আজ রাতে মালয়েশিয়ায় থেকে বাংলাদেশে ফিরছেন রায়হান কবির

মহামারি করোনাকালীন মালয়েশিয়ায় অভিবাসী নিপীড়ন নিয়ে আলজাজিরায় সাক্ষাৎকার দিয়ে বিপাকে পড়েছিলেন বাংলাদেশি যুবক রায়হান কবির। পরবর্তীতে মালয়েশিয়া সরকার তাকে গ্রেফতার করে। অবশেষে মুক্ত হয়ে আজ শুক্রবার (২১ আগস্ট) রাতেই ঢাকার পথে রওনা হবেন। স্থানীয় সময় রাত ১১টায় মালয়েশিয়ান এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইটে তিনি রওনা হবেন। রাত ১টায় তার ঢাকায় নামার কথা রয়েছে।

মালয়েশিয়ার ইমিগ্রেশন বিভাগের মহাপরিচালক দাতুক খায়রুল দাজাইমী দাউদ সাংবাদিকদের জানান, মো. রায়হান কবিরের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই। তাই সব প্রক্রিয়া শেষ করে শুক্রবার রাতে এয়ারপোর্টে পৌঁছে দেবে দায়িত্ব পালনকারী ইমিগ্রেশন বিভাগের সদস্যরা।

গত ১৯ আগস্ট মো. রায়হান কবিরের আইনজীবী কে সুমিতা শাথিন্নি ও সি সেলভরাজা জানান, কোভিড-১৯ এর স্ক্রিনিংয়ের ফলাফল ভালো হওয়ার পরে ফ্লাইটের টিকিট পাওয়া গেলে তাকে বাড়ি পাঠানো হবে। ইমিগ্রেশন বিভাগের পক্ষ থেকে আর কোনো অভিযোগ আনা হবে না।

কয়েক সপ্তাহ আগে মালয়েশিয়ায় বসবাসরত অভিবাসীদের প্রতি দেশটির আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কর্তৃক চলতি লকডাউনে বৈষম্যমূলক ও বর্ণবাদী আচরণ করা হয়েছে বলে ‘লকড আপ ইন মালয়েশিয়াস লকডাউন‘ শিরোনামে ২৫ মিনিটের একটি ডকুমেন্টারি আল-জাজিরা টেলিভিশনে প্রকাশিত হয়। এরপর সেটি নিয়ে ব্যাপক তোলপাড় শুরু হয় মালয়েশিয়া জুড়ে।

এরপর পরই অভিবাসন আইনের ১৯৫৯/৬৩ ধারায় রায়হান কবিরের বিরুদ্ধে তদন্তের সহযোগিতা করার জন্য তাকে গ্রেপ্তার করতে জনসাধারণের সহযোগিতা চাওয়া হয়। তার কিছু দিন পর ২৪ জুলাই রাজধানীর জালান পাহাংয়ের একটি কনডোমোনিয়াম থেকে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে রায়হান কবিরকে গ্রেপ্তার করা হয়।

পরে দেশি-বিদেশি নানান মানবাধিকার সংগঠন সোচ্চার হয় রায়হান কবিরের মুক্তির বিষয়ে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক চাপের মুখে বিনা শর্তে মালয়েশিয়া সরকার ১৯ আগস্ট রায়হান কবীরকে মুক্তি দিয়ে বাধ্য হন। মালয়েশিয়া বাংলাদেশ বিমান যোগাযোগ শুরু হলেই রায়হান কবীর বাংলাদেশে ফিরবেন। পরিবারের পক্ষ থেকে যারা রায়হানের পক্ষে স্ট্যান্ড নিয়েছে আয়েবা, ডব্লিউবিও এবং মিডিয়া কর্মীসহ সকলের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা হয়।

প্যারিসভিত্তিক সংগঠন ওয়ার্ল্ড বাংলাদেশ অর্গানাইজেশন (ডব্লিউবিও) এবং অল ইউরোপিয়ান বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন (আয়েবা) এ ব্যাপারে তাদের উদ্বেগ প্রকাশ করেন এবং মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে যোগাযোগ করে রায়হান কবিরের আশু মুক্তির জন্য জোর দাবি জানান। তাছাড়াও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা, আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংস্থা (আইএলও), আন্তর্জাতিক মাইগ্রেশন সংস্থা (আইওএম), ইউরোপীয় ইউনিয়ন হেড কোয়ার্টার এবং প্যারিসে মালেয়েশিয়া দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করেন।

এছাড়াও রায়হান কবিরকে মুক্ত করতে বিখ্যাত ফরাসি আইনজীবী ফিলিপ সিমনেকে নিয়োগ দেন। ডব্লিউবিও এর সভাপতি এবং আয়েবা মহাসচিব কাজী এনায়েত উল্লাহ গত ২৮ জুলাই ফিলিপ সিমনে এবং প্রশাসনিক কর্মকর্তা জানা মার্টিনকে সঙ্গে নিয়ে এক ঘোষণায় বিষয়টি সবার নজরে আনেন এবং রায়হানকে মুক্ত করতে যাবতীয় কার্যক্রমের প্রক্রিয়া তুলে ধরেন।

