশবাজি আনন্দ না, হয়ে উঠেছে অনেকের আতঙ্কের কারণ।

মাঝ রাতে বিভিন্ন এলাকায় অনেকেই আতশবাজি প্রদর্শনী দলের উদ্দেশ্যে চিৎকার করে বলছেন, আমরা ঘুমাতে পারি না, কেউ অনুরোধ করছেন, আবার কেউ ৯১১ বা ৩১১ এ কল করে পুলিশের কাছে অভিযোগ করছেন, কিন্তু কিছুই কাজ করছে না।

কোভিড-১৯ মহামারি আক্রান্ত, বহু প্রিয়জন হারিয়ে শোকাহত, এক মাসেরও অধিক সময় ধরে চলমান বর্ণবাদ বিরোধী ‘ব্ল্যাক রাইটস ম্যাটার’ আন্দোলনে কম্পিত যুক্তরাষ্ট্রে বিভিন্ন স্টেটে অনেকেই আতঙ্কের মধ্য দিয়ে রাতের পর রাত কাটাচ্ছেন আতশবাজির বিকট আওয়াজ শুনে।

এসব কোন সাধারণ শিশুদের খেলার আতশবাজি না। স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে বিস্ফোরণ উপাদান থাকা অবৈধ আতশবাজি। যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় ডিপার্টমেন্টাল চেইন শপগুলোর অন্যতম, মেসি’স দীর্ঘদিন ধরে স্বাধীনতা দিবসের আতশবাজি স্পন্সর করে আসছে। আর এইসব প্রদর্শনীতে ব্যবহৃত হয় ১ হাজার ফুটের উপরে উঠে যাওয়া বিস্ফোরক সামগ্রী থাকা শক্তিশালী আতশবাজি।

তবে নিউইয়র্কে সাধারণের জন্য এই আতশবাজির ব্যবহার অবৈধ হলেও এর প্রচলন নতুন না। কিন্তু এবছর উল্লেখযোগ্য হারে এর ব্যবহার বেড়ে যাওয়াকে অনেকে রহস্যজনক মনে করছেন অনেকে।

জুন মাসে নিউইয়র্কে আতশবাজির বিরুদ্ধে অভিযোগ এসেছে ৮ হাজার ৯ শত ৬৭ টি যা গত বছরের তুলনায় ৩২০ গুণ বেশি (বিস্তারিত জানতে এখানে ক্লিক করুন)। শিকাগো, বোস্টন, লস এঞ্জেলস, মিনেসোটা,হার্টফোর্ড, মিশিগান সহ আরও অনেক স্টেটে এই অভিযোগ গত বছরের তুলনায় অনেক বেড়েছে। অনেকেই যে সচেতন না, তা বোঝা যায় বিপদজনক এই আতশবাজির ব্যবহার চলতে থাকায়।

গত ২৪ জুন ব্রুকলিনে ভয়াবহ আতশবাজির কারণে এক বাড়িতে আগুন লাগলে, ফায়ার সার্ভিসের প্রায় ৬০ জন কর্মী মিলে সেই আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। এই ঘটনায় ৩৬ বছর বয়সী ড্যামিয়েন বেন্ডকে নিজ বাড়িতে আগুন লাগানোর অভিযোগে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। 

নিউইয়র্ক সিটির শেরিফ অফিসের গত ২৪ জুন দেয়া তথ্য অনুযায়ী স্ট্যাটেন আইল্যান্ডে এ পর্যন্ত ১০ জনকে অবৈধ আতশবাজি ব্যবহারের কারণে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ব্রঙ্কসে অবৈধ আতশবাজি এবং অস্ত্র রাখার জন্য গ্রেফতার করা হয়েছে ১২ জনকে।

অবশেষে মেয়র বিল দে ব্লাসিওর বাসার সামনে গাড়ির হর্ন বাজিয়ে আতশবাজির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানালে তিনি পরদিন আতশবাজির বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেবার কথা ঘোষণা করেন। তিনি আতশবাজির সরবরাহ বন্ধে একটি টাস্কফোর্স ঘোষণা করেন।

