November 28, 2020

মাই পেটারসন. লাইফ

ভয়েস অফ দ্যা কমিউনিটি

আজ মিন্নির দিকে সবার দৃষ্টি

প্রকাশ্যে দিবালোকে বরগুনায় রিফাত শরীফকে কুপিয়ে হত্যা করার চাঞ্চল্যকর মামলায় আজ বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) রায় ঘোষণা করা হবে। বরগুনার জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিচারক মো. আছাদুজ্জামান এ রায় ঘোষণা করবেন। মামলার ১০ আসামিরই সর্বোচ্চ শাস্তি হবে- এমন প্রত্যাশা রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলিদের। অন্যদিকে আসামিপক্ষের আইনজীবীরা আশা করছেন, সব আসামির বেকসুর খালাস। তবে এ মামলায় সর্বাধিক আলোচিত নিহত রিফাতের স্ত্রী আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নি। রিফাত হত্যা মামলায় প্রধান সাক্ষী থেকে পরবর্তী সময়ে আসামি হওয়া মিন্নির বিষয়ে আজকের রায়ে কী সিদ্ধান্ত আসছে, মূলত সেদিকেই দৃষ্টি সবার।

২০১৯ সালের ২৬ জুন সকালে বরগুনা সরকারি কলেজের সামনে কিশোর গ্যাং ‘বন্ড বাহিনী’ কুপিয়ে হত্যা করে রিফাত শরীফকে। রায়ে আসামিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রত্যাশা করছে রিফাতের পরিবার। অন্যদিকে, ন্যায্য বিচার প্রত্যাশা করছেন আসামি পক্ষের আইনজীবীরা।

গত ৮ জানুয়ারি থেকে প্রাপ্তবয়স্ক ১০ আসামির বিরুদ্ধে সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু করেন আদালত। ২৫ ফেব্রুয়ারি এ মামলার ৭৬ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ করার মধ্য দিয়ে প্রাপ্তবয়স্ক আসামিদের সাক্ষ্য গ্রহণ শেষ করেন আদালত। ১৬ সেপ্টেম্বর উভয়পক্ষের যুক্তি-তর্ক শেষে প্রাপ্তবয়স্ক ১০ আসামির রায় ঘোষণার জন্য ৩০ সেপ্টেম্বর তরিখ নির্ধারণ করেন আদালত।

রায় প্রসঙ্গে নিহত রিফাতের বাবা আবদুল হালিম দুলাল শরীফ বলেন, ‘আমার ছেলে হত্যার আসামিদের বিচার কার্যক্রম শেষে রায়ের তারিখ নির্ধারিত হওয়ায় বিচার বিভাগকে ধন্যবাদ জানাই। সেই সঙ্গে পুলিশ প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে ধন্যবাদ জানাই যারা আমার ছেলের হত্যাকারীকে চিহ্নিত ও গ্রেফতারে সহযোগিতা করেছেন।’ তিনি আরও বলেন, ‘বিচার বিভাগের প্রতি আমার আস্থা আছে। আমি ছেলের হত্যাকারীদের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড কামনা করছি।’

২০১৯ সালের ২৬ জুন সকালে বরগুনা সরকারি কলেজের সামনে একটি হত্যাকাণ্ড সারাদেশকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। কিশোর গ্যাং ‘বন্ড বাহিনী’ প্রকাশ্যে শাহনেওয়াজ রিফাতকে (রিফাত শরীফ) কুপিয়ে গুরুতর জখম করে। চিকিৎসাধীন অবস্থায় ওইদিন বিকালেই বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে মারা যান তিনি।

পরদিন ২৭ জুন রিফাতের বাবা মো. আবদুল হালিম দুলাল শরীফ বাদী হয়ে ১২ জনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাত আরও পাঁচ-ছয় জনের বিরুদ্ধে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। এরপর পুলিশ কঠোর অবস্থান নিয়ে একে একে গ্রেফতার করে এজাহারভুক্ত আসামিদের। রিফাতের ওপর হামলার ছয় দিন পর ২ জুলাই ভোর রাতে পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয় এ মামলার আলোচিত প্রধান আসামি সাব্বির আহমেদ নয়ন ওরফে নয়ন বন্ড।

মামলার তদন্তের একপর্যায়ে তদন্ত কর্মকর্তা বরগুনা সদর থানার ওসি (তদন্ত) মো. হুমায়ুন কবির মামলার প্রধান আসামি নয়ন বন্ডের সঙ্গে নিহত রিফাত শরীফের স্ত্রী ও প্রধান সাক্ষী আয়শা সিদ্দিকা মিন্নির সম্পর্ক এবং হত্যা পরিকল্পনায় জড়িত থাকার প্রমাণ পান। এরপর মিন্নিকে এই মামলায় সাক্ষী থেকে আসামি করা হয়। রিফাত হত্যাকান্ডের ২০ দিন পর ২০১৯ সালের ১৬ জুলাই আয়শা সিদ্দিকা মিন্নিকে গ্রেফতার করে পুলিশ। প্রধান সাক্ষী থেকে মিন্নি আসামি হয়ে যাওয়ায় মামলাটি মোড় নেয় অন্যদিকে।

রিফাত হত্যাকাণ্ডের দুই মাস ছয় দিন পর গত বছরের ১ সেপ্টেম্বর বিকালে বরগুনার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ২৪ জনকে অভিযুক্ত করে প্রাপ্তবয়স্ক এবং অপ্রাপ্তবয়স্ক দুই ভাগে বিভক্ত করে দুটি তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করে পুলিশ। তাদের মধ্যে ১০ জন প্রাপ্তবয়স্ক আসামি এবং ১৪ জন অপ্রাপ্তবয়স্ক রয়েছেন। প্রাপ্তবয়স্ক আসামিদের বিচারিক কার্যক্রম শুরুর জন্য ২০২০ সালের ১ জানুয়ারি বরগুনার জেলা ও দায়রা জজ আদালত চার্জ গঠন করেন। তবে মামলার অন্যতম আসামি মুসা বন্ড এখনও পলাতক রয়েছে।

রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী (পিপি) ভুবন চন্দ্র হাওলাদার বলেন, ‘রিফাত শরীফ হত্যা মামলাটি সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে পরিচালনা করা হয়েছে। এ মামলায় ৭৬ জন সাক্ষী সাক্ষ্য প্রদান করেছেন। মামলার জব্দকৃত আলামত, মোবাইল সিডিআর, ভিডিও ফুটেজ, সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ, স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিসহ আদালতে পেশ করা হয়েছে। যেভাবে সাক্ষ্য দেওয়া হয়েছে তাতে রাষ্ট্রপক্ষ আসামিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রত্যাশা করে।’

আসামি পক্ষের আইনজীবী সাইমুল ইসলাম রাব্বি বলেন, ‘রাষ্ট্রপক্ষের উপস্থাপিত যুক্তিতর্ক আমরা খণ্ডন করে আদালতে আসামি পক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেছি। আমরা আদালতে যে তথ্য-উপাত্ত উপস্থাপন করেছি তাতে এই মামলায় আসামিরা ন্যায়বিচার পাবে বলে আমি প্রত্যাশা করি।’

মিন্নির আইনজীবী মাহবুবুল বারী আসলাম বলেন, ‘আমরা রিফাত শরীফ হত্যা মামলায় শুরু থেকে বলে আসছি মিন্নি নির্দোষ। রিফাত শরীফ মৃত্যুর আগে যেসব কথা বলে গেছেন তাতে মিন্নি এই মামলার সাক্ষী কিন্তু মিন্নিকে আসামি করা হয়েছে। আমরা মিন্নির পক্ষে যুক্তিতর্ক ও তথ্য-উপাত্ত উপস্থাপন করে আসছি। আমরা আশা করি, মিন্নি এই মামলায় নির্দোষ প্রমাণিত হবে।’

এ মামলার অপ্রাপ্তবয়স্ক ১৪ আসামির বিচার কাজ শুরুর সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে গত ৮ জানুয়ারি জেলা নারী ও শিশু আদালতে পাঠান সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত। এরপর এ অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তার সাক্ষ্যগ্রহণ ব্যতীত ৭৩ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ সম্পন্ন করেন আদালত।
অবশ্য মিন্নির বাবা মোজাম্মেল হোসেন শুরু থেকেই অভিযোগ করেন, নির্যাতন করে ও ভয়ভীতি দেখিয়ে মিন্নিকে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিতে বাধ্য করেছে পুলিশ। এর নেপথ্যে স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনীতিবিদদের মদদ রয়েছে।

গত ৩০ জুলাই বরগুনা জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিচারক মো. আছাদুজ্জামান মিন্নির জামিন না মনজুর করেন। তার আগে ২১ জুলাই বরগুনার জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম মো. সিরাজুল ইসলাম গাজীর আদালত মিন্নির জামিনের আবেদন নামনজুর করেন। গত বছরের ২৯ আগস্ট শর্তসাপেক্ষে মিন্নির জামিন মনজুর করেন হাইকোর্ট। সেই থেকে জামিনে আছেন রিফাত শরীফ হত্যা মামলার প্রধান সাক্ষী থেকে আসামি হওয়া মিন্নি।

error: Content is protected !!