আজও কেন করোনা নিয়ে এত রাজনীতি

আর কোনো প্রাণী জন্মের সময় থেকে মানুষের মত এতটা অসহায় নয়। মাতৃ জঠরবাস শেষে পৃথিবীতে আসে মানুষ ভীষণ অসহায় হয়ে। মাতৃদুগ্ধ পান করে, মায়ের কোলেপিঠে বড় হয়। তারপর উপুড় হয়, বসা শেখে, কথা শেখে, হাঁটা শেখে। বাবা মায়ের হাত ধরে জীবনের পথে হাঁটে। কারো কারো সেই কপালও হয় না। ছোটবেলায় বাবা অথবা মাকে হারায়। কারো দুজনেই থাকে না।প্রকৃতির কোলে বেড়ে ওঠে মানুষ। দেশ ভেদে বিভিন্নভাবে বড় হয়। বিভিন্ন ভাষায় কথা বলে।কিন্তু সব মানুষের শরীরের ব্যথা একইরকম, অসুখের কষ্ট একই রকম।

কোভিড ১৯ চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল কতটা অসহায় মানুষ স্থান কাল পাত্র ভেদে। কতটা নির্দয় এই বেঁচে থাকার লড়াই। কোনোখানেই আজ মানুষ নিরাপদ নয়। কোনোখানে পালানোর পথ নেই। ধুঁকছে মানুষ, কাঁদছে জীবন।

কোনো ক্ষমতাই ক্ষমতা নয়, অক্ষমতায় রূপান্তরিত হয়েছে সব ক্ষমতা। বিপক্ষে অদৃশ্য শত্রুর আক্রমণে নাজেহাল আজ সভ্যতা।
অথচ এই সভ্যতা সাজাতে মানুষের কত রকম চেহারা উন্মোচিত হয়েছে কালে কালে।

আমরা বাঙালী সমগ্র সত্ত্বায়, সমগ্র চেতনায়। দেশের কাছে, মাটির কাছে, মানুষের কাছে আমাদের অনেক ঋণ আছে।
বৈশ্বিক এই মহামারী আর বিপর্যয় কেড়ে নিয়েছে আমাদের সকল কিছুই। আমরা আজ গৃহবন্দী। বলা যায় চিড়িয়াখানার জীব এখন আমরা। প্রকৃতিতে বেড়ে ওঠা সকল প্রাণী আজ অবমুক্ত। এটাকে সাফারী পার্কও বলা যায়!

করোনার থেকে বাঁচতে হলে স্বেচ্ছায় এই বন্দী দশা আমাদের মানতেই হবে। ঘরে থাকার কোনো বিকল্প নেই। কাছে থাকা বারণ। ফিট হিসেব করে আমরা একে অপরের থেকে দূরত্ব মাপি।
সবাইকে সন্দেহ করি… এই বুঝি করোনা!
আর তাতেই হয়তো সুস্থ থাকার মূলমন্ত্র।

আমরা কি তবে আরো বেশী স্বার্থপর হয়ে উঠছি?
করোনা খুব ছোঁয়াচে রোগ বলেই এই দূরত্ব। কিন্তু মানসিকভাবে দূরে চলে গেলে তো ভীষণ নিষ্ঠুরতার শিকার হবে জীবন।

আজ পহেলা রমজানের ইফতার হলো। কোনো ঢাক-ঢোল নেই, নেই অযাচিত কোনো লোক দেখানো বাড়াবাড়ি। ইতোমধ্যেই অনেক ডাক্তার আক্রান্ত, নার্স, স্বাস্থ্য কর্মী, পুলিশ, সেনা সদস্য আক্রান্ত।
যারা আজ ডিউটি করছেন, তাঁরা কোথায় ইফতার করেছেন? তাঁরা কি সেহরি খেতে পেরেছিলেন?
তাঁদের রোজা কেমন হলো?
আমরা কি একবারো ভেবেছি?
যাঁরা হাসপাতালে ভর্তি, তাঁরা আজ কেমন আছেন? তাঁদের স্বজনেরা ইফতার করেছেন কিভাবে?
গত চব্বিশ ঘন্টায় নয়জন মারা গেছেন। তাঁদের পরিবারের সবাইকে কি আমরা অনুভব করতে পারি?

যে সকল ডাক্তার, নার্স, পুলিশ, সেনা সদস্য কোয়ারেন্টিনে আছেন, তাঁদের পরিবারের মানসিক অবস্থা কি আমরা ধারণ করতে পারি?

চারিদিকে খাবারের জন্য হাহাকার। মানুষের কাজ নেই, ঘরে খাবার নেই। আজ তিতুমীর কলেজের কাছে টিসিবির ট্রাকের কাছে মানুষের ভীড় দেখলাম। তারা করোনা বোঝে না। তারা ক্ষুধা চেনে। মহাখালী কাঁচাবাজার জুড়ে কতগুলো হাত, সাহায্য চায়।
অফিসে আজ একজন রোগী নোয়াখালী যাবে, টাকা নেই। বাধ্য হয়ে হাত পাতছে।

আমরা কি জীবনের কান্নার শব্দ শুনতে পাই? বোবা কালা হওয়ার সুযোগও নেই। আমরা কি করোনার এই দুঃসময়েও নিজেরা নিজেদের দায়িত্ব মনে রেখেছি?
তাহলে কেন এতগুলো প্রশ্নের মুখোমুখি আমরা? কোনো উত্তর নেই।
প্রশ্নগুলো আমাদের বুক কোটরে প্রতিধ্বনিত হয়।

চাল চোর, তেল চোর ধরা পড়ে। শাস্তি হয়। বরখাস্ত হয়। চুনোপুঁটি চোর ধরে আমরা কি রাঘববোয়ালদের আড়াল করি?
আজো কেন করোনা নিয়ে এত রাজনীতি। আর কত মানুষ মরলে আমরা মানুষ হবো?