বলা বাহুল্য নিউইয়র্কে এই আতশবাজি বিক্রি অবৈধ হলেও আশপাশের স্টেট থেকে সহজেই যে কেউ তা সংগ্রহ করতে পারেন।

এদিকে মহামারি আক্রান্ত যুক্তরাষ্ট্রে এই বিপুল আতশবাজির কারণ নিয়ে আছে বিস্তর আলোচনা সমালোচনা। কেউ বলছেন দীর্ঘদিন লকডাউনে থাকা মানুষ বিরক্ত হয়ে এভাবে আতশবাজি করছে।

আতশবাজি নিয়ে ষড়যন্ত্র তত্ত্ব

আবার সামাজিক নেটওয়ার্ক ব্যবহারকারী ও কিছু রিপোর্ট দাবি করছে মহামারির কারণে ৪ঠা জুলাইয়ের অনেক আতশবাজি বাতিল হয়ে যাওয়ায় পেশাদার আতশবাজি অনেক স্বল্পমূল্যে বিক্রি করা হচ্ছে, যদিও তা আমেরিকান আতশবাজি ট্রেড গ্রুপ অস্বীকার করেছে।

এর পাশাপাশি আছে ষড়যন্ত্র তত্ত্ব। আর এই ষড়যন্ত্র তত্ত্ব দাবি করেছে, এসব আতশবাজির পেছনে আছে অন্য উদ্দেশ্য। অনুসন্ধানী সাংবাদিকরা বুঝতে চাইছেন, দুর্যোগকালে এরকম ভয়াবহ আতশবাজি কেন হচ্ছে?

অনেকে সামাজিক মাধ্যমে প্রশ্ন তুলেছেন কোথা থেকে আসছে এর অর্থায়ন। কোনরকম তথ্যপ্রমাণ ছাড়াই এই ষড়যন্ত্র তত্ত্ব বেশ জনপ্রিয়তাও পেয়েছে, আর তা বোঝা যায় উপন্যাসিক রবার্ট জোন্সের একটি টুইটের শেয়ার দেখে।

তিনি লিখেছেন,  আমি এবং আমার প্রতিবেশীরা বিশ্বাস করি কৃষ্ণাঙ্গ এবং ব্রাউন জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সরকারি সংস্থার এটি একটা সমন্বিত আক্রমণ। এইসব আতশবাজি করা হচ্ছে সেইসব এলাকায় যেখানে মানুষ পুলিশ নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করছে, সেসব এলাকার মানুষের ঘুম নষ্ট করে তাদের দুশ্চিন্তাগ্রস্ত ও দ্বিধাগ্রস্ত করার জন্য মনে করেন তিনি। 

কোনোরকম প্রমাণ ছাড়াই দেয়া জোন্সের এই অনুমান-নির্ভর থ্রেট ইতিমধ্যে রিটুইট করা হয়েছে ১৬ হাজার বার, ফেসবুকে এর শেয়ার হয়েছে ২১ হাজার।

ভেঙে যাচ্ছে সামাজিক শৃঙ্খলা

সমাজবিজ্ঞানী টেড গয়ার্তজেল ষড়যন্ত্র তত্ত্বের মধ্যে একটি বিশ্বাস খুঁজে পেয়েছিলেন যা কি-না জোরালো ভাবে এ্যানোমিয়া  বা একটি অনুভূতির সাথে সম্পৃক্ত যেখানে সামাজিক শৃঙ্খলা ভেঙে যাচ্ছে এবং সাধারণ মানুষের অবস্থা আরও খারাপ হচ্ছে।

করোনা মহামারীর কারণে যুক্তরাষ্ট্রে এখন চার কোটি মানুষ বেকার। আগামী জুলাই মাসে প্যানডেমিক ফেডারেল অর্থ সহযোগিতা বন্ধ হয়ে গেলে অনেকেই আর্থিক কষ্টের মুখোমুখি হবেন। এর পাশাপাশি চলছে কৃষ্ণাঙ্গদের অধিকার রক্ষার প্রতিবাদ, যা প্রতিবাদকারী জনগোষ্ঠী ও সরকারকে করেছে মুখোমুখি। বিবিসি অবলম্বনে। 
 

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

error: Content is protected !!