এরই ধারাবাহিকতায় অব্যাহত চাপ সৃষ্টি করা হয় ডব্লিউবিও এবং আয়েবার পক্ষ থেকে। কাজী এনায়েত উল্লাহ লিখিত বক্তব্যে বলেন রায়হান গণমাধ্যমে বক্তব্য দিয়ে কোনো ধরনের অন্যায় করেননি। সুতরাং কোনো আইনেই রায়হান কবীরকে আটকানো সম্ভব নয়। তাছাড়া রায়হান প্রমাণ করেছেন সঠিক সময়ে সঠিক কথা বলে। রায়হান একা নন, আমরা রায়হানের পাশে আছি।

মালয়েশিয়া কর্তৃপক্ষ তাদের দেশে কোনো বিদেশি আইনজীবীর কার্যক্রম করার আইন না থাকায় আয়েবার আইজীবীসহ তিন সদস্যের প্রতিনিধিদলকে অনুমতি দিতে অস্বীকৃতি জানায় তবে তারা আশ্বস্থ্য করেন অচিরেই রায়হানকে মুক্ত করে বাংলাদেশে ফেরত পাঠাবেন।

এর পরিপ্রেক্ষিত কাজী এনায়েত উল্লাহ জানান, মালয়েশিয়া সরকার তার কথা না রাখলে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন লঙ্ঘনের দায়ে মালেশিয়া সরকারের বিরুদ্ধে ইউরোপীয়ান আন্তর্জাতিক আদালতে অভিযোগ করবেন এবং এ ব্যাপারে আয়েবার নিয়োগপ্রাপ্ত আইনজীবী ফিলিপ সিমনেকে সমস্ত দায়িত্ব দেয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে কাজী এনায়েত উল্লাহর সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি খুবই আন্তরিকভাবে আনন্দিত, রায়হান মুক্ত হয়েছে। ডব্লিউবি ও এবং আয়েবা প্রবাসীদের স্বার্থ রক্ষায় বদ্ধপরিকর। শুধু রায়হান কবীর নয় প্রবাসীদের যেকোনো সমস্যায় আমরা সবসময় পাশে আছি এবং থাকবো।

উল্লেখ্য, জুলাই মাসে সংবাদমাধ্যমটির অফিসিয়াল ইউটিউব চ্যানেলে ‘লকডআপ ইন মালয়েশিয়ান লকডাউন-১০১ ইস্ট’ শীর্ষক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে করোনাভাইরাস মহামারীতে মালয়েশিয়ায় অবৈধ অভিবাসীদের সঙ্গে সরকারের আচরণ নিয়ে কথা বলেন রায়হান কবির।
মালয়েশিয়ায় বসবাসরত অভিবাসীদের প্রতি দেশটির আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কর্তৃক চলতি লকডাউনে বৈষম্যমূলক ও বর্ণবাদী আচরণ করা হয়েছে বলে ‘লকড আপ ইন মালয়েশিয়া’স লকডাউন’ শিরোনামে ২৫ মিনিটের একটি ডকুমেন্টারি কয়েক সপ্তাহ আগে আল-জাজিরা টেলিভিশনে প্রকাশিত হলে ব্যাপক তোলপাড় শুরু হয় মালয়েশিয়া জুড়ে। বসবাসরত অভিবাসীদের প্রতি দেশটির আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কর্তৃক চলতি লকডাউনে বৈষম্যমূলক ও বর্ণবাদী আচরণ করা হয়েছে বলে একটি সাক্ষাৎকার দেয়।

মালয়েশিয়া সরকার ওই প্রতিবেদনের অভিযোগগুলো অস্বীকার করে এবং রায়হানের ওয়ার্ক পারমিট বাতিল করে। পরে ২৪ জুলাই শুক্রবার সন্ধ্যায় তাকে কুয়ালালামপুরের জালান পাহাং স্তাপার একটি কন্ডোমিনিয়াম থেকে গ্রেফতার করে ১৪ দিনের জন্য জিজ্ঞাসাবাদে নেয় দেশটির পুলিশ।
গ্রেপ্তারের আগে নিজের ফেসবুক ম্যাসেঞ্জার থেকে সময় সংবাদকে দেয়া এক ভিডিও বার্তায় বলেন, আমার অপরাধটা কী? আমি তো কোনো মিথ্যা বলিনি। প্রবাসীদের ওপর যে বৈষম্য ও নিপীড়ন চলেছে, আমি শুধু সেই কথাগুলো বলেছি। আমি চাই প্রবাসে থাকা কোটি বাংলাদেশি ভালো থাকুক। আমি চাই পুরো বাংলাদেশ আমার পাশে থাকুক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

error: Content is protected !!