দিনশেষে এটাই চিরন্তন সত্য ….. প্রকৃতির প্রতিশোধ নেবার সময় এটা। আর মানুষ প্রকৃতির কাছে অসহায়।

আমাদের অর্থনীতির চাকা সচল করতে হবে। ক্ষুধাকে জয় করতে হবে। গ্রামে ফসল উঠছে কৃষকের ঘরে। সব্জির দাম নেই। কৃষকের ঘরে খাবার নেই। প্রান্তিক মানুষগুলোকে বাঁচাতে হবে।

ধীরেধীরে লকডাউন শিথিল হবে। কিন্তু কিসের ভিত্তিতে লকডাউন শিথিল হবে?

ধরে নেই যারা আক্রান্ত হয়ে সেরে গেছেন, তারা আপাতত এই রোগ ছড়াবেন না আর তাদরে দ্বারা কেউ আক্রান্ত হবে না। তবে তাদের তো আলাদা করতে হবে! তাদের আলাদা করে কাজে ফিরিয়ে আনতে হবে।

শেরপুর প্রথমে লকডাউন হয়েছিল। তারা এখন করোনা প্রতিরোধে অনেকখানি সফল। ঘরে ঘরে খাবার পৌঁছে দিয়ে তারা প্রায় দেড়মাস অতিবাহিত করেছে। টোলারবাগও সেই কাতারে। আমাদের বাকী হটস্পটগুলো মডেল হিসেবে শেরপুর আর টোলারবাগের উদাহরণ অনুসরণ করতে পারে।

ইতিহাস ক্ষমা করে না, জীবন ক্ষমা করে না।
ইতিহাসের শিক্ষা থেকে আমরা কখনোই শিক্ষা নেই না…. এটাই সত্য।

সামান্য হাত ধুয়ে আর সামাজিক ও শারিরীক দূরত্ব বজায় রেখে আমরা করোনাকে ঠেকিয়ে দিতে পারি। ঘরে থেকে করোনাকে পরাভূত করতে পারি।

অথচ বড় বেশী বোধের অভাব আমাদের।

আমাদের আক্রান্ত বেশীরভাগ ২১-৩০ বছর। কারণ একটাই… এই বয়সটা ভয় না পাবার, এই বয়সটা তুড়ি মেরে সব উড়িয়ে দেবার!

করজোড়ে মিনতি করি…. অনেক হয়েছে সাহসের বাহাস। এবার ক্ষ্যান্ত দাও তারুণ্য, এবার থিতু হও যৌবন।

সময় আসবেই ইনশাআল্লাহ। সেদিনের জন্য জমা থাক নির্ভীকতা। এখন একটু সমঝে চলার সময়। এখন একটু সচেতন হবার সময়।
অযথা বাহিরে দৌড়াদৌড়ি করে আক্রান্ত হলে নিজের কষ্ট, পরিবারের কষ্ট, সমাজের কষ্ট,দেশের কষ্ট।

আর যেভাবে লক ডাউন হচ্ছে হাসপাতালগুলো, যেভাবে কোয়ারেন্টিনে আর আইসোলেশনে ডাক্তার আর নার্স….. চিকিৎসা করার মত কেউ থাকবে না। কোনো জায়গা থাকবে না। এমনিতেই অপ্রতুল সংখ্যায় ডাক্তার, নার্স, টেকনোলজিস্ট। আর আইসিইউ এবং ভেন্টিলেটর তো ভরে যাবে ততদিনে!

আগামী ৫ ই মে পর্যন্ত ছুটি বেড়েছে। পরিসংখ্যানের কথা আর নাইবা বলি! কতজন আক্রান্ত, কতজন মৃত, কতজন সুস্থ…. হিসেব কষে একটু বোধে আনি বিষয়গুলো।

জীবন হেলাফেলা পছন্দ করে না। প্রকৃতিও মাফ করে না।

যদি আবার আগের মত স্বাভাবিক জীবন চাই, কর্মচাঞ্চল্য চাই, ভয়হীন দিন চাই, মৃত্যুর মিছিলে শরিক হতে না চাই, হাসপাতালে একাকী সময় না চাই, অসুস্থ হতে না চাই, অসুখ থেকে বাঁচতে চাই…. তাহলে সমস্বরে আরো একবার বলি….. ঘরে থাকুন, ঘরে থাকুন, ঘরে থাকুন।

আওয়াজ তুলি সমস্বরে….. স্বাভাবিক জীবন চাই। সুস্থ সুন্দর সময় চাই।
প্রকৃতির কাছে নতজানু হই, স্রষ্টার কাছে বিনীত হই। সৃষ্টির কাছে পৌঁছে দেই ভালবাসা আর সহমর্মিতা।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

error: Content is protected